ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা শুরুর পর থেকে তেহরান এখন পর্যন্ত ইসরায়েলের তুলনায় উপসাগরীয় আরব দেশগুলো লক্ষ্য করে কয়েক গুণ বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী একটি সংস্থার প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের অংশ ক্রিটিক্যাল থ্রেটস প্রজেক্ট (সিটিপি)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান ইসরায়েল লক্ষ্য করে আনুমানিক ২৫৫টি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছে। এর বিপরীতে একই সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলো লক্ষ্য করে ২ হাজার ১৭১টি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে তেহরান।
লক্ষ্য যখন উপসাগরীয় দেশ
পরিসংখ্যান বলছে, ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার মূল কেন্দ্রবিন্দু এখন আর ইসরায়েল নয়, বরং ওই অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো। উপসাগরীয় দেশগুলোতে চালানো ২ হাজার ১৭১টি হামলার মধ্যে ১ হাজার ১৩৮টিই ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত লক্ষ্য করে। এর ফলে চলতি সংঘাতের সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু হওয়া দেশে পরিণত হয়েছে আমিরাত।
বিশ্লেষকদের মতে, তেহরান এই কৌশলের মাধ্যমে আরব দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে, যাতে তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য করে। তবে ইরানের এই হিসাব উল্টো ফল দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সৌদি আরবভিত্তিক থিংক ট্যাংক গাল্ফ রিসার্চ সেন্টার-এর চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ সাগের বলেন, ‘উপসাগরীয় দেশগুলো এখন কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। হয় তাদের আরও প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় যোগ দিতে হবে, অথবা নিজ মাটিতে আরও বড় সংঘাতের ঝুঁকি নিতে হবে।’
ইসরায়েলের ওপর পাল্টা অভিযোগ
এদিকে ইরান অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল নিজেই উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি ও বেসামরিক স্থাপনায় বেশ কিছু হামলা চালিয়েছে। তেহরানের দাবি, এটি আরব দেশগুলোকে উসকে দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে টেনে আনার একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। মূলত ওই অঞ্চলের সবকটি দেশেই মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্ক থাকায় এই যুদ্ধ দ্রুত প্রতিবেশী দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর হুঁশিয়ারি
ইরানের ক্রমাগত হামলার মুখে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন পাল্টা আঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রবিবার সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত এবং ওমান জিসিসি-এর একটি জরুরি মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হয়। জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে তারা সম্মিলিত আত্মরক্ষার প্রস্তুতির ঘোষণা দিয়েছে।
জোটটি তেহরানকে সতর্ক করে বলেছে, হামলা অব্যাহত থাকলে উপসাগরীয় অঞ্চলটি কেবল রক্ষণাত্মক ঢাল হিসেবে থাকবে না, বরং এটি একটি সক্রিয় রণক্ষেত্রে পরিণত হবে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মজিদ আল-আনসারি বলেছেন, তাদের ওপর চালানো হামলা কোনোভাবেই ‘বিনা জবাবে ছেড়ে দেওয়া হবে না’। এদিকে অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানি হামলা বন্ধে সরাসরি সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
সীমানা ছাড়িয়ে সংঘাতের বিস্তার
উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরেও এই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। তুর্কি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, বুধবার ইরাক ও সিরিয়ার আকাশপথ অতিক্রম করে তুরস্কের দিকে ধেয়ে আসা একটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে ধ্বংস করা হয়েছে। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার ইরানের সীমান্তঘেঁষা আজারবাইজানের নাখচিভান ছিটমহলে ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান। এতে বিমানবন্দর সংলগ্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দুই বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন।
হামলার তীব্রতা কমছে?
আঞ্চলিকভাবে হামলার বিস্তৃতি ঘটলেও মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ইরানের হামলার তীব্রতা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বুধবার জানান, যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোর তুলনায় সম্প্রতি ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সংখ্যা কমে এসেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের বড় আকারের হামলার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা যেকোনও সময় একটি ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড
রিপোর্টারের নাম 






















