রমজান মাস শুরু হওয়ার প্রথম সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও সিলেট মহানগরীর নিত্যপণ্যের বাজারে এখনও পর্যন্ত কোনো স্বস্তি ফেরেনি। নির্ধারিত মূল্যতালিকা থাকা সত্ত্বেও মাংস, মাছ, ফলমূল এবং শাকসবজির দামে লাগামহীন অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক তৎপরতার কথা বলা হলেও, সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ, পণ্যের দাম এখনও তাদের নাগালের বাইরে। ফলে, খেটে খাওয়া নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ বাজার করতে গিয়ে চরম হিমশিম খাচ্ছেন।
নগরীর বন্দরবাজার, ব্রহ্মময়ীবাজার, আম্বরখানা, মদিনা মার্কেট, সুবিদবাজার এবং কাজিরবাজার ঘুরে দেখা গেছে, শাকসবজির দামে কিছুটা স্বস্তি এলেও মাছ, মাংস এবং ফলমূলের দাম এখনও বেশ চড়া। বিশেষ করে মাংসের বাজারে নির্ধারিত দামের কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। রমজানের শুরুতে মাংসের চাহিদা বৃদ্ধির অজুহাতে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
রমজান শুরুর প্রথমদিকে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে প্রায় ২৫ টাকা বেড়ে যায়। বর্তমানে তা স্থানভেদে ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংসের কেজি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১২০০ থেকে ১২৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত খাসির মাংসের পরিবর্তে অন্য মাংস বিক্রিরও অভিযোগ উঠেছে। মাছের বাজারেও কেজিপ্রতি ২৫ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।
ফলমূলের বাজারও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। মাঝারি আকারের কলা হালি ৩০-৪০ টাকা, আপেল ৩৫০ টাকা, সাদা ও কালো আঙুর ৫০০-৫৫০ টাকা এবং কমলা ৩৫০-৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
লেবু ও শসার দামেও অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। কয়েকদিন আগে ৩০-৪০ টাকা হালি বিক্রি হওয়া লেবু বর্তমানে আকারভেদে ৮০-১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শসা কেজিপ্রতি ৮০-১০০ টাকা, যা রমজান শুরু হওয়ার আগে মাত্র ৩০-৪০ টাকার মধ্যে ছিল। ব্যবসায়ীরা পাইকারি বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে খুচরা পর্যায়ে এর প্রভাব পড়েছে বলে দাবি করছেন।
নগরীর তালতলা এলাকার বাসিন্দা সুলেমান আলী বলেন, “রমজান এলেই বাজারে চাপ বাড়ে, তবে এবার দাম আরও আগেই বেড়েছে। নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজারদরের কোনো মিল নেই। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এটি একটি বাড়তি চাপ তৈরি করছে।”
এদিকে, রমজানের আগে নগরভবনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাই রাফিন সরকার রমজানে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির আহ্বান জানিয়েছিলেন। সভায় গরুর মাংস ৭৫০ টাকা, মহিষের মাংস ৬৫০ টাকা, খাসির মাংস এক হাজার ১০০ টাকা, ছাগল ও ভেড়ার মাংস এক হাজার টাকা, সোনালি মুরগি ৩১০ টাকা এবং পোল্ট্রি মুরগি ১৭০ টাকা কেজি নির্ধারণ করা হয়েছিল। মূল্যতালিকা প্রদর্শন এবং নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল। কিছু ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হলেও পণ্যের দামে কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েনি। ফলে, সাধারণ মানুষ এখনও কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ দোকানে মূল্যতালিকা টানানো হয়নি। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রির অভিযোগ করেছেন ক্রেতারা। একই বাজারে ভিন্ন দোকানে ভিন্ন দামে মাংস বিক্রি হতে দেখা গেছে।
দাড়িয়াপাড়ার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মুসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, “সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য রক্ষা এবং নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা গেলে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতো। এখন রোজাদারদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষ কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।”
এ বিষয়ে সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাই রাফিন সরকার জানান, “মোবাইল কোর্ট পরিচালনা হচ্ছে। নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে মাংস বিক্রি করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে, দায়িত্ব নেওয়ার পর বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির বলেছেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ে কোনো ‘সাউন্ড বাইট’ নয়, কাজের মাধ্যমে ফল দেখানো হবে। তিনি জানিয়েছেন, রমজানের পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং বাজার তদারকিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, রমজান ও পরবর্তী সময়ের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত সরকারের হাতে রয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে, বাজার নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বাজার তদারকি ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
রিপোর্টারের নাম 






















