ঢাকা ১২:৪০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ওসমানীনগরে নির্বাচনি সিসি ক্যামেরা প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম: কাঠগড়ায় ইউএনও

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:০৬:৫৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

সিলেটের ওসমানীনগরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটকেন্দ্র ও জনবহুল এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনমুন নাহার আশার বিরুদ্ধে নিজের আত্মীয়কে ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া, কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই বিল উত্তোলন এবং নির্ধারিত বাজেটের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ বরাদ্দের মতো গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরাপত্তা জোরদার করতে উপজেলার ৫৪টি ভোটকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই প্রকল্পের জন্য ইউনিয়ন পরিষদের ১ শতাংশ উন্নয়ন তহবিল থেকে প্রায় ৪৪ লাখ ৭০ হাজার ৯৯৭ টাকার একটি বিশাল বাজেট প্রণয়ন করেন ইউএনও। অথচ নির্বাচন কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রতিটি কেন্দ্রে ৬টি ক্যামেরা স্থাপনে ব্যয় হওয়ার কথা মাত্র ৩২ হাজার ৮০০ টাকা। সেই হিসেবে ৫৪টি কেন্দ্রে মোট খরচ হওয়ার কথা ১৭ লাখ ৭১ হাজার ২০০ টাকা। কমিশনের হিসাবের তুলনায় প্রায় ২৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত বাজেট দেখিয়ে অর্থ তছরুপের পায়তারা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি কেন্দ্রের জন্য বরাদ্দকৃত ৬ লাখ ৫৬ হাজার টাকা কোনো কাজ না করেই গত ১০ ফেব্রুয়ারি অগ্রিম বিল হিসেবে উত্তোলন করে নিয়েছেন ইউএনও মুনমুন নাহার আশা। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা অনিমেশ পাল। এছাড়া যেসব বাজারে আগে থেকেই ক্যামেরা ছিল, সেখানেও নতুন করে বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। দুর্নীতির বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর গত ২২ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে তড়িঘড়ি করে তাজপুর বাজারের বিভিন্ন পয়েন্টে লোকদেখানো ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শুরু হয়।

প্রকল্পের ঠিকাদার নিয়োগ নিয়েও উঠেছে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, জেলা প্রশাসকের দোহাই দিয়ে কাগজে-কলমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দেখানো হলেও বাস্তবে সব কাজ করেছেন ইউএনওর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ফখরুল ইসলাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার এই ঠিকাদার তার প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স সাইফুল এন্টারপ্রাইজ’-এর মাধ্যমে কাজগুলো সম্পাদন করেন এবং কাজ চলাকালীন তিনি ইউএনওর সরকারি বাংলোতেই অবস্থান করতেন।

এদিকে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বিলে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কবির আহমদ ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, প্রকল্প বাস্তবায়ন বা ঠিকাদার নিয়োগে তাদের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি। উল্টো বিলে সই না করলে পদ হারানোর হুমকি দেওয়া হয়েছে। বাধ্য হয়ে তারা চেকে স্বাক্ষর করেছেন।

অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদার ফখরুল ইসলাম বলেন, “ভোটকেন্দ্রে ক্যামেরা লাগানো হয়েছে, বাজারে কাজ চলছে।” তবে ইউএনওর আত্মীয় হওয়ার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন। অন্যদিকে ইউএনও মুনমুন নাহার আশা সব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, এই প্রকল্প জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং এতে কোনো দুর্নীতি হয়নি। ঠিকাদার তার আত্মীয় নন বলেও তিনি দাবি করেন।

তবে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম জানান ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটি ইউএনও নিজেই বাস্তবায়ন করেছেন। ইউনিয়ন পরিষদের ১ শতাংশ তহবিল থেকে এই টাকা নেওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। তথ্যসূত্র ও স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পটিতে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম হয়েছে যার সুষ্ঠু তদন্ত এখন সময়ের দাবি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কনকাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স কাপে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাভানের ঐতিহাসিক অভিষেক

