পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক রাজনীতিতে নেতৃত্বের সফলতাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা প্রধানত দুটি মানদণ্ডে বিচার করেন—ব্যক্তিগত প্রজ্ঞা ও সামষ্টিক দূরদৃষ্টি। রাষ্ট্রনায়োকচিত দৃষ্টিভঙ্গি এবং টেকসই প্রতিষ্ঠান গড়ার সামর্থ্যের ওপরই নির্ভর করে একটি জাতির অগ্রযাত্রা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত ও জরুরি ইস্যু হলো ভেঙে পড়া শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার। গত আগস্টের গণবিপ্লবের পর জনআকাঙ্ক্ষার যে প্রতিফলন ঘটেছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বৈষম্যহীন এক নতুন শিক্ষাব্যবস্থা। সেই লক্ষ্য পূরণে বর্তমান সরকারের শিক্ষা প্রশাসনে যে রদবদল ও নতুন নেতৃত্ব এসেছে, তা নিয়ে জনমনে আশার সঞ্চার হয়েছে।
দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতায় দেশের প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি স্তর আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। দলীয়করণ, নিয়োগ বাণিজ্য, এবং অপরিকল্পিত পাঠ্যসূচির পরীক্ষা-নিরীক্ষায় শিক্ষাঙ্গনগুলো তাদের মর্যাদা হারিয়েছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত কলেজগুলোর অব্যবস্থাপনা এবং জেলাভিত্তিক যত্রতত্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ফলে শিক্ষার গুণগত মান তলানিতে ঠেকেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বড় একটি অংশ কেবল সনদ বিতরণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যা বাজার বা রাষ্ট্রের প্রকৃত চাহিদা পূরণে ব্যর্থ। কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষাতেও দেখা দিয়েছে চরম স্থবিরতা। দক্ষ শিক্ষকের অভাব এবং সেকেলে ব্যবস্থাপনার কারণে শিক্ষার্থীরা ভাষাগত দক্ষতা ও মৌলিক বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়ছে, যা জাতীয় উন্নয়নের জন্য এক অশনিসংকেত।
দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, যে ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটল, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তাদের শিক্ষায় ফিরিয়ে নেওয়ার কার্যকর উদ্যোগ ছিল সীমিত। প্রায় ১৭ মাস ধরে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের মাঠে থাকায় শিখন ঘাটতি প্রকট হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কিছু কমিটি ও কমিশন গঠন করলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সমন্বয়ের অভাবে সেগুলো আলোর মুখ দেখেনি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবই বিতরণে বিলম্ব এবং শিক্ষকদের বেতন-ভাতা সংক্রান্ত অসন্তোষ শিক্ষাক্ষেত্রে অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে একটি ‘হ-য-ব-র-ল’ পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই নতুন নির্বাচিত সরকারকে দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়েছে।
তবে নতুন সরকারের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের দায়িত্ব গ্রহণকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। অতীতে পাবলিক পরীক্ষায় নকল রোধ ও শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা ফেরাতে তার কঠোর অবস্থান দেশজুড়ে প্রশংসিত হয়েছিল। তার সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ববি হাজ্জাজ এবং উপদেষ্টা হিসেবে ড. মাহদী আমিনের মতো উচ্চশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি ‘সঠিক কাজে সঠিক ব্যক্তি’ নিয়োগের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই নতুন টিমের সামনে এখন প্রধান কাজ হলো—নকল ও প্রশ্ন ফাঁসের সংস্কৃতি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা এবং শিক্ষকদের মর্যাদা ও ন্যায্য দাবি পূরণ করে তাদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে নেওয়া।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে বিশ্বমানে উন্নীত করতে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া, গবেষণায় বিশেষ গুরুত্বারোপ এবং মাতৃভাষায় আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটানো অপরিহার্য। পাশাপাশি ছাত্র সংসদের নির্বাচনের মাধ্যমে সুস্থ ধারার নেতৃত্ব তৈরি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। একটি জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠনের মাধ্যমে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে তবেই ‘জ্ঞানই শক্তি’—এই দর্শনের প্রতিফলন ঘটবে। বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করে একটি মেধাবী ও মানবিক প্রজন্ম গড়ে তোলাই হবে নতুন নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা।
রিপোর্টারের নাম 























