বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে অনলাইন কেনাকাটার পরিধি, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এনেছে নতুন গতি। তবে এই সুবিধাজনক কেনাকাটার এক অস্বস্তিকর দিক হলো পণ্যের দাম জানতে বিক্রেতার ‘ইনবক্সে আসুন প্লিজ’ বার্তা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে পণ্যের ছবি বা ভিডিও দেখে একজন সম্ভাব্য ক্রেতা যখন ‘দাম কত?’ জানতে চান, তখন প্রায়শই উত্তর আসে ‘ইনবক্সে যোগাযোগ করুন’ বা ‘ইনবক্সে আসুন প্লিজ’। এই এক লাইনের বার্তাটি অনেক ক্রেতার মনেই প্রশ্ন তৈরি করে: কেন পণ্যের মূল্য প্রকাশ্যে জানানো হচ্ছে না?
বিক্রেতারা অবশ্য এই প্রথার পেছনে বেশ কিছু কৌশলগত কারণ তুলে ধরেন:
প্রতিযোগিতা এড়াতে: বিক্রেতাদের যুক্তি, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পণ্যের দাম প্রকাশ্যে দিলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলো সহজেই তা জেনে কম মূল্যে একই পণ্য সরবরাহ করতে পারে। এতে তাদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
গ্রাহক ধরে রাখার কৌশল: ডিজিটাল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞরা এটিকে ‘লিড জেনারেশন’ কৌশল হিসেবে দেখেন। ইনবক্সে ক্রেতার সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়, যা বিক্রেতাকে পণ্যের বিস্তারিত তথ্য দেওয়া, অন্যান্য পণ্য দেখানো বা বিশেষ অফার দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। এতে বিক্রি বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।
মূল্যের ভিন্নতা: কিছু বিক্রেতা দাবি করেন, ক্রেতার ধরন (যেমন, নিয়মিত ক্রেতা, পাইকারি ক্রেতা) বা ডেলিভারির দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে একই পণ্যের মূল্য ভিন্ন হতে পারে। ইনবক্সে আলোচনার মাধ্যমে এই বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করা সহজ হয়।
অ্যালগরিদম সুবিধা: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর অ্যালগরিদম বেশি কমেন্ট ও ইনবক্স মেসেজকে উচ্চ ‘এনগেজমেন্ট’ হিসেবে গণ্য করে। ফলে পোস্টের প্রচার বাড়ে এবং আরও বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়। এই কারণেও অনেক বিক্রেতা ইচ্ছাকৃতভাবে দাম প্রকাশ না করে ইনবক্সে ডাকার কৌশল নেন।
তবে ক্রেতাদের অসন্তোষ ও ভোগান্তি: যদিও বিক্রেতারা বিভিন্ন কৌশলগত কারণ তুলে ধরেন, তবে অধিকাংশ ক্রেতাই এই ‘ইনবক্স সংস্কৃতি’তে বিরক্ত। তাদের মতে, পণ্যের মূল্য প্রকাশ্যে না থাকলে বিভিন্ন বিক্রেতার পণ্যের মধ্যে তুলনা করা কঠিন হয়, মূল্যবান সময় নষ্ট হয় এবং সামগ্রিকভাবে কেনাকাটার অভিজ্ঞতা অস্বচ্ছ মনে হয়। অনেক সময় এতে বিক্রেতার প্রতি আস্থাও কমে যায়।
ভোক্তা অধিকার ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন: ভোক্তা অধিকার কর্মীরা মনে করেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পণ্যের স্পষ্ট মূল্য উল্লেখ করা ক্রেতার অধিকার। এটি একদিকে যেমন তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে সহজ করে, তেমনি বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করে। মূল্য গোপন রাখা অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি করে এবং ভোক্তা স্বার্থের পরিপন্থী।
সমাধানের পথ: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিক্রেতারা চাইলে পণ্যের নির্ধারিত মূল্য প্রকাশ্যে উল্লেখ করে ডেলিভারি চার্জ, কাস্টমাইজেশন বা বিশেষ অফারের মতো বিষয়গুলো ইনবক্সে আলোচনা করতে পারেন। এতে একদিকে যেমন স্বচ্ছতা বজায় থাকে, তেমনি ক্রেতার সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগের সুযোগও অটুট থাকে।
উপসংহার: বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল ই-কমার্স খাতকে টেকসই ও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের মধ্যে আস্থা ও স্বচ্ছতা অপরিহার্য। একটি স্বাস্থ্যকর অনলাইন বাজার তৈরির জন্য পণ্যের মূল্য প্রকাশে আরও বেশি স্বচ্ছতা আনা উচিত, যা ক্রেতার অধিকার এবং ব্যবসার দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের জন্য সহায়ক হবে।
রিপোর্টারের নাম 
























