ঢাকা ০৩:৪০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভাষার সীমানা ও ইতিহাসের উত্তরাধিকার: শব্দ যখন জনমানুষের কণ্ঠস্বর

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৩০:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

ভাষা কোনো স্থবির জলাশয় নয়, বরং এক প্রবহমান নদী। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে নানা স্রোত এসে মিশে একে পূর্ণতা দেয়। গ্রিক মহাকাব্যের বীর এনিয়াস যেমন ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রাচীন ঐতিহ্য কাঁধে নিয়ে নতুন এক রোমান সভ্যতার ভিত্তি গড়েছিলেন, ভাষাও ঠিক তেমনি ভিন্ন ভিন্ন উৎসের শব্দকে নিজের করে নিয়ে সমৃদ্ধ হয়। যা একসময় ‘বহিরাগত’ ছিল, কালের পরিক্রমায় তা-ই হয়ে ওঠে স্থানীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও এই ধ্রুব সত্যটি সমভাবে প্রযোজ্য।

বাংলা ভাষার গঠনতন্ত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের ফসল। পাল-সেন যুগের সংস্কৃত-প্রাকৃত ভিত্তি থেকে শুরু করে তুর্কি-আফগান ও মোগল আমলের আরবি-ফারসি এবং ঔপনিবেশিক আমলের ইংরেজি—সব মিলিয়েই আজকের আধুনিক বাংলা। উনিশ শতকের নবজাগরণে যখন এই ভাষা নতুন রূপ পায়, তখন থেকেই এতে ‘ইনসাফ’ ও ‘ন্যায়’ কিংবা ‘জালিম’ ও ‘অত্যাচারী’র মতো দ্বৈত শব্দভান্ডার সহাবস্থান করছে। কোনো একটি ধারাকে বাদ দেওয়া মানে হলো আমাদের হাজার বছরের ইতিহাসের একটি বিশাল অংশকে অস্বীকার করা। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কালচারাল ইরেজার’ বা সাংস্কৃতিক চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা বলা যেতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত ভাষার প্রাণশক্তিকেই সংকীর্ণ করে তোলে।

সাম্প্রতিক সময়ে ‘ইনকিলাব’, ‘আজাদি’ বা ‘ইনসাফ’-এর মতো শব্দগুলোকে ‘পাকিস্তানি’ তকমা দিয়ে বর্জনের একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে ভাষাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। এই শব্দগুলো কেবল কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের সম্পত্তি নয়; বরং এগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সাহিত্য, সুফি ঐতিহ্য এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। মোগল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন—সর্বত্রই এই শব্দগুলোর সরব উপস্থিতি ছিল। ভাষাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘লেক্সিক্যাল নেটিভাইজেশন’—অর্থাৎ শব্দ উৎসে বিদেশি হলেও ব্যবহারের মাধ্যমে তা স্বদেশে পরিণত হয়েছে। যেমন ‘শহীদ’ বা ‘মিনার’ শব্দগুলো আজ আমাদের জাতীয় আবেগের অংশ, ঠিক তেমনি ‘ইনকিলাব’ বা ‘মজলুম’ শব্দগুলোও এ দেশের মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামের ভাষা।

২০২৪-এর গণআন্দোলনে এই শব্দগুলোর পুনরুত্থান এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যখন কোনো জনপদ স্বৈরাচার বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তখন তারা এমন শব্দ খুঁজে নেয় যা ঐতিহাসিকভাবেই প্রতিরোধের প্রতীক। ‘ইনকিলাব’ কেবল একটি শব্দ নয়, এটি পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। ‘ইনসাফ’ কেবল বিচার নয়, এটি নৈতিকতার দাবি। আন্দোলনরত জনতা যখন এই শব্দগুলো ব্যবহার করে, তখন তা উৎসের সীমানা ছাড়িয়ে ব্যবহারকারীর নিজস্ব সম্পদে পরিণত হয়। শেকশপিয়ারের ‘দ্য টেম্পেস্ট’ নাটকের ক্যালিবান চরিত্রটি যেমন তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া ভাষাকেই প্রতিবাদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল, বাংলার সাধারণ মানুষও ঐতিহাসিকভাবে প্রাপ্ত শব্দগুলোকে নতুন রাজনৈতিক অর্থে পুনর্নির্মাণ করেছে।

ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই শব্দগুলো বাংলা ব্যাকরণ ও বাক্যরীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে গেছে। ‘ইনসাফ চাই’ বা ‘জালিমের বিরুদ্ধে’—এই বাক্যগুলোর গঠনশৈলী সম্পূর্ণ বাংলা। তাই এগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। ভাষার সৌন্দর্যই হলো তার বহুস্বরিক প্রকৃতি। যারা ভাষাগত শুদ্ধতাবাদের দোহাই দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু শব্দকে বর্জন করতে চান, তারা মূলত ভাষার প্রকাশক্ষমতাকেই কমিয়ে ফেলছেন। ‘ন্যায়’ ও ‘ইনসাফ’ কিংবা ‘মুক্তি’ ও ‘আজাদি’—এই শব্দজোড়াগুলো বাংলা ভাষাকে যে গভীরতা ও বৈচিত্র্য দিয়েছে, তা পৃথিবীর খুব কম ভাষাতেই দেখা যায়।

পরিশেষে বলা যায়, ভাষা কোনো খাঁচায় বন্দি করার বিষয় নয়। এটি মানুষের কান্না, সংগ্রাম এবং স্বপ্নের ধারক। যে শব্দগুলো রক্তের ইতিহাস বহন করে, জনমানুষের আবেগ ধারণ করে, তাকে কৃত্রিমভাবে ‘বিদেশি’ বলে দূরে ঠেলে দেওয়া যায় না। বাংলা ভাষা এক বিশাল নদীর মতো, যার গভীরতা তৈরি হয়েছে অসংখ্য তটরেখার পলি দিয়ে। এই বহুত্ববাদই আমাদের অহংকার। ভাষাকে ভালোবাসা মানে তার সমস্ত উত্তরাধিকারকে গ্রহণ করা—যেখানে প্রতিটি শব্দই মানুষের অধিকার ও ইনসাফের কথা বলে। শব্দ যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হাতিয়ার হয়, তখন তার কোনো ভৌগোলিক সীমানা থাকে না; সে হয়ে ওঠে সর্বজনীন এবং গভীরভাবে মানবিক।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজনগরে ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধ: ছুরিকাঘাতে হিফজ বিভাগের ছাত্র নিহত

ভাষার সীমানা ও ইতিহাসের উত্তরাধিকার: শব্দ যখন জনমানুষের কণ্ঠস্বর

আপডেট সময় : ০৯:৩০:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভাষা কোনো স্থবির জলাশয় নয়, বরং এক প্রবহমান নদী। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে নানা স্রোত এসে মিশে একে পূর্ণতা দেয়। গ্রিক মহাকাব্যের বীর এনিয়াস যেমন ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রাচীন ঐতিহ্য কাঁধে নিয়ে নতুন এক রোমান সভ্যতার ভিত্তি গড়েছিলেন, ভাষাও ঠিক তেমনি ভিন্ন ভিন্ন উৎসের শব্দকে নিজের করে নিয়ে সমৃদ্ধ হয়। যা একসময় ‘বহিরাগত’ ছিল, কালের পরিক্রমায় তা-ই হয়ে ওঠে স্থানীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও এই ধ্রুব সত্যটি সমভাবে প্রযোজ্য।

বাংলা ভাষার গঠনতন্ত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের ফসল। পাল-সেন যুগের সংস্কৃত-প্রাকৃত ভিত্তি থেকে শুরু করে তুর্কি-আফগান ও মোগল আমলের আরবি-ফারসি এবং ঔপনিবেশিক আমলের ইংরেজি—সব মিলিয়েই আজকের আধুনিক বাংলা। উনিশ শতকের নবজাগরণে যখন এই ভাষা নতুন রূপ পায়, তখন থেকেই এতে ‘ইনসাফ’ ও ‘ন্যায়’ কিংবা ‘জালিম’ ও ‘অত্যাচারী’র মতো দ্বৈত শব্দভান্ডার সহাবস্থান করছে। কোনো একটি ধারাকে বাদ দেওয়া মানে হলো আমাদের হাজার বছরের ইতিহাসের একটি বিশাল অংশকে অস্বীকার করা। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কালচারাল ইরেজার’ বা সাংস্কৃতিক চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা বলা যেতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত ভাষার প্রাণশক্তিকেই সংকীর্ণ করে তোলে।

