ঢাকা ১২:৩৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

পূর্ব ময়মনসিংহের আড়ং-মেলা: বিলুপ্তির পথে গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রাণবন্ত উৎসব

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:৪৫:৪৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

একসময় অগ্রহায়ণ মাস এলেই উৎসবের আমেজে ভাসত পূর্ব ময়মনসিংহের গ্রামীণ জনপদ। ধান কাটার পর উন্মুক্ত মাঠে বসত ঐতিহ্যবাহী আড়ং-মেলার প্রাণবন্ত আসর। পশুর লড়াইয়ের উন্মাদনা, লোকজ খাবারের পসরা, গানবাজনা আর খেলাধুলার কোলাহলে মুখরিত এই লোকজ আয়োজন ছিল গ্রামীণ মানুষের সবচেয়ে বড় বিনোদনকেন্দ্র। কালের বিবর্তনে সেই বর্ণিল ঐতিহ্য আজ প্রায় বিলুপ্ত, যা গ্রামীণ সংস্কৃতি থেকে কেড়ে নিচ্ছে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পূর্ব ময়মনসিংহের জনজীবনে আড়ং মানেই ছিল এক অন্যরকম উৎসবের দিন। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর নির্বিশেষে সবাই মেতে উঠত এই আনন্দ-উৎসবে। আত্মীয়স্বজনের আগমন, মেয়েদের নাইয়র আনা এবং জমজমাট মেহমানদারির মধ্য দিয়ে সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় হতো, যা ছিল গ্রামীণ ঐক্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

আড়ং-মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল পশুর লড়াই। ষাঁড়, মহিষ, ভেড়া ও মোরগের এই প্রতিযোগিতা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হতো। নির্ধারিত খোলা মাঠ, যা স্থানীয়ভাবে ‘থলা’ নামে পরিচিত ছিল, তার চারপাশে বসত গ্রামীণ খাবারের দোকান। মুড়ি-মুড়কি, নাড়ু-লাডু, খাজা-গজা, সিংগারা-নিমকি, জিলাপিসহ নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবার স্থান পেত এই পসরায়। এর পাশাপাশি চলত লোকগান, বাদ্যযন্ত্রের সুর আর বিভিন্ন ধরনের গ্রামীণ খেলাধুলা।

আয়োজক কমিটির ব্যবস্থাপনায় বাঁশ ও রঙিন কাগজ দিয়ে আকর্ষণীয়ভাবে সাজানো হতো থলা। পশুর আকারভেদে বিভিন্ন গ্রুপে সারাদিন ধরে চলত এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বিজয়ীদের জন্য পুরস্কার হিসেবে থাকত বদল পশু, সাইকেল, রেডিও, টেলিভিশন কিংবা খাসি। বিজয়ী পশুকে নিয়ে ঢোল-সানাইয়ের তালে গ্রাম প্রদক্ষিণ ছিল আড়ংয়ের এক বিশেষ আকর্ষণ। এরপর কয়েক দিন ধরে পশু প্রদর্শনের মাধ্যমে বকশিস তোলা হতো, যা পশুর বাজারমূল্যও বাড়িয়ে দিত।

প্রচারের ধরনও ছিল বেশ ব্যতিক্রমী। হাট-বাজারে ঢোল পিটিয়ে কিংবা খালি টিন বাজিয়ে আড়ংয়ের দিন-তারিখ ঘোষণা করা হতো, যা পুরো এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলত এবং উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দিত। সংস্কৃতি গবেষকদের মতে, আড়ংয়ের শিকড় প্রোথিত এ অঞ্চলের প্রাচীন লোকজ সংস্কৃতিতে। জলাভূমি ও টিলায় ঘেরা ভূপ্রকৃতিতে বসবাসকারী আর্য ও অনার্য জনগোষ্ঠীর পশুপালন ও বিনোদনচর্চা থেকেই এই উৎসবের বিকাশ ঘটেছিল। প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের চর্যাপদ-সংস্কৃতির সময়কাল থেকেই এ ধরনের লোকজ বিনোদনের ধারার অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

