ঢাকা ১১:৪২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

১৫ লাখের বদলে সাত লাখ টাকা ঘুস নিয়ে আসায় আটক

## শিরোনাম: ঘুষের লেনদেনে শিক্ষক আটক: ১৫ লাখের চুক্তিতে সাত লাখ নিয়ে ধরা

রংপুর: মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা কার্যালয়ের উপপরিচালকের (ডিডি) কাছে ঘুষ দিতে এসে এক শিক্ষক পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, ১৫ লাখ টাকার চুক্তির বিপরীতে মাত্র সাত লাখ টাকা নিয়ে যাওয়ায় এই শিক্ষককে ধরা হয়। ঘটনাটি গত ১৬ ফেব্রুয়ারি রংপুরে ঘটে।

বিস্তারিত:

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার কাজাইকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাইদুল ইসলাম খান, তার স্ত্রী জাহানারা বেগমের অভিযোগ, শিক্ষা অফিসের কম্পিউটার অপারেটর আশরাফ আলীর সঙ্গে এমপিওভুক্তির জন্য ১৫ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। এই টাকা জোগাড় করতে মাইদুল জমি বন্ধক ও গরু বিক্রি করেন। কিন্তু চুক্তির চেয়ে কম টাকা, অর্থাৎ সাত লাখ টাকা নিয়ে যাওয়ায় তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

মাইদুলের স্ত্রী জাহানারা বেগম গত বুধবার নিজ এলাকায় সংবাদ সম্মেলন করে এ অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, “টাকা কম হওয়ায় তাকে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।”

একাধিক সূত্রমতে, কাজাইকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ও তিনজন কর্মচারীকে এমপিওভুক্ত করার জন্য উপপরিচালক রোকসানা বেগমের কম্পিউটার অপারেটর আশরাফের সঙ্গে ১৫ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু মাইদুল মাত্র সাত লাখ টাকা নিয়ে আসায় তাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়।

জেলা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শিক্ষক আশরাফের মাধ্যমে চুক্তি করে টাকা নিয়ে এসেছিলেন। তাদের চুক্তি অনুযায়ী ১৫ লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু টাকা কম দেওয়ায় তাকে ধরিয়ে দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা আরও জানান, উপপরিচালক রোকসানা বেগম সরাসরি কোনো টাকা নেন না, বরং কম্পিউটার অপারেটর আশরাফের মাধ্যমেই সব কাজ করেন। আশরাফকে সঙ্গে নিয়েই তিনি বিভিন্ন জায়গায় বদলি হয়েছেন এবং অনেক কাজ করিয়েছেন। এমপিওভুক্তির মতো কাজগুলোও তিনি আশরাফকে দিয়ে করান। তাদের মতে, আশরাফের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলে কাজ হয়। বিষয়টি তদন্ত করলে আসল সত্য বেরিয়ে আসবে।

এ বিষয়ে আঞ্চলিক পরিচালক আমির আলী বলেন, “এখানে ডাল মে কুচ কালা হ্যায়। তদন্ত করলে অনেক কিছুই বেরিয়ে আসবে।”

উপপরিচালক রোকসানা বেগম ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, “ভোটের দুদিন আগে তিনি (মাইদুল) অফিসে এসেছিলেন। এরপর ঘটনার দিন আবার আসেন। তিনি বলেন, ‘ম্যাডাম, আপনার সঙ্গে একটি কথা আছে।’ তিনি একটি মোবাইল মেসেজ দেখান, যেখানে লেখা ছিল- ‘এক শিক্ষকের জন্য পাঁচ লাখ টাকা ও তিন কর্মচারীর জন্য তিন লাখ টাকা এখানে আছে।’ তিনি আমাকে একটি প্যাকেটও দেন, যা খুলে দেখি সব টাকা। বিষয়টি আমি রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে ফোন দিয়ে অবগত করি।”

তিনি আরও বলেন, কাজাইকাটা স্কুলটি ২০২০ সাল থেকে এমপিওভুক্ত। সেখানে দুই-তিনজন কর্মচারী ও একজন শিক্ষকের নাম এমপিওভুক্তিতে আসেনি। তারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। আমি বলেছিলাম, নিয়মের বাইরে যেতে পারব না।

