বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বিবর্তন কেবল শিল্প বা নন্দনতত্ত্বের ইতিহাস নয়; বরং এটি ক্ষমতা, আধিপত্য এবং মতাদর্শিক লড়াইয়ের এক দীর্ঘ আখ্যান। বিশিষ্ট চিন্তাবিদ আবুল মনসুর আহমদ তাঁর ‘বাংলাদেশের কালচার’ গ্রন্থে ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ’ বা কালচারাল ফ্যাসিজমের যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে। তাঁর মতে, সংস্কৃতি যখন কেবল একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির হাতিয়ার হয়ে ওঠে এবং অন্য সব ভিন্নমতকে দমনের চেষ্টা করে, তখনই তা ফ্যাসিবাদের রূপ নেয়। এই তাত্ত্বিক ভিত্তি থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে এক গভীর সংকটের চিত্র ফুটে ওঠে।
সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ মূলত এমন একটি আধিপত্যবাদী ব্যবস্থা, যেখানে একটি বিশেষ গোষ্ঠী নিজেদের রুচি ও মতাদর্শকে ‘প্রগতিশীল’ ও ‘বৈধ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এই প্রক্রিয়ায় বহুত্ববাদকে অস্বীকার করা হয় এবং লোকজ, ধর্মীয় কিংবা প্রান্তিক জীবনবোধকে ‘অনগ্রসর’ বা ‘অশিল্প’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আবুল মনসুর আহমদ লক্ষ্য করেছিলেন, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে শহুরে উচ্চবিত্ত শ্রেণি গ্রামীণ ও লোকজ সংস্কৃতিকে অবমূল্যায়ন করে এক ধরনের কৃত্রিম আভিজাত্য তৈরি করেছিল। এই প্রবণতা পরবর্তীকালেও বহাল ছিল, যেখানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক ‘তালিকা’ তৈরি করা হতো এবং এর বাইরে থাকা শিল্পীদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত করা হতো।
বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের আমলে সাহিত্যের একটি বড় অংশ হয়ে উঠেছিল ক্ষমতার অলংকার। এই ধারার সাহিত্যিকরা বাস্তবের ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নকে আড়াল করে শাসকের বন্দনায় মত্ত ছিলেন। সাহিত্য তখন সত্যের আয়না না হয়ে পরিণত হয়েছিল এক নান্দনিক প্রচারযন্ত্রে। উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার মিথ তৈরি করতে গিয়ে জনমানুষের আর্তনাদকে সেখানে সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। অবশ্য এই তোষামোদ সবসময় স্বেচ্ছায় ছিল না; সেন্সরশিপ ও ভয়ের সংস্কৃতির কারণে অনেক লেখক নীরব থাকতে বাধ্য হয়েছেন অথবা রূপকের আশ্রয়ে সত্য প্রকাশ করেছেন। তবে ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম হলো, তোষামোদি সাহিত্য কখনো কালজয়ী হয় না; ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথেই তার আবেদন নিঃশেষ হয়ে যায়।
জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে সাহিত্যের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এই সাহিত্য কি কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের ডায়েরি হবে, নাকি বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের বাহক হয়ে উঠবে? আবুল মনসুর আহমদের ভাষায়, জাতীয় বিপ্লবের পথ ধরেই গণবিপ্লবে পৌঁছাতে হয়। বিপ্লবোত্তর সাহিত্যে এখন এক ধরনের ‘স্লোগান-আসক্তি’ ও আবেগের আতিশয্য দেখা যাচ্ছে। শহিদদের রক্ত ও আন্দোলনের বীরত্বগাথাকে অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তরের চেষ্টাও লক্ষণীয়। কিন্তু প্রকৃত বিপ্লবী সাহিত্য কেবল আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; বরং তা শোষণের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে এবং ক্ষমতার নবায়নের পথ রুদ্ধ করতে সচেষ্ট হয়।
বিপ্লবোত্তর সাহিত্যের সার্থকতা নির্ভর করছে এর অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রের ওপর। কেবল মধ্যবিত্ত বা শহুরে বুদ্ধিজীবীদের কণ্ঠস্বর নয়, এতে প্রান্তিক মানুষ, নারী, শ্রমজীবী এবং গ্রামীণ জীবনের জটিল বাস্তবতার প্রতিফলন থাকতে হবে। সাহিত্যকে যদি প্রকৃত অর্থেই ইতিহাসের বিবেক হতে হয়, তবে তাকে কেবল ক্ষমতার পালাবদলের সাক্ষী হলে চলবে না; বরং মানুষের নৈতিক ও দার্শনিক মুক্তির পথ দেখাতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের অন্ধকার কাটিয়ে একটি বহুস্বরী ও সহনশীল সমাজ বিনির্মাণে সাহিত্যের ভূমিকা অপরিসীম। তোষামোদের সংস্কৃতি ত্যাগ করে সাহসের সাথে সত্য উচ্চারণ এবং শিল্পরীতির আধুনিকায়নই পারে বিপ্লবোত্তর সাহিত্যকে কালজয়ী করে তুলতে। সংস্কৃতি যদি মানুষের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন হয়, তবে সেই আয়নায় যেন সমাজের প্রতিটি মানুষের চেহারা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে—এটাই হোক আগামীর প্রত্যাশা।
রিপোর্টারের নাম 























