ঢাকা ০৭:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

পরিচিতের হাতে শিশুর নিরাপত্তা: মনোচিকিৎসক বলছেন, ‘এ আকস্মিক নয়, বিকৃত মানসিকতার ফল’

একজন নিষ্পাপ শিশুর ওপর যৌন সহিংসতা ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ যখন কোনো পরিচিত মুখ বা প্রতিবেশীর দ্বারা সংঘটিত হয়, তখন তা কেবল পরিবার নয়, গোটা সমাজকেই স্তম্ভিত করে দেয়। প্রশ্ন ওঠে, তাহলে বিশ্বাস করবো কাকে? সমাজের এই ভঙ্গুর চিত্র আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় এবং শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। সম্প্রতি চট্টগ্রামে আট বছর বয়সী এক শিশুকে নৃশংসভাবে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় প্রতিবেশীর জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে, যা এমন প্রশ্নগুলোকে আরও জোরালো করেছে।

এই ধরনের অপরাধের মনস্তাত্ত্বিক কারণ এবং এর পেছনের জটিলতা নিয়ে কথা বলেছেন দেশের প্রখ্যাত মনোচিকিৎসক মেখলা সরকার। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “সব মানুষ একরকম নয়। কিছু ব্যক্তির মধ্যে চরম স্বার্থপরতা দেখা যায়, যারা নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করতে যেকোনো পর্যায়ে নেমে যেতে পারে। তবে একথা মনে রাখতে হবে, বাবা-মা ছাড়া অন্য কারও হাতে সন্তানকে ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। যদি একান্তই প্রয়োজন হয়, তবে যার কাছে শিশুকে রেখে যাচ্ছেন, তার ওপর নিবিড় নজরদারি অপরিহার্য।”

মনোচিকিৎসক মেখলা সরকার আরও ব্যাখ্যা করেন, শিশুর ওপর এমন ভয়াবহ আক্রমণ বা প্রতিশোধপরায়ণ আচরণ হঠাৎ ঘটে যাওয়া বিষয় নয়। এটি কোনো আকস্মিক মানসিকতা নয়; বরং অপরাধী ব্যক্তির বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় কোথাও গুরুতর ঘাটতি থেকে যায়। মানুষের ইচ্ছার দাসত্ব এবং ইগো বা আত্মতৃপ্তি লাভের বিকৃত আকাঙ্ক্ষা এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। তিনি বলেন, “যদি কারো বিবেক শক্তিশালী থাকে, তবে বাস্তবতা সুযোগ দিলেও সে নেতিবাচক কোনো কাজ করতে পারবে না।”

মানুষ কেন এমন পৈশাচিক কাজে লিপ্ত হয়, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “অনেক ক্ষেত্রে এটি কেবল যৌন তাড়না নয়; বরং ক্ষমতা, দখল ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক বিকৃত আকাঙ্ক্ষা হিসেবে কাজ করে। গবেষণায় দেখা যায়, কিছু অপরাধীর নিজের শৈশবেই সহিংসতা, নির্যাতন বা অবহেলার অভিজ্ঞতা থাকে। যদিও এটি সবার ক্ষেত্রে অপরাধে রূপ নেয় না, তবে অমীমাংসিত মানসিক আঘাত (ট্রমা), সহানুভূতির অভাব এবং বিকৃত আত্ম-ধারণা এমন ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের কারণ হতে পারে।”

তিনি আরও যোগ করেন, চরম সহিংসতার পেছনে প্রায়শই অন্যের কষ্ট উপলব্ধি করার ক্ষমতার ঘাটতি দেখা যায়। নৈতিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে মানুষ নিজের ইচ্ছাকেই একমাত্র সত্য মনে করতে শুরু করে। কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর ব্যক্তিত্ব বিকার বা শিশু-কেন্দ্রিক যৌন আকর্ষণের মতো মানসিক সমস্যা থাকতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “সব মানসিক অসুস্থ ব্যক্তি সহিংস নন এবং অধিকাংশই কখনো অপরাধ করেন না। এমন অপরাধকে কেবল ‘পাগলামি’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি ইচ্ছাকৃত, ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও নৈতিকভাবে বিকৃত সিদ্ধান্ত; যেখানে ব্যক্তি জানে কাজটি ভুল, তবু সে তা করে।”

সম্প্রতি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আট বছর বয়সী এক শিশুকে চকলেটের লোভ দেখিয়ে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। শিশুটি চিৎকার করলে তাকে মারধর ও গলায় ছুরিকাঘাত করে মৃত ভেবে ফেলে যায় প্রতিবেশী বাবু শেখ (৪৫)। পরে পুলিশি তদন্তে এই ভয়াবহ ঘটনার মূল হোতা হিসেবে বাবু শেখকে শনাক্ত করা হয়। জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খাঁন এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য নিশ্চিত করেন, যা সমাজের পরিচিত মুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা চরম অমানবিকতার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।

এই ধরনের ঘটনা আমাদের সমাজকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করা এবং শিশুদের প্রতি সমাজের প্রতিটি স্তরে সহানুভূতি ও সতর্কতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে এবং সন্তানদের অপরিচিত বা পরিচিত, যে কারো সঙ্গেই একা ছেড়ে দেওয়ার আগে অবশ্যই সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান

