ঢাকা ০২:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাউজানের বালু সাম্রাজ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত: ১৪ মাসে অর্ধশত সংঘর্ষ, নিহত ২, হাতবদল নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক মেরুকরণ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:৩১:০৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

চট্টগ্রামের রাউজানে বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে গত ১৪ মাসে অন্তত অর্ধশত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন দুজন এবং আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। একসময় ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এসব বালুমহাল এখন বিএনপির নেতাকর্মীদের দখলে চলে যাওয়ায় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে অবৈধ বালু উত্তোলন ও পাহাড়-টিলা কেটে সাবাড় করায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত রাউজান উপজেলা এখন ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে।

দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী এবং আসামের লুসাই পাহাড় থেকে নেমে আসা কর্ণফুলী নদীবেষ্টিত রাউজান উপজেলা ২৪৮.৫৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের একটি জনপদ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগমুহূর্ত পর্যন্ত বালুমহালগুলোর একক নিয়ন্ত্রণ ছিল সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিমের অনুসারীদের হাতে। পরবর্তীকালে সব বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের হাতে। এই হাতবদলকে কেন্দ্র করেই গত ১৪ মাসে অর্ধশতাধিকবার সংঘাত ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যার ফলশ্রুতিতে দুজন খুনের শিকার হয়েছেন।

বর্তমানে রাউজান উপজেলার অন্তত ২৫টি পয়েন্ট থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। অথচ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বালুমহালের সংখ্যা মাত্র ১০টি এবং এর মধ্যে ইজারা রয়েছে মাত্র চারটি। কর্ণফুলী নদীতে ৪ কোটি ঘনফুটের একটি বৃহৎ বালুমহালের ইজারা থাকলেও, ২ লাখ ৫০ হাজার বর্গফুটের আরেকটি বালুমহালের ইজারা না থাকা সত্ত্বেও সেখানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে।

এছাড়া, ইজারা নেই ডাবুয়া খালের বালু উত্তোলন-১ ও বালু উত্তোলন-২, রাউজান খাল পশ্চিম রাউজান মৌজা, সর্তা খালের চিকদাইর অংশ ও নোয়াজিষপুর অংশ, এবং ফটিকছড়ি ছড়া বালুমহালে। ইজারাকৃত কর্ণফুলী নদী বালুমহাল-১, সর্তা খালের উত্তর সর্তা বালুমহাল-১ ও সর্তা খালের উত্তর সর্তা বালুমহাল-২-এর ক্ষেত্রেও ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে একাধিক পয়েন্ট থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এর ফলে নদীপাড়ে বসবাসকারী বহু পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। পাঁচখাইন গ্রামের বাসিন্দা যুবদলকর্মী মো. সাব্বির হোসেন অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী সরকার আমলে কর্ণফুলীর ব্রিক ফিল্ড এলাকা থেকে যুগীপাড়া স্লুইসগেট পর্যন্ত বালু উত্তোলন করতেন বোয়ালখালীর এক আওয়ামী লীগ নেতা। সরকার পতনের পর তিনি আত্মগোপনে গেলেও তার ভাই বিএনপির কয়েকজন সহযোগীর মাধ্যমে বর্তমানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত রেখেছেন।

হালদা নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং মৎস্য প্রজনন বাড়াতে সরকার বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ করলেও, মাছ শিকার ও বালু উত্তোলন ঠেকানো যাচ্ছে না। গত পাঁচ বছরে এর কারণে ৪৫টি ডলফিন এবং শতাধিক মা মাছের মৃত্যু হয়েছে। হালদা নদীর আবুরখীল নাপিতের ঘাট, সত্তারঘাট এলাকা, মোবারকখিল, দক্ষিণ গহিরা ও ঈছাপুর সড়কের লোহার ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় অবাধে বালু উত্তোলন চলছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, কর্ণফুলী নদীর কালুরঘাট ব্রিজ থেকে রাউজান, বোয়ালখালী ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলার শিলক ইউনিয়ন পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার পানিপথে বড় বড় সাদা বালুর পাহাড় তৈরি হয়েছে। রাউজান উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নের পাঁচখাইন স্লুইসগেট, ইউনিয়ন পরিষদের সামনে, লাম্বুরহাট স্লুইসগেট ও খেলারঘাট এলাকার সড়কের পাশে প্রায় ছয়টি পয়েন্টে কয়েক লাখ ঘনফুটের বিশাল বালুর স্তূপ দেখা গেছে।

মাটি ও বালুর ব্যবসা নিয়ে সংঘটিত খুনের ঘটনাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, হলদিয়া ইউনিয়নে বালু-মাটি ব্যবসার দ্বন্দ্বে যুবদল নেতা কমর উদ্দিন জিতু খুন হন। অপরদিকে, কর্ণফুলী নদীতে বালুর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ দ্বন্দ্বে খুন হন বিএনপি কর্মী আবদুল হাকিম চৌধুরী।

এ বিষয়ে রাউজান উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন ফাহিম বলেন, ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করলে যেকোনো নদীর ক্ষতি হয়, একইভাবে হালদা নদীরও ক্ষতি হচ্ছে। রাউজান-রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের এএসপি বেলায়েত হোসেন জানান, রাউজানের খুনোখুনির ঘটনায় অনেক আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে এবং অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম রাহাতুল ইসলাম বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শহীদ ওসমান হাদির স্মরণে আলিয়ার দেয়ালে গ্রাফিতি: বিচারের দাবিতে সোচ্চার শিক্ষার্থীরা

