ঢাকা ০২:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ইনকিলাব: শুধু একটি শব্দ নয়, শত বছরের সংগ্রাম ও প্রতিরোধের প্রতীক

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:৪২:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

সম্প্রতি ‘ইনকিলাব’ শব্দটি আবারও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। এর আভিধানিক, পারিভাষিক কিংবা দার্শনিক অর্থ নিয়ে বিতর্ক না থাকলেও, শব্দটির প্রায়োগিক ব্যবহার এবং দীর্ঘ সংগ্রামমুখর অতীত ইতিহাসই মূল আলোচনার বিষয়। এই একটি শব্দ কেবল ধ্বনি নয়, বরং শত শত জীবন ও জনপদের কান্না, নিপীড়িত আত্মার ব্যথা এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে। এটি শোষকের বুকে কাঁপন ধরানো এক বিপ্লবী উচ্চারণ, যা সাধারণ মানুষের কাছে হয়ে উঠেছে অধিকার আদায়ের হাতিয়ার।

এই শব্দটি একদা সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসের মতো একটি জনগোষ্ঠীকে জাগিয়ে তুলেছিল, প্লাবিত করেছিল এই অঞ্চলের যাপিত জীবন ও জনপদকে। ইনকিলাবকে ধারণ করেই মজলুম জনতা শাসক ও শোষকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল, নিপীড়ন ও নিষ্পেষণের শেকল ভাঙার শপথ নিয়েছিল। এটি ধারণ করেই ১৯৬৭ সালে নকশালবাড়ির দলিত-মথিত কৃষক সম্প্রদায় বিপ্লবে-বিদ্রোহে জ্বলে উঠেছিল, যার দাবানল বহু জীবন ও জনপদে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই বিদ্রোহ বুলেটের মাধ্যমে দমন করা হলেও, তার রক্তঝরা ইতিহাস লেখা আছে কবিতা ও কথাসাহিত্যের পাতায় পাতায়। সমরেশ মজুমদারের ‘উত্তরাধিকার’, অরুন্ধতী রায়ের ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ এবং মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’ উপন্যাসের চরিত্রগুলো সেই বিদ্রোহ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। আজও এই সাহিত্যকর্মগুলোর পাতা উল্টালে সহস্র মানুষ ও মায়ের আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হতে শোনা যায়। ইনকিলাব শব্দ তাই কেবল একটি ধ্বনি নয়, এটি মূলত মানুষের ব্যথা, বেদনা, আর্তনাদ ও আহাজারির এক জীবন্ত ইতিহাস।

আজও মজলুম জনতা ইনকিলাব শব্দের মধ্য দিয়ে তাদের পূর্বপুরুষের বেদনাময় ইতিহাসকেই স্মরণ করে, স্মরণ করে হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন ও সাধনাকে। এই শব্দের মধ্য দিয়ে নিষ্পেষিত জনতা তাদের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ফিরে পেতে চায়, নিপীড়িত কণ্ঠের সঙ্গেই কণ্ঠ মেলাতে চায়। আজও এই শব্দকে ধারণ করেই জনতা সমুদ্রের জোয়ারের মতো মিছিল নিয়ে রাজপথে নেমে আসে, হাতে হাত রেখে কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়। আজও মজলুম জনতা কণ্ঠের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে সমস্বরে প্রতিধ্বনি তোলে—ইনকিলাব ইনকিলাব, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ। এই শব্দকে ধারণ করেই একসময় এই বাংলায় এসেছিল বর্ষাবিপ্লব।

মূলত এই শব্দের বিপ্লবী আবেদনই একশ্রেণির মানুষের হৃদয়ে ভয়, শঙ্কা ও সংশয় তৈরি করে। তাদের সাধের আসন টলে ওঠে। শোষক সম্প্রদায় তখন এই শব্দটিকে ভয় পায় এবং নানা অজুহাতে বাতিল করতে চায়। শব্দ বাতিলের মধ্য দিয়ে তারা মূলত মজলুমের কণ্ঠস্বর নিভিয়ে দিতে চায়, নিস্তব্ধ করে দিতে চায়। তারা তাদের নিপীড়ন ও নিষ্পেষণের রক্তচিহ্ন ইতিহাসের খেরোখাতা থেকে মুছে ফেলতে চায়। শুধু ইনকিলাব নয়, ‘রিফরমেশন’ বা সংস্কারের মতো শব্দও এই দেশে তেমন সমাদর পায় না। অর্থাৎ, একশ্রেণির সুবিধাবাদী সম্প্রদায় সবকিছু আলবৎ আগের মতোই রেখে দিতে চায়, কোনো মৌলিক পরিবর্তনকে তারা স্বাগত জানাতে প্রস্তুত নয়।

জীবনানন্দ দাশের সেই সুচেতনাকে সম্বোধন করে লেখা পংক্তিগুলি আজও প্রাসঙ্গিক: “সুচেতনা, এই পথে আলো জ্বেলে এ পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে / সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ।” হয়তো আমাদের দেশে আজও সেই মনীষীর আগমন ঘটেনি, কবে আসবে তাও বলা কঠিন। তবুও, মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় মানুষ ইনকিলাব ধারণ করে আশায় বুক বাঁধে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ঢাবি ছাত্রদল নেতাকে শোকজ, ভিডিও বার্তায় ‘বিস্ময়’ প্রকাশ

