সীতাকুণ্ডে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ: ৯ ড্রেজার জব্দ, ১৩ জন আটক
চট্টগ্রাম: সীতাকুণ্ডে সমুদ্র উপকূল থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে কৃষিজমি ভরাটের রমরমা ব্যবসা অবশেষে বন্ধ করেছে উপজেলা প্রশাসন। দীর্ঘ দিন ধরে স্থানীয়দের অভিযোগ এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের পর টনক নড়ে প্রশাসনের। গতকাল বৃহস্পতিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত মোবাইল কোর্টে ৯টি ড্রেজার জব্দ এবং বাল্ক হেডের ১৩ জনকে আটক করা হয়েছে।
প্রশাসনের অভিযান ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ:
সীতাকুণ্ড উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নে সমুদ্র উপকূল থেকে কৃষিজমি ভরাটের জন্য অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর উপজেলা প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মামুন তাৎক্ষণিকভাবে সরেজমিনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। তিনি সমুদ্র উপকূল থেকে বালু উত্তোলন এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে কৃষিজমিতে বালু ভরাটের সকল কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম জানান, সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে বালু উত্তোলন ও জমি ভরাট কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে। খাস জমি যথাযথ বন্দোবস্ত ছাড়া ভরাটের কোনো সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট জমির শ্রেণি পরিবর্তন, খাস জমির পরিমাণ এবং নথিপত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বন্দরের শর্ত ভঙ্গ ও পরিবেশের উপর প্রভাব:
বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পুনরায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাদিয়া আফরিন কচি এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মামুন যৌথভাবে এই অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে ৯টি ড্রেজার জব্দ এবং বাল্ক হেডের ১৩ জনকে আটক করা হয়েছে। অভিযানের খবর পেয়ে অনেকেই পালিয়ে যায়।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বন্দর কর্তৃপক্ষ উপকূলের নির্দিষ্ট স্থান থেকে বালু উত্তোলনের সীমিত অনুমতি দিলেও সাগরের ভেতর থেকে বালু উত্তোলনের কোনো অনুমতি নেই। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বন্দরের দেওয়া শর্ত ভঙ্গ করে এই অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল।
দীর্ঘদিনের অভিযোগ ও বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে কার্যক্রম:
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীতাকুণ্ড উপজেলার কুমিরা, বাঁশবাড়িয়া, মুরাদপুর ও সৈয়দপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছিল। বিশেষ করে গত এক মাস ধরে বড় পাইপলাইনের মাধ্যমে সাগর থেকে বালু তুলে দুই ও তিন ফসলি উর্বর জমি ভরাট করা হচ্ছিল। সৈয়দপুর ইউনিয়নের পশ্চিম সৈয়দপুর সমুদ্র উপকূল, বাঁশবাড়িয়া নড়ালিয়া সড়কের শেষ প্রান্তের সাগর তীর, কুমিরা ইউনিয়নের আকিলপুর ও আলেকদিয়া ব্রিজ সংলগ্ন দক্ষিণ পাশ, বাড়বকুণ্ড সী বীচ, মুরাদপুর ইউনিয়নের গুলিয়াখালী সি বিচ, হাসনাবাদ ও ভাটের খীল এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে এই কার্যক্রম চলছিল।
জেলেদের জীবন-জীবিকা ও আর্থিক সংকট:
সৈয়দপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের জলদাস পাড়ার বাসিন্দা মৃদুল চন্দ্র দাস জানান, সোনাইছড়ি ইউনিয়নের শীতলপুর থেকে সৈয়দপুর ইউনিয়নের বগাচতর পর্যন্ত শতাধিক ড্রেজার দিন-রাত সাগর থেকে বালু উত্তোলন করছে। এতে জেলেরা স্বাভাবিকভাবে মাছ আহরণ করতে পারছে না। তাদের শতাধিক মাছ ধরার জাল ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। ফলে অনেক জেলে সাময়িকভাবে মাছ ধরা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন এবং আর্থিক সংকটে পড়েছেন। এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে স্মারকলিপিও দিয়েছেন তারা।
শিল্পায়নের নামে কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন ও অবৈধ ভরাট:
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৩ সালের নভেম্বরে ৪৬.৮৮ একর জমির শ্রেণি কৃষি থেকে শিল্পে পরিবর্তন করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুই ও তিন ফসলি জমির নাল থেকে শিল্পে শ্রেণি পরিবর্তন করা হয়েছে। ওই শিল্প শ্রেণির জমিকে ভিত্তি দেখিয়ে আশপাশের আরও কয়েকশ একর আবাদি জমি ভরাটের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ভরাট হওয়া অংশের মধ্যে আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ একর সরকারি খাস জমিও রয়েছে, যার কোনো বৈধ বন্দোবস্ত নেওয়া হয়নি।
প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ:
অভিযোগ উঠেছে, প্যাসিফিক জিন্সের কর্ণধার ও আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর কারখানার নামে কৃষিজমি ভরাট করছেন। এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
পরিবেশ ও খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা:
অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে শুধু কৃষিজমিই নয়, উপকূলীয় পরিবেশ ও মৎস্যসম্পদও হুমকির মুখে পড়েছিল। কৃষকদের আশঙ্কা, উর্বর জমি ভরাট হয়ে গেলে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং স্থানীয় কৃষিনির্ভর অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এতে শত শত কৃষক বেকার হয়ে পড়ারও আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসনের এই পদক্ষেপ অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে একটি বড় বার্তা বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
রিপোর্টারের নাম 





