কম্পিউটার অপারেটর আশরাফ এ বিষয়ে বলেন, “আমার নিজের কাজ আমি নিজে করি। আমার চোখ ছাড়া কাউকে বিশ্বাস করি না। কাজ করার সময় কেউ না কেউ তো সহযোগিতা করতেই পারে। এটা দোষের কিছু নয়।” তিনি ১৫ লাখ টাকার চুক্তির বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, “আমি কেমন এটা সবাই জানে। আমার কোনো টাকা-পয়সার দরকার নেই। কেউ কোনোদিন বলতে পারবে না আমি কোনো ঘুষ নিয়েছি। এটা কেউ বলে থাকলে প্রমাণ করে দেখাক।”

ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার করে মাইদুল ইসলাম বলেন, “ভোটের আগেও আমি অফিসে গিয়েছিলাম। তখন না করছিলেন। আমি ভেবেছিলাম কিছু টাকা দিলে হয়তো কাজটা করে দেবেন। সেজন্য ব্যাগে করে সাত লাখ টাকা নিয়ে আসি তাকে দেওয়ার জন্য।”

রংপুর জেলা দুদকের উপপরিচালক শাওন মিয়া জানান, উপপরিচালক রোকসানা বেগম ফোন করে জানান শিক্ষা অফিসে একজন টাকা নিয়ে এসেছেন। এ কথা শুনে তিনি একজন অফিসারকে সেখানে পাঠান। রংপুর কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। জিডি অনুযায়ী পুলিশ ব্যবস্থা নিয়েছে। পুলিশ এটি তাদের কাছে পাঠালে তারা তদন্ত করবেন।

রংপুর কোতোয়ালি থানার ওসি শাহাজন আলী বলেন, শিক্ষা অফিসের ডিডি ফোন করে ঘুষের বিষয়টি জানান। আমরা সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে দেখি তার রুমে একজন বসে আছেন কালো ব্যাগ নিয়ে। সেখানে সাত লাখ টাকা পাওয়া যায়। তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করা হয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান-ইসরাইল সংঘাত: ইসরাইলের দাবি, আকাশপথে ২০০০টির বেশি বোমা বর্ষণ

১৫ লাখের বদলে সাত লাখ টাকা ঘুস নিয়ে আসায় আটক

আপডেট সময় : ১০:০০:০৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬

## শিরোনাম: ঘুষের লেনদেনে শিক্ষক আটক: ১৫ লাখের চুক্তিতে সাত লাখ নিয়ে ধরা

রংপুর: মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা কার্যালয়ের উপপরিচালকের (ডিডি) কাছে ঘুষ দিতে এসে এক শিক্ষক পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, ১৫ লাখ টাকার চুক্তির বিপরীতে মাত্র সাত লাখ টাকা নিয়ে যাওয়ায় এই শিক্ষককে ধরা হয়। ঘটনাটি গত ১৬ ফেব্রুয়ারি রংপুরে ঘটে।

বিস্তারিত:

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার কাজাইকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাইদুল ইসলাম খান, তার স্ত্রী জাহানারা বেগমের অভিযোগ, শিক্ষা অফিসের কম্পিউটার অপারেটর আশরাফ আলীর সঙ্গে এমপিওভুক্তির জন্য ১৫ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। এই টাকা জোগাড় করতে মাইদুল জমি বন্ধক ও গরু বিক্রি করেন। কিন্তু চুক্তির চেয়ে কম টাকা, অর্থাৎ সাত লাখ টাকা নিয়ে যাওয়ায় তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

মাইদুলের স্ত্রী জাহানারা বেগম গত বুধবার নিজ এলাকায় সংবাদ সম্মেলন করে এ অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, “টাকা কম হওয়ায় তাকে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।”

একাধিক সূত্রমতে, কাজাইকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ও তিনজন কর্মচারীকে এমপিওভুক্ত করার জন্য উপপরিচালক রোকসানা বেগমের কম্পিউটার অপারেটর আশরাফের সঙ্গে ১৫ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু মাইদুল মাত্র সাত লাখ টাকা নিয়ে আসায় তাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়।

