নাটোরের বড়াইগ্রামের তিরাইল গ্রাম এখন শুধু একটি জনপদ নয়, বরং পরিযায়ী পাখিদের এক প্রাণবন্ত আশ্রয়স্থল। শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচতে সুদূর সাইবেরিয়া থেকে আসা নানা প্রজাতির পাখি এখন এই গ্রামের ১২ বিঘা বিস্তৃত বাঁশঝাড় এবং সংলগ্ন গাছগুলোতে স্থায়ী আবাস গড়ে তুলেছে। স্থানীয়দের আন্তরিক সহযোগিতা ও অভূতপূর্ব আতিথেয়তায় পাখিরা এখানে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাওয়ায়, তারা আর ফিরে যায় না। ফলে, সারা বছরই তিরাইলের আকাশ মুখরিত থাকে পাখিদের কিচিরমিচির আর কলকাকলিতে, যা এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
ভোর থেকেই বাঁশঝাড়ের কোলাহল, পাখিদের ডানা মেলে অবাধ বিচরণ এবং ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য প্রকৃতিপ্রেমীদের মন জয় করে নিচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক জানান, এখানে বক, সারস, বুনো হাঁস, বালি হাঁস, পানকৌড়ি, শামুকখোল, হড়িয়াল, হাড়গিলা সহ বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে। এদের মধ্যে শামুকখোল ও হাড়গিলা প্রজাতির পাখিই বেশি। এরা আশেপাশের বিলগুলোতে ক্ষতিকর পোকামাকড় ও শামুক খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তিরাইল গ্রামের সমাজসেবক আবু বকর সিদ্দিক বলেন, প্রায় এক যুগ ধরে পাখিরা এখানে বসবাস করছে। আগে তারা কেবল শীতকালে এসে গ্রীষ্মের শুরুতে চলে যেত। কিন্তু স্থানীয়দের সদিচ্ছা ও তাদের শিকার না করার মানসিকতার কারণে পাখিরা এখানেই বাসা বেঁধে ডিম পাড়ে এবং বাচ্চা ফোটায়। মাদরাসা শিক্ষক আফজাল হোসেন জানান, স্থানীয়রা পাখি শিকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তবে, রাতের আঁধারে পাখি বা তাদের বাচ্চা চুরির কিছু ঘটনা ঘটে থাকে। তিনি মনে করেন, প্রশাসন যদি এই বিষয়ে নজরদারি বাড়ায় এবং একটি অভয়ারণ্য গড়ে তোলে, তবে তিরাইল একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
স্থানীয় উদ্যোক্তা শাকিল আহমেদ বলেন, পাখিদের মধুর ডাক শুনেই তাদের ঘুম ভাঙে। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে শুরু হয় তাদের উড়াউড়ি আর কলতান, যা প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অনাবিল আনন্দ। পাবনার চাটমোহর থেকে আসা দর্শনার্থী আব্দুল করিম মীর জানান, দেশীয় অনেক প্রজাতির পাখি বিলুপ্ত হয়ে গেলেও, তিরাইলে অতিথি পাখিদের এই সমাগম এলাকার সৌন্দর্যকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি এমন নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখে মুগ্ধ।
রাজশাহী বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বন্যপ্রাণী পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবির স্থানীয়দের এই উদ্যোগকে অত্যন্ত প্রশংসনীয় বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, তারা এই অঞ্চলে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সভা-সেমিনার এবং বিলবোর্ড স্থাপনের উদ্যোগ নেবেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস নিশ্চিত করেছেন যে, পরিবেশের ভারসাম্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষায় পাখিদের অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন নজরদারি বাড়িয়েছে। তিনি কঠোরভাবে হুঁশিয়ারি দেন যে, কোনো ব্যক্তি পাখি শিকারের সাথে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এই সমন্বিত প্রচেষ্টা তিরাইলকে সত্যিই পাখিদের এক নিরাপদ ও সমৃদ্ধ আশ্রয়স্থলে পরিণত করেছে।
রিপোর্টারের নাম 
























