ইরানজুড়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতার মধ্যে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ৮৬ বছর বয়সী এই আধ্যাত্মিক নেতার কার্যালয় ও আবাসিক কমপ্লেক্সের সন্নিকটে বিস্ফোরণের খবরের পর তাঁর নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে নানা সমীকরণ। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—ইরানের শাসনব্যবস্থায় খামেনির প্রভাব কতটুকু এবং কেন তিনি প্রতিপক্ষের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হলেন।
ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি ও পরিচয়
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার আসনে আসীন। তিনি আধুনিক ইরানের স্থপতি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির উত্তরসূরি। ১৯৭৯ সালে খোমেনির নেতৃত্বে সংঘটিত ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে দেশটিতে দীর্ঘদিনের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত শাসক মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ক্ষমতাচ্যুত হন।
ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামো অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতাই রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। নির্বাহী বিভাগ, সামরিক বাহিনী এবং বিচার বিভাগ—সবকিছুর ওপরই রয়েছে তাঁর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ। যদিও দেশটিতে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও সংসদ রয়েছে, তবে জাতীয় নিরাপত্তা এবং কৌশলগত যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে খামেনির সিদ্ধান্তই শেষ কথা হিসেবে গণ্য হয়। একইসঙ্গে তিনি দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক নেতা।
শাসনকাল ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ
আয়াতুল্লাহ খামেনির দীর্ঘ শাসনামলে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছে। বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশটির ওপর আরোপিত কঠোর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরান দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে। এই অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনিক কঠোরতার বিরুদ্ধে দেশটির অভ্যন্তরে একাধিকবার বড় ধরনের বিক্ষোভ দানা বেঁধেছে। তবে খামেনির ক্ষমতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে দেশটির শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি) এবং আধাসামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’। বিশ্লেষকদের মতে, এই বাহিনীগুলোর একনিষ্ঠ আনুগত্যই তাঁকে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছে।
পারমাণবিক বিতর্ক
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। খামেনি বরাবরই দাবি করে আসছেন যে, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং তাদের এই কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত। আন্তর্জাতিক পরমাণু তদারকি সংস্থাগুলোও এখন পর্যন্ত ইরান কর্তৃক পারমাণবিক বোমা তৈরির কোনো অকাট্য প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। তবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে এবং এটিকে বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে।
কেন তিনি লক্ষ্যবস্তু?
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্ব বিভিন্ন সময় খামেনিকে লক্ষ্য করে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের অবসান ঘটলেই মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ইতি ঘটতে পারে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে খামেনিকে সরাসরি ‘স্বৈরশাসক’ আখ্যা দিয়ে তাঁর অস্তিত্বের ওপর প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও খামেনিকে একাধিকবার সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, ইরানে সরকার পরিবর্তনই দেশটির সাধারণ মানুষের জন্য সেরা পরিণতি নিয়ে আসতে পারে। সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে মানসিকভাবে দুর্বল করতেই খামেনিকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। কৌশলগতভাবে শীর্ষ নেতৃত্বকে অকার্যকর করতে পারলে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা সম্ভব—এমন ধারণা থেকেই এই চাপ তৈরি করা হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্রের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক হামলার পর নিরাপত্তাজনিত কারণে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে কোনো একটি গোপন ও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে তাঁর বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তেহরানের এই নীরবতা এবং চলমান উত্তেজনা খামেনিকে ঘিরে তৈরি হওয়া জল্পনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 




