পরিচিতের হাতে শিশুর নিরাপত্তা: মনোচিকিৎসক বলছেন, ‘এ আকস্মিক নয়, বিকৃত মানসিকতার ফল’

আপডেট সময় : ০৫:৩৪:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

একজন নিষ্পাপ শিশুর ওপর যৌন সহিংসতা ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ যখন কোনো পরিচিত মুখ বা প্রতিবেশীর দ্বারা সংঘটিত হয়, তখন তা কেবল পরিবার নয়, গোটা সমাজকেই স্তম্ভিত করে দেয়। প্রশ্ন ওঠে, তাহলে বিশ্বাস করবো কাকে? সমাজের এই ভঙ্গুর চিত্র আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় এবং শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। সম্প্রতি চট্টগ্রামে আট বছর বয়সী এক শিশুকে নৃশংসভাবে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় প্রতিবেশীর জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে, যা এমন প্রশ্নগুলোকে আরও জোরালো করেছে।

এই ধরনের অপরাধের মনস্তাত্ত্বিক কারণ এবং এর পেছনের জটিলতা নিয়ে কথা বলেছেন দেশের প্রখ্যাত মনোচিকিৎসক মেখলা সরকার। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “সব মানুষ একরকম নয়। কিছু ব্যক্তির মধ্যে চরম স্বার্থপরতা দেখা যায়, যারা নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করতে যেকোনো পর্যায়ে নেমে যেতে পারে। তবে একথা মনে রাখতে হবে, বাবা-মা ছাড়া অন্য কারও হাতে সন্তানকে ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। যদি একান্তই প্রয়োজন হয়, তবে যার কাছে শিশুকে রেখে যাচ্ছেন, তার ওপর নিবিড় নজরদারি অপরিহার্য।”

মনোচিকিৎসক মেখলা সরকার আরও ব্যাখ্যা করেন, শিশুর ওপর এমন ভয়াবহ আক্রমণ বা প্রতিশোধপরায়ণ আচরণ হঠাৎ ঘটে যাওয়া বিষয় নয়। এটি কোনো আকস্মিক মানসিকতা নয়; বরং অপরাধী ব্যক্তির বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় কোথাও গুরুতর ঘাটতি থেকে যায়। মানুষের ইচ্ছার দাসত্ব এবং ইগো বা আত্মতৃপ্তি লাভের বিকৃত আকাঙ্ক্ষা এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। তিনি বলেন, “যদি কারো বিবেক শক্তিশালী থাকে, তবে বাস্তবতা সুযোগ দিলেও সে নেতিবাচক কোনো কাজ করতে পারবে না।”

মানুষ কেন এমন পৈশাচিক কাজে লিপ্ত হয়, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “অনেক ক্ষেত্রে এটি কেবল যৌন তাড়না নয়; বরং ক্ষমতা, দখল ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক বিকৃত আকাঙ্ক্ষা হিসেবে কাজ করে। গবেষণায় দেখা যায়, কিছু অপরাধীর নিজের শৈশবেই সহিংসতা, নির্যাতন বা অবহেলার অভিজ্ঞতা থাকে। যদিও এটি সবার ক্ষেত্রে অপরাধে রূপ নেয় না, তবে অমীমাংসিত মানসিক আঘাত (ট্রমা), সহানুভূতির অভাব এবং বিকৃত আত্ম-ধারণা এমন ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের কারণ হতে পারে।”

তিনি আরও যোগ করেন, চরম সহিংসতার পেছনে প্রায়শই অন্যের কষ্ট উপলব্ধি করার ক্ষমতার ঘাটতি দেখা যায়। নৈতিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে মানুষ নিজের ইচ্ছাকেই একমাত্র সত্য মনে করতে শুরু করে। কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর ব্যক্তিত্ব বিকার বা শিশু-কেন্দ্রিক যৌন আকর্ষণের মতো মানসিক সমস্যা থাকতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “সব মানসিক অসুস্থ ব্যক্তি সহিংস নন এবং অধিকাংশই কখনো অপরাধ করেন না। এমন অপরাধকে কেবল ‘পাগলামি’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি ইচ্ছাকৃত, ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও নৈতিকভাবে বিকৃত সিদ্ধান্ত; যেখানে ব্যক্তি জানে কাজটি ভুল, তবু সে তা করে।”

সম্প্রতি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আট বছর বয়সী এক শিশুকে চকলেটের লোভ দেখিয়ে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। শিশুটি চিৎকার করলে তাকে মারধর ও গলায় ছুরিকাঘাত করে মৃত ভেবে ফেলে যায় প্রতিবেশী বাবু শেখ (৪৫)। পরে পুলিশি তদন্তে এই ভয়াবহ ঘটনার মূল হোতা হিসেবে বাবু শেখকে শনাক্ত করা হয়। জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খাঁন এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য নিশ্চিত করেন, যা সমাজের পরিচিত মুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা চরম অমানবিকতার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।

এই ধরনের ঘটনা আমাদের সমাজকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করা এবং শিশুদের প্রতি সমাজের প্রতিটি স্তরে সহানুভূতি ও সতর্কতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে এবং সন্তানদের অপরিচিত বা পরিচিত, যে কারো সঙ্গেই একা ছেড়ে দেওয়ার আগে অবশ্যই সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।