মাগরিবের আজান পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে পিনপতন নীরবতা। হাজারো হাত মোনাজাতে মগ্ন। এরপর আজানের ধ্বনি কানে পৌঁছাতেই শুরু হয় ইফতার। চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদে প্রতিদিন এভাবেই রচিত হয় সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য উপাখ্যান। দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে চলা এই গণইফতারে ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ ভুলে একই কাতারে বসেন হাজার হাজার মানুষ।
চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানা এলাকায় অবস্থিত এই মসজিদটি মোগল স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। ১৬৬৭ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে তৎকালীন সুবাদার শায়েস্তা খাঁ এটি নির্মাণ করেন। বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই মসজিদে গণইফতারের সূচনা হয় ২০০১ সালে। মসজিদের খতিব মাওলানা সাইয়্যেদ মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন তাহের জাবেরী আল মাদানির উদ্যোগে সৌদি আরবের আদলে এই বিশাল আয়োজন শুরু হয়। সময়ের পরিক্রমায় এটি এখন চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান রমজান ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, রমজান শুরুর পর থেকেই আন্দরকিল্লা এলাকায় এক উৎসবমুখর কর্মব্যস্ততা বিরাজ করে। প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষের ইফতারের আয়োজন করা হয় এখানে। তবে ২০ রমজানের পর এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সামলাতে সাহরির পর থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন ২০ জন স্বেচ্ছাসেবক ও ১০-১২ জন বাবুর্চি। প্রতিদিন প্রায় ১২ থেকে ১৪ পদের ইফতার সামগ্রী পরিবেশন করা হয়। এর মধ্যে থাকে ছোলা, মুড়ি, খেজুর, পেঁয়াজু, বেগুনিসহ নানা পদের ফলমূল। তৃষ্ণা মেটাতে প্রস্তুত করা হয় প্রায় এক হাজার লিটার শরবত। ঋতুভেদে শরবতের ধরনেও আসে ভিন্নতা; গরমে লেবু-চিনি আর শীতে রুহ আফজার আধিপত্য থাকে।
এই বিশাল আয়োজনের ব্যয়ভার মেটানো হয় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত দানে। আন্দরকিল্লা ও খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা নাম প্রকাশ না করেই রিকশা বা ভ্যানে করে পাঠিয়ে দেন চাল, ডাল, তেল, মুড়ি ও খেজুরের বস্তা। কেউবা আবার বাসা থেকে তৈরি করে আনেন হালিম, জিলাপি বা পায়েস। মসজিদের দুটি গুদামে সবসময় অন্তত ১০ দিনের ইফতার সামগ্রী মজুত রাখা হয়, যাতে আয়োজনে কোনো বিঘ্ন না ঘটে।
ইফতারের আগে আসর নামাজের পর থেকেই মুসল্লিদের সমাগম শুরু হয়। এ সময় দেশের বরেণ্য আলেমরা কোরআন ও হাদিসের আলোকে জীবন গঠনের ওপর আলোচনা করেন। ইফতারের এই মাহফিল কেবল মুসলিমদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; অনেক সময় আশপাশের হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাও এখান থেকে ইফতার গ্রহণ করেন। কেউ মসজিদে বসে খান, আবার কেউ ইফতার নিয়ে যান পরিবারের জন্য।
এখানে ইফতার করতে আসা শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের মতে, আন্দরকিল্লা শাহী মসজিদের এই গণইফতার কেবল ক্ষুধা মেটানোর মাধ্যম নয়, বরং এটি আত্মিক প্রশান্তি ও সামাজিক সাম্যের এক বড় পাঠশালা। শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত ব্যবসায়ী—সবার একই দস্তরখানে বসে ইফতার করার এই দৃশ্য ধর্মীয় সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে কয়েক দশক ধরে। মাগরিবের নামাজের আগেই পুরো চত্বর পরিষ্কার করে জামাতের জন্য প্রস্তুত করা হয়, যা এই সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনারই অংশ।
রিপোর্টারের নাম 






















