হয়তো আপনি কোনো সুপারশপের ক্যাশ কাউন্টারে দাঁড়িয়ে আছেন, অথবা কোনো বাজারে। হঠাৎই আপনার চোখে পড়লো বাবা-মায়ের কোলে থাকা এক অচেনা শিশু। পরক্ষণেই হয়তো আপনার অজান্তেই মুখ বাঁকিয়ে, হাত নেড়ে অথবা অদ্ভুত শব্দ করে তার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। আশপাশের মানুষ দেখছে, কিন্তু আপনি যেন তখন অন্য এক জগতে! আপনার চোখেমুখে তখন কেবলই আদর আর স্নেহ। কিন্তু এমনটা হয় কেন? কেন অচেনা একটি শিশুর প্রতি আমাদের এত মায়া জন্মায়?
এর পেছনের কারণটা আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে না হলেও, বিজ্ঞান কিন্তু এর এক দারুণ ব্যাখ্যা দিয়েছে। ১৯৪৩ সালে অস্ট্রিয়ার বিখ্যাত প্রাণীবিদ কনরাড লরেন্স একটি বৈজ্ঞানিক ধারণা দিয়েছিলেন, যার নাম ‘কিন্ডচেনশেমা’ বা ‘বেবি স্কিমা’। তিনি বলেছিলেন, শিশুদের কিছু বিশেষ শারীরিক বৈশিষ্ট্য থাকে, যা আমাদের মস্তিষ্কে এক বিশেষ সংকেত পাঠায়। এই বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—বড় মাথা, গোলগাল গাল, ছোট নাক, বড় বড় চোখ এবং নরম তুলতুলে শরীর।
সহজভাবে বললে, এটি আমাদের মস্তিষ্কের একটি ‘গোপন বোতাম’ বা সহজাত প্রতিক্রিয়া। শিশুদের এই বিশেষ চেহারা দেখলেই আমাদের মস্তিষ্কের গভীরে কিছু একটা নরম হয়ে যায়। আমরা তাদের কোলে নিতে চাই, আদর করতে চাই। গবেষণা বলছে, শিশুর মুখ দেখার এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যেই আমাদের মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সেন্টার’ বা পুরস্কার কেন্দ্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। কোনো কিছু ভেবে ওঠার আগেই আপনার মস্তিষ্ক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, “আহা, কী মিষ্টি!”
এরপর শুরু হয় এক দারুণ রাসায়নিক খেলা। এই সময় আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক হরমোন নিঃসৃত হয়, যা আমাদের আনন্দ ও ভালো লাগার অনুভূতি দেয়। একই সঙ্গে অক্সিটোসিন নামক আরেকটি হরমোন নিঃসৃত হয়, যা সম্পর্কের বন্ধন মজবুত করে। এর ফলেই আমরা শিশুদের প্রতি এক গভীর টান ও মমতা অনুভব করি, যা প্রায়শই আমাদের নিজের নিয়ন্ত্রণেই থাকে না।
শিশুদের প্রতি এই মমত্ববোধ আমাদের আচরণেও পরিবর্তন আনে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা শিশুদের কোলে নেয়, তাদের হাতের কাজ আরও সূক্ষ্ম ও সাবলীল হয়ে ওঠে। যেন মস্তিষ্ক নিজেই তাদের বলে দেয়— “সাবধানে ধরো।”
তবে শুধু মানবশিশু নয়; কুকুরছানা, বিড়ালছানা বা পাখির ছানার প্রতিও আমাদের একই রকম অনুভূতি কাজ করে। তাদের বড় চোখ আর গোলগাল মুখ দেখলেই আমাদের মন নরম হয়ে যায়। এমনকি টেডি বিয়ার বা পুতুলের প্রতিও আমাদের এই সহজাত আকর্ষণ কাজ করে।
সুতরাং, পরেরবার কোনো অচেনা শিশুকে দেখে যদি আপনার মন নরম হয়ে যায়, তার দিকে তাকিয়ে হাসি চলে আসে অথবা তাকে আদর করতে ইচ্ছে করে, তবে নিজেকে দুর্বল ভাববেন না। এটি আপনার মানবিকতার এক সহজাত ও বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত প্রকাশ।
রিপোর্টারের নাম 

