সাম্প্রতিক সময়ে ‘ইনকিলাব’, ‘আজাদি’ বা ‘ইনসাফ’-এর মতো শব্দগুলোকে ‘পাকিস্তানি’ তকমা দিয়ে বর্জনের একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে ভাষাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। এই শব্দগুলো কেবল কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের সম্পত্তি নয়; বরং এগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সাহিত্য, সুফি ঐতিহ্য এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। মোগল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন—সর্বত্রই এই শব্দগুলোর সরব উপস্থিতি ছিল। ভাষাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘লেক্সিক্যাল নেটিভাইজেশন’—অর্থাৎ শব্দ উৎসে বিদেশি হলেও ব্যবহারের মাধ্যমে তা স্বদেশে পরিণত হয়েছে। যেমন ‘শহীদ’ বা ‘মিনার’ শব্দগুলো আজ আমাদের জাতীয় আবেগের অংশ, ঠিক তেমনি ‘ইনকিলাব’ বা ‘মজলুম’ শব্দগুলোও এ দেশের মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামের ভাষা।

২০২৪-এর গণআন্দোলনে এই শব্দগুলোর পুনরুত্থান এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যখন কোনো জনপদ স্বৈরাচার বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তখন তারা এমন শব্দ খুঁজে নেয় যা ঐতিহাসিকভাবেই প্রতিরোধের প্রতীক। ‘ইনকিলাব’ কেবল একটি শব্দ নয়, এটি পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। ‘ইনসাফ’ কেবল বিচার নয়, এটি নৈতিকতার দাবি। আন্দোলনরত জনতা যখন এই শব্দগুলো ব্যবহার করে, তখন তা উৎসের সীমানা ছাড়িয়ে ব্যবহারকারীর নিজস্ব সম্পদে পরিণত হয়। শেকশপিয়ারের ‘দ্য টেম্পেস্ট’ নাটকের ক্যালিবান চরিত্রটি যেমন তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া ভাষাকেই প্রতিবাদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল, বাংলার সাধারণ মানুষও ঐতিহাসিকভাবে প্রাপ্ত শব্দগুলোকে নতুন রাজনৈতিক অর্থে পুনর্নির্মাণ করেছে।

ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই শব্দগুলো বাংলা ব্যাকরণ ও বাক্যরীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে গেছে। ‘ইনসাফ চাই’ বা ‘জালিমের বিরুদ্ধে’—এই বাক্যগুলোর গঠনশৈলী সম্পূর্ণ বাংলা। তাই এগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। ভাষার সৌন্দর্যই হলো তার বহুস্বরিক প্রকৃতি। যারা ভাষাগত শুদ্ধতাবাদের দোহাই দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু শব্দকে বর্জন করতে চান, তারা মূলত ভাষার প্রকাশক্ষমতাকেই কমিয়ে ফেলছেন। ‘ন্যায়’ ও ‘ইনসাফ’ কিংবা ‘মুক্তি’ ও ‘আজাদি’—এই শব্দজোড়াগুলো বাংলা ভাষাকে যে গভীরতা ও বৈচিত্র্য দিয়েছে, তা পৃথিবীর খুব কম ভাষাতেই দেখা যায়।

পরিশেষে বলা যায়, ভাষা কোনো খাঁচায় বন্দি করার বিষয় নয়। এটি মানুষের কান্না, সংগ্রাম এবং স্বপ্নের ধারক। যে শব্দগুলো রক্তের ইতিহাস বহন করে, জনমানুষের আবেগ ধারণ করে, তাকে কৃত্রিমভাবে ‘বিদেশি’ বলে দূরে ঠেলে দেওয়া যায় না। বাংলা ভাষা এক বিশাল নদীর মতো, যার গভীরতা তৈরি হয়েছে অসংখ্য তটরেখার পলি দিয়ে। এই বহুত্ববাদই আমাদের অহংকার। ভাষাকে ভালোবাসা মানে তার সমস্ত উত্তরাধিকারকে গ্রহণ করা—যেখানে প্রতিটি শব্দই মানুষের অধিকার ও ইনসাফের কথা বলে। শব্দ যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হাতিয়ার হয়, তখন তার কোনো ভৌগোলিক সীমানা থাকে না; সে হয়ে ওঠে সর্বজনীন এবং গভীরভাবে মানবিক।