ঢাকা ১২:৩৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

যমুনেশ্বরী নদীর তলদেশে প্রভাবশালীদের আগ্রাসন, কৃষিজমিতে পরিণত হচ্ছে নদীপথ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৪২:২৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

নাব্য সংকট ও অব্যাহত পলি জমে শুকিয়ে যাওয়া যমুনেশ্বরী নদীর তলদেশ এখন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দখলে। রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নদীর বিস্তীর্ণ চরজুড়ে ইরি-বোরো ধানসহ রবিশস্যের চাষাবাদ শুরু করেছেন স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি। নদীর যে স্থানে একসময় প্রমত্ত স্রোত বইত, আজ সেখানে সারি সারি ধানের চারা আর সবজির বাগান। এই দখলদারিত্বের ফলে এক সময়ের প্রাণবন্ত নদীপথ এখন কৃষিজমিতে পরিণত হচ্ছে, যা পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য উদ্বেগজনক।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বদরগঞ্জ উপজেলার মাধাই, কুতুবপুর, মধুপুর, রাধানগর এবং দামোদরপুর ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত যমুনেশ্বরী নদীর দুপাশে বিশাল চর জেগে উঠেছে। এই চরগুলোকেই নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি দাবি করে শুষ্ক মৌসুম শুরু হলেই স্থানীয় প্রভাবশালীরা লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে দখল করে নেন। এরপর তারা চাষাবাদের অজুহাতে নদীর পানির স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন করে দেন। প্রশাসনের নজরদারির অভাবকে কাজে লাগিয়ে এরা নির্বিঘ্নে এই কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।

নদী তীরবর্তী সাধারণ মানুষ অভিযোগ করেছেন যে, হতদরিদ্র বা ভূমিহীনরা নদীতে চাষাবাদ করার কোনো সুযোগ পান না। যাদের জমিজমা আছে এবং যারা প্রভাবশালী, তারাই নদী দখল করে চাষাবাদ করেন। পানি শুকিয়ে গেলেই তারা নদীতে নেমে পড়েন। গাছুয়াপাড়া এলাকার মনজুরুল ও মোস্তাফিজার রহমান জানান, “আমরা গরিব মানুষ, নদীতে চাষ করার সুযোগ পাই না। যাদের জমি আছে, তারাই নদী দখল করে চাষাবাদ করেন।”

বদরগঞ্জ উপজেলার লোহানীপাড়া ইউনিয়নের সাবেক সদস্য আইয়ুব আলী বলেছেন, তার এলাকার মাধাই খামার, বানিয়াপাড়া, পেশকারপাড়া ও অরুন্নেসার মতো বিশাল অংশজুড়ে চর পড়ে যাওয়ায় মানুষ সেখানে চাষাবাদ শুরু করেছেন। কুতুবপুরের বাবু সিংহ স্বীকার করেছেন যে, নদীর চরে চাষাবাদ করলে বাড়তি কিছু ফসল পাওয়া যায়, যা সংসারের উন্নতিতে সহায়ক হয়। তবে, এই চাষাবাদের ফলে যমুনেশ্বরী নদীর গতিপথ বদলে গেছে বলে নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা দাবি করেছেন।

কুতুবপুর ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা শাহজালাল জানিয়েছেন, নদীতে জমি ভেঙে যাওয়ার পর তা খাস খতিয়ানে চলে যায়। এরপরও প্রভাবশালীরা সেখানে অবৈধভাবে চাষাবাদ করছেন। তিনি বলেন, “নদীতে চর পড়লে কখনো চাষাবাদের উপযোগী হলে সেটি ভূমি অফিস থেকে জরিপ করে ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত করার পর ভূমিহীনদের মধ্যে বন্দোবস্ত দেওয়ার নিয়ম আছে। সেক্ষেত্রে প্রভাবশালী বা ভূমি মালিকরা কখনো সে খাস জমির দাবিদার হতে পারেন না। তবে যেই এ জমির বন্দোবস্ত পান না কেন, কোনোভাবেই নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে চাষাবাদ করতে পারবেন না।”

বদরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সেলিনা আফরোজ জানিয়েছেন, চরাঞ্চলে কত হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়েছে, সেই পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই। তবে এসব জমিতে বিভিন্ন ধরনের শস্যের চাষাবাদ হয়ে থাকে। বদরগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসের সূত্রমতে, উপজেলার নদীর তলদেশে কত একর জমি চাষাবাদের উপযোগী, তারও কোনো হিসাব তাদের কাছে নেই। এই তথ্যহীনতা অবৈধ দখলদারদের আরও উৎসাহিত করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কনকাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স কাপে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাভানের ঐতিহাসিক অভিষেক