রাউজানের বালু সাম্রাজ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত: ১৪ মাসে অর্ধশত সংঘর্ষ, নিহত ২, হাতবদল নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক মেরুকরণ

আপডেট সময় : ১২:৩১:০৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

চট্টগ্রামের রাউজানে বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে গত ১৪ মাসে অন্তত অর্ধশত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন দুজন এবং আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। একসময় ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এসব বালুমহাল এখন বিএনপির নেতাকর্মীদের দখলে চলে যাওয়ায় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে অবৈধ বালু উত্তোলন ও পাহাড়-টিলা কেটে সাবাড় করায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত রাউজান উপজেলা এখন ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে।

দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী এবং আসামের লুসাই পাহাড় থেকে নেমে আসা কর্ণফুলী নদীবেষ্টিত রাউজান উপজেলা ২৪৮.৫৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের একটি জনপদ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগমুহূর্ত পর্যন্ত বালুমহালগুলোর একক নিয়ন্ত্রণ ছিল সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিমের অনুসারীদের হাতে। পরবর্তীকালে সব বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের হাতে। এই হাতবদলকে কেন্দ্র করেই গত ১৪ মাসে অর্ধশতাধিকবার সংঘাত ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যার ফলশ্রুতিতে দুজন খুনের শিকার হয়েছেন।

বর্তমানে রাউজান উপজেলার অন্তত ২৫টি পয়েন্ট থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। অথচ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বালুমহালের সংখ্যা মাত্র ১০টি এবং এর মধ্যে ইজারা রয়েছে মাত্র চারটি। কর্ণফুলী নদীতে ৪ কোটি ঘনফুটের একটি বৃহৎ বালুমহালের ইজারা থাকলেও, ২ লাখ ৫০ হাজার বর্গফুটের আরেকটি বালুমহালের ইজারা না থাকা সত্ত্বেও সেখানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে।

এছাড়া, ইজারা নেই ডাবুয়া খালের বালু উত্তোলন-১ ও বালু উত্তোলন-২, রাউজান খাল পশ্চিম রাউজান মৌজা, সর্তা খালের চিকদাইর অংশ ও নোয়াজিষপুর অংশ, এবং ফটিকছড়ি ছড়া বালুমহালে। ইজারাকৃত কর্ণফুলী নদী বালুমহাল-১, সর্তা খালের উত্তর সর্তা বালুমহাল-১ ও সর্তা খালের উত্তর সর্তা বালুমহাল-২-এর ক্ষেত্রেও ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে একাধিক পয়েন্ট থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এর ফলে নদীপাড়ে বসবাসকারী বহু পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। পাঁচখাইন গ্রামের বাসিন্দা যুবদলকর্মী মো. সাব্বির হোসেন অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী সরকার আমলে কর্ণফুলীর ব্রিক ফিল্ড এলাকা থেকে যুগীপাড়া স্লুইসগেট পর্যন্ত বালু উত্তোলন করতেন বোয়ালখালীর এক আওয়ামী লীগ নেতা। সরকার পতনের পর তিনি আত্মগোপনে গেলেও তার ভাই বিএনপির কয়েকজন সহযোগীর মাধ্যমে বর্তমানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত রেখেছেন।

হালদা নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং মৎস্য প্রজনন বাড়াতে সরকার বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ করলেও, মাছ শিকার ও বালু উত্তোলন ঠেকানো যাচ্ছে না। গত পাঁচ বছরে এর কারণে ৪৫টি ডলফিন এবং শতাধিক মা মাছের মৃত্যু হয়েছে। হালদা নদীর আবুরখীল নাপিতের ঘাট, সত্তারঘাট এলাকা, মোবারকখিল, দক্ষিণ গহিরা ও ঈছাপুর সড়কের লোহার ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় অবাধে বালু উত্তোলন চলছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, কর্ণফুলী নদীর কালুরঘাট ব্রিজ থেকে রাউজান, বোয়ালখালী ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলার শিলক ইউনিয়ন পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার পানিপথে বড় বড় সাদা বালুর পাহাড় তৈরি হয়েছে। রাউজান উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নের পাঁচখাইন স্লুইসগেট, ইউনিয়ন পরিষদের সামনে, লাম্বুরহাট স্লুইসগেট ও খেলারঘাট এলাকার সড়কের পাশে প্রায় ছয়টি পয়েন্টে কয়েক লাখ ঘনফুটের বিশাল বালুর স্তূপ দেখা গেছে।

মাটি ও বালুর ব্যবসা নিয়ে সংঘটিত খুনের ঘটনাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, হলদিয়া ইউনিয়নে বালু-মাটি ব্যবসার দ্বন্দ্বে যুবদল নেতা কমর উদ্দিন জিতু খুন হন। অপরদিকে, কর্ণফুলী নদীতে বালুর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ দ্বন্দ্বে খুন হন বিএনপি কর্মী আবদুল হাকিম চৌধুরী।

এ বিষয়ে রাউজান উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন ফাহিম বলেন, ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করলে যেকোনো নদীর ক্ষতি হয়, একইভাবে হালদা নদীরও ক্ষতি হচ্ছে। রাউজান-রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের এএসপি বেলায়েত হোসেন জানান, রাউজানের খুনোখুনির ঘটনায় অনেক আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে এবং অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম রাহাতুল ইসলাম বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।