ইনকিলাব: শুধু একটি শব্দ নয়, শত বছরের সংগ্রাম ও প্রতিরোধের প্রতীক

আপডেট সময় : ১২:৪২:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সম্প্রতি ‘ইনকিলাব’ শব্দটি আবারও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। এর আভিধানিক, পারিভাষিক কিংবা দার্শনিক অর্থ নিয়ে বিতর্ক না থাকলেও, শব্দটির প্রায়োগিক ব্যবহার এবং দীর্ঘ সংগ্রামমুখর অতীত ইতিহাসই মূল আলোচনার বিষয়। এই একটি শব্দ কেবল ধ্বনি নয়, বরং শত শত জীবন ও জনপদের কান্না, নিপীড়িত আত্মার ব্যথা এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে। এটি শোষকের বুকে কাঁপন ধরানো এক বিপ্লবী উচ্চারণ, যা সাধারণ মানুষের কাছে হয়ে উঠেছে অধিকার আদায়ের হাতিয়ার।

এই শব্দটি একদা সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসের মতো একটি জনগোষ্ঠীকে জাগিয়ে তুলেছিল, প্লাবিত করেছিল এই অঞ্চলের যাপিত জীবন ও জনপদকে। ইনকিলাবকে ধারণ করেই মজলুম জনতা শাসক ও শোষকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল, নিপীড়ন ও নিষ্পেষণের শেকল ভাঙার শপথ নিয়েছিল। এটি ধারণ করেই ১৯৬৭ সালে নকশালবাড়ির দলিত-মথিত কৃষক সম্প্রদায় বিপ্লবে-বিদ্রোহে জ্বলে উঠেছিল, যার দাবানল বহু জীবন ও জনপদে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই বিদ্রোহ বুলেটের মাধ্যমে দমন করা হলেও, তার রক্তঝরা ইতিহাস লেখা আছে কবিতা ও কথাসাহিত্যের পাতায় পাতায়। সমরেশ মজুমদারের ‘উত্তরাধিকার’, অরুন্ধতী রায়ের ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ এবং মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’ উপন্যাসের চরিত্রগুলো সেই বিদ্রোহ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। আজও এই সাহিত্যকর্মগুলোর পাতা উল্টালে সহস্র মানুষ ও মায়ের আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হতে শোনা যায়। ইনকিলাব শব্দ তাই কেবল একটি ধ্বনি নয়, এটি মূলত মানুষের ব্যথা, বেদনা, আর্তনাদ ও আহাজারির এক জীবন্ত ইতিহাস।

আজও মজলুম জনতা ইনকিলাব শব্দের মধ্য দিয়ে তাদের পূর্বপুরুষের বেদনাময় ইতিহাসকেই স্মরণ করে, স্মরণ করে হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন ও সাধনাকে। এই শব্দের মধ্য দিয়ে নিষ্পেষিত জনতা তাদের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ফিরে পেতে চায়, নিপীড়িত কণ্ঠের সঙ্গেই কণ্ঠ মেলাতে চায়। আজও এই শব্দকে ধারণ করেই জনতা সমুদ্রের জোয়ারের মতো মিছিল নিয়ে রাজপথে নেমে আসে, হাতে হাত রেখে কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়। আজও মজলুম জনতা কণ্ঠের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে সমস্বরে প্রতিধ্বনি তোলে—ইনকিলাব ইনকিলাব, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ। এই শব্দকে ধারণ করেই একসময় এই বাংলায় এসেছিল বর্ষাবিপ্লব।

মূলত এই শব্দের বিপ্লবী আবেদনই একশ্রেণির মানুষের হৃদয়ে ভয়, শঙ্কা ও সংশয় তৈরি করে। তাদের সাধের আসন টলে ওঠে। শোষক সম্প্রদায় তখন এই শব্দটিকে ভয় পায় এবং নানা অজুহাতে বাতিল করতে চায়। শব্দ বাতিলের মধ্য দিয়ে তারা মূলত মজলুমের কণ্ঠস্বর নিভিয়ে দিতে চায়, নিস্তব্ধ করে দিতে চায়। তারা তাদের নিপীড়ন ও নিষ্পেষণের রক্তচিহ্ন ইতিহাসের খেরোখাতা থেকে মুছে ফেলতে চায়। শুধু ইনকিলাব নয়, ‘রিফরমেশন’ বা সংস্কারের মতো শব্দও এই দেশে তেমন সমাদর পায় না। অর্থাৎ, একশ্রেণির সুবিধাবাদী সম্প্রদায় সবকিছু আলবৎ আগের মতোই রেখে দিতে চায়, কোনো মৌলিক পরিবর্তনকে তারা স্বাগত জানাতে প্রস্তুত নয়।

জীবনানন্দ দাশের সেই সুচেতনাকে সম্বোধন করে লেখা পংক্তিগুলি আজও প্রাসঙ্গিক: “সুচেতনা, এই পথে আলো জ্বেলে এ পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে / সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ।” হয়তো আমাদের দেশে আজও সেই মনীষীর আগমন ঘটেনি, কবে আসবে তাও বলা কঠিন। তবুও, মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় মানুষ ইনকিলাব ধারণ করে আশায় বুক বাঁধে।