যমুনেশ্বরী নদীর তলদেশে প্রভাবশালীদের আগ্রাসন, কৃষিজমিতে পরিণত হচ্ছে নদীপথ

আপডেট সময় : ০৮:৪২:২৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নাব্য সংকট ও অব্যাহত পলি জমে শুকিয়ে যাওয়া যমুনেশ্বরী নদীর তলদেশ এখন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দখলে। রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নদীর বিস্তীর্ণ চরজুড়ে ইরি-বোরো ধানসহ রবিশস্যের চাষাবাদ শুরু করেছেন স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি। নদীর যে স্থানে একসময় প্রমত্ত স্রোত বইত, আজ সেখানে সারি সারি ধানের চারা আর সবজির বাগান। এই দখলদারিত্বের ফলে এক সময়ের প্রাণবন্ত নদীপথ এখন কৃষিজমিতে পরিণত হচ্ছে, যা পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য উদ্বেগজনক।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বদরগঞ্জ উপজেলার মাধাই, কুতুবপুর, মধুপুর, রাধানগর এবং দামোদরপুর ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত যমুনেশ্বরী নদীর দুপাশে বিশাল চর জেগে উঠেছে। এই চরগুলোকেই নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি দাবি করে শুষ্ক মৌসুম শুরু হলেই স্থানীয় প্রভাবশালীরা লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে দখল করে নেন। এরপর তারা চাষাবাদের অজুহাতে নদীর পানির স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন করে দেন। প্রশাসনের নজরদারির অভাবকে কাজে লাগিয়ে এরা নির্বিঘ্নে এই কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।

নদী তীরবর্তী সাধারণ মানুষ অভিযোগ করেছেন যে, হতদরিদ্র বা ভূমিহীনরা নদীতে চাষাবাদ করার কোনো সুযোগ পান না। যাদের জমিজমা আছে এবং যারা প্রভাবশালী, তারাই নদী দখল করে চাষাবাদ করেন। পানি শুকিয়ে গেলেই তারা নদীতে নেমে পড়েন। গাছুয়াপাড়া এলাকার মনজুরুল ও মোস্তাফিজার রহমান জানান, “আমরা গরিব মানুষ, নদীতে চাষ করার সুযোগ পাই না। যাদের জমি আছে, তারাই নদী দখল করে চাষাবাদ করেন।”

বদরগঞ্জ উপজেলার লোহানীপাড়া ইউনিয়নের সাবেক সদস্য আইয়ুব আলী বলেছেন, তার এলাকার মাধাই খামার, বানিয়াপাড়া, পেশকারপাড়া ও অরুন্নেসার মতো বিশাল অংশজুড়ে চর পড়ে যাওয়ায় মানুষ সেখানে চাষাবাদ শুরু করেছেন। কুতুবপুরের বাবু সিংহ স্বীকার করেছেন যে, নদীর চরে চাষাবাদ করলে বাড়তি কিছু ফসল পাওয়া যায়, যা সংসারের উন্নতিতে সহায়ক হয়। তবে, এই চাষাবাদের ফলে যমুনেশ্বরী নদীর গতিপথ বদলে গেছে বলে নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা দাবি করেছেন।

কুতুবপুর ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা শাহজালাল জানিয়েছেন, নদীতে জমি ভেঙে যাওয়ার পর তা খাস খতিয়ানে চলে যায়। এরপরও প্রভাবশালীরা সেখানে অবৈধভাবে চাষাবাদ করছেন। তিনি বলেন, “নদীতে চর পড়লে কখনো চাষাবাদের উপযোগী হলে সেটি ভূমি অফিস থেকে জরিপ করে ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত করার পর ভূমিহীনদের মধ্যে বন্দোবস্ত দেওয়ার নিয়ম আছে। সেক্ষেত্রে প্রভাবশালী বা ভূমি মালিকরা কখনো সে খাস জমির দাবিদার হতে পারেন না। তবে যেই এ জমির বন্দোবস্ত পান না কেন, কোনোভাবেই নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে চাষাবাদ করতে পারবেন না।”

বদরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সেলিনা আফরোজ জানিয়েছেন, চরাঞ্চলে কত হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়েছে, সেই পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই। তবে এসব জমিতে বিভিন্ন ধরনের শস্যের চাষাবাদ হয়ে থাকে। বদরগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসের সূত্রমতে, উপজেলার নদীর তলদেশে কত একর জমি চাষাবাদের উপযোগী, তারও কোনো হিসাব তাদের কাছে নেই। এই তথ্যহীনতা অবৈধ দখলদারদের আরও উৎসাহিত করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।