ওসমানীনগরে নির্বাচনি সিসি ক্যামেরা প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম: কাঠগড়ায় ইউএনও

আপডেট সময় : ০৯:০৬:৫৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সিলেটের ওসমানীনগরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটকেন্দ্র ও জনবহুল এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনমুন নাহার আশার বিরুদ্ধে নিজের আত্মীয়কে ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া, কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই বিল উত্তোলন এবং নির্ধারিত বাজেটের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ বরাদ্দের মতো গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরাপত্তা জোরদার করতে উপজেলার ৫৪টি ভোটকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই প্রকল্পের জন্য ইউনিয়ন পরিষদের ১ শতাংশ উন্নয়ন তহবিল থেকে প্রায় ৪৪ লাখ ৭০ হাজার ৯৯৭ টাকার একটি বিশাল বাজেট প্রণয়ন করেন ইউএনও। অথচ নির্বাচন কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রতিটি কেন্দ্রে ৬টি ক্যামেরা স্থাপনে ব্যয় হওয়ার কথা মাত্র ৩২ হাজার ৮০০ টাকা। সেই হিসেবে ৫৪টি কেন্দ্রে মোট খরচ হওয়ার কথা ১৭ লাখ ৭১ হাজার ২০০ টাকা। কমিশনের হিসাবের তুলনায় প্রায় ২৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত বাজেট দেখিয়ে অর্থ তছরুপের পায়তারা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি কেন্দ্রের জন্য বরাদ্দকৃত ৬ লাখ ৫৬ হাজার টাকা কোনো কাজ না করেই গত ১০ ফেব্রুয়ারি অগ্রিম বিল হিসেবে উত্তোলন করে নিয়েছেন ইউএনও মুনমুন নাহার আশা। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা অনিমেশ পাল। এছাড়া যেসব বাজারে আগে থেকেই ক্যামেরা ছিল, সেখানেও নতুন করে বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। দুর্নীতির বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর গত ২২ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে তড়িঘড়ি করে তাজপুর বাজারের বিভিন্ন পয়েন্টে লোকদেখানো ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শুরু হয়।

প্রকল্পের ঠিকাদার নিয়োগ নিয়েও উঠেছে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, জেলা প্রশাসকের দোহাই দিয়ে কাগজে-কলমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দেখানো হলেও বাস্তবে সব কাজ করেছেন ইউএনওর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ফখরুল ইসলাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার এই ঠিকাদার তার প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স সাইফুল এন্টারপ্রাইজ’-এর মাধ্যমে কাজগুলো সম্পাদন করেন এবং কাজ চলাকালীন তিনি ইউএনওর সরকারি বাংলোতেই অবস্থান করতেন।

এদিকে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বিলে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কবির আহমদ ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, প্রকল্প বাস্তবায়ন বা ঠিকাদার নিয়োগে তাদের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি। উল্টো বিলে সই না করলে পদ হারানোর হুমকি দেওয়া হয়েছে। বাধ্য হয়ে তারা চেকে স্বাক্ষর করেছেন।

অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদার ফখরুল ইসলাম বলেন, “ভোটকেন্দ্রে ক্যামেরা লাগানো হয়েছে, বাজারে কাজ চলছে।” তবে ইউএনওর আত্মীয় হওয়ার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন। অন্যদিকে ইউএনও মুনমুন নাহার আশা সব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, এই প্রকল্প জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং এতে কোনো দুর্নীতি হয়নি। ঠিকাদার তার আত্মীয় নন বলেও তিনি দাবি করেন।

তবে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম জানান ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটি ইউএনও নিজেই বাস্তবায়ন করেছেন। ইউনিয়ন পরিষদের ১ শতাংশ তহবিল থেকে এই টাকা নেওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। তথ্যসূত্র ও স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পটিতে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম হয়েছে যার সুষ্ঠু তদন্ত এখন সময়ের দাবি।