জেলা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শিক্ষক আশরাফের মাধ্যমে চুক্তি করে টাকা নিয়ে এসেছিলেন। তাদের চুক্তি অনুযায়ী ১৫ লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু টাকা কম দেওয়ায় তাকে ধরিয়ে দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা আরও জানান, উপপরিচালক রোকসানা বেগম সরাসরি কোনো টাকা নেন না, বরং কম্পিউটার অপারেটর আশরাফের মাধ্যমেই সব কাজ করেন। আশরাফকে সঙ্গে নিয়েই তিনি বিভিন্ন জায়গায় বদলি হয়েছেন এবং অনেক কাজ করিয়েছেন। এমপিওভুক্তির মতো কাজগুলোও তিনি আশরাফকে দিয়ে করান। তাদের মতে, আশরাফের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলে কাজ হয়। বিষয়টি তদন্ত করলে আসল সত্য বেরিয়ে আসবে।

এ বিষয়ে আঞ্চলিক পরিচালক আমির আলী বলেন, “এখানে ডাল মে কুচ কালা হ্যায়। তদন্ত করলে অনেক কিছুই বেরিয়ে আসবে।”

উপপরিচালক রোকসানা বেগম ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, “ভোটের দুদিন আগে তিনি (মাইদুল) অফিসে এসেছিলেন। এরপর ঘটনার দিন আবার আসেন। তিনি বলেন, ‘ম্যাডাম, আপনার সঙ্গে একটি কথা আছে।’ তিনি একটি মোবাইল মেসেজ দেখান, যেখানে লেখা ছিল- ‘এক শিক্ষকের জন্য পাঁচ লাখ টাকা ও তিন কর্মচারীর জন্য তিন লাখ টাকা এখানে আছে।’ তিনি আমাকে একটি প্যাকেটও দেন, যা খুলে দেখি সব টাকা। বিষয়টি আমি রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে ফোন দিয়ে অবগত করি।”

তিনি আরও বলেন, কাজাইকাটা স্কুলটি ২০২০ সাল থেকে এমপিওভুক্ত। সেখানে দুই-তিনজন কর্মচারী ও একজন শিক্ষকের নাম এমপিওভুক্তিতে আসেনি। তারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। আমি বলেছিলাম, নিয়মের বাইরে যেতে পারব না।

কম্পিউটার অপারেটর আশরাফ এ বিষয়ে বলেন, “আমার নিজের কাজ আমি নিজে করি। আমার চোখ ছাড়া কাউকে বিশ্বাস করি না। কাজ করার সময় কেউ না কেউ তো সহযোগিতা করতেই পারে। এটা দোষের কিছু নয়।” তিনি ১৫ লাখ টাকার চুক্তির বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, “আমি কেমন এটা সবাই জানে। আমার কোনো টাকা-পয়সার দরকার নেই। কেউ কোনোদিন বলতে পারবে না আমি কোনো ঘুষ নিয়েছি। এটা কেউ বলে থাকলে প্রমাণ করে দেখাক।”

ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার করে মাইদুল ইসলাম বলেন, “ভোটের আগেও আমি অফিসে গিয়েছিলাম। তখন না করছিলেন। আমি ভেবেছিলাম কিছু টাকা দিলে হয়তো কাজটা করে দেবেন। সেজন্য ব্যাগে করে সাত লাখ টাকা নিয়ে আসি তাকে দেওয়ার জন্য।”

রংপুর জেলা দুদকের উপপরিচালক শাওন মিয়া জানান, উপপরিচালক রোকসানা বেগম ফোন করে জানান শিক্ষা অফিসে একজন টাকা নিয়ে এসেছেন। এ কথা শুনে তিনি একজন অফিসারকে সেখানে পাঠান। রংপুর কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। জিডি অনুযায়ী পুলিশ ব্যবস্থা নিয়েছে। পুলিশ এটি তাদের কাছে পাঠালে তারা তদন্ত করবেন।

রংপুর কোতোয়ালি থানার ওসি শাহাজন আলী বলেন, শিক্ষা অফিসের ডিডি ফোন করে ঘুষের বিষয়টি জানান। আমরা সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে দেখি তার রুমে একজন বসে আছেন কালো ব্যাগ নিয়ে। সেখানে সাত লাখ টাকা পাওয়া যায়। তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করা হয়।