তবে সময়ের পরিক্রমায় এই ঐতিহ্যবাহী উৎসবের চিত্র পাল্টাতে শুরু করে। আড়ংয়ের নামে জুয়া, ঝগড়া-বিবাদ ও মারামারির প্রবণতা বাড়ায় এর জৌলুস কমতে থাকে। নিরাপত্তাহীনতা এবং পারস্পরিক সৌহার্দের অভাবে একপর্যায়ে এই আয়োজন বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে গ্রামীণ জীবন থেকে হারিয়ে যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাণবন্ত লোকজ উৎসব, যা রেখে যায় কেবল স্মৃতির রেশ।

সংস্কৃতিপ্রেমীরা মনে করেন, আড়ং শুধু একটি মেলা ছিল না—এটি ছিল গ্রামীণ সমাজের মিলনমেলা এবং ঐক্যের প্রতীক। যথাযথ গবেষণা, নথিভুক্তকরণ এবং নিয়ন্ত্রিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সম্ভব। অন্যথায়, আড়ং থেকে যাবে শুধুই স্মৃতির পাতায় বন্দি এক অধ্যায়, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অচেনাই থেকে যাবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কনকাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স কাপে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাভানের ঐতিহাসিক অভিষেক

পূর্ব ময়মনসিংহের আড়ং-মেলা: বিলুপ্তির পথে গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রাণবন্ত উৎসব

আপডেট সময় : ০৬:৪৫:৪৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

একসময় অগ্রহায়ণ মাস এলেই উৎসবের আমেজে ভাসত পূর্ব ময়মনসিংহের গ্রামীণ জনপদ। ধান কাটার পর উন্মুক্ত মাঠে বসত ঐতিহ্যবাহী আড়ং-মেলার প্রাণবন্ত আসর। পশুর লড়াইয়ের উন্মাদনা, লোকজ খাবারের পসরা, গানবাজনা আর খেলাধুলার কোলাহলে মুখরিত এই লোকজ আয়োজন ছিল গ্রামীণ মানুষের সবচেয়ে বড় বিনোদনকেন্দ্র। কালের বিবর্তনে সেই বর্ণিল ঐতিহ্য আজ প্রায় বিলুপ্ত, যা গ্রামীণ সংস্কৃতি থেকে কেড়ে নিচ্ছে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পূর্ব ময়মনসিংহের জনজীবনে আড়ং মানেই ছিল এক অন্যরকম উৎসবের দিন। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর নির্বিশেষে সবাই মেতে উঠত এই আনন্দ-উৎসবে। আত্মীয়স্বজনের আগমন, মেয়েদের নাইয়র আনা এবং জমজমাট মেহমানদারির মধ্য দিয়ে সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় হতো, যা ছিল গ্রামীণ ঐক্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

আড়ং-মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল পশুর লড়াই। ষাঁড়, মহিষ, ভেড়া ও মোরগের এই প্রতিযোগিতা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হতো। নির্ধারিত খোলা মাঠ, যা স্থানীয়ভাবে ‘থলা’ নামে পরিচিত ছিল, তার চারপাশে বসত গ্রামীণ খাবারের দোকান। মুড়ি-মুড়কি, নাড়ু-লাডু, খাজা-গজা, সিংগারা-নিমকি, জিলাপিসহ নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবার স্থান পেত এই পসরায়। এর পাশাপাশি চলত লোকগান, বাদ্যযন্ত্রের সুর আর বিভিন্ন ধরনের গ্রামীণ খেলাধুলা।

আয়োজক কমিটির ব্যবস্থাপনায় বাঁশ ও রঙিন কাগজ দিয়ে আকর্ষণীয়ভাবে সাজানো হতো থলা। পশুর আকারভেদে বিভিন্ন গ্রুপে সারাদিন ধরে চলত এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বিজয়ীদের জন্য পুরস্কার হিসেবে থাকত বদল পশু, সাইকেল, রেডিও, টেলিভিশন কিংবা খাসি। বিজয়ী পশুকে নিয়ে ঢোল-সানাইয়ের তালে গ্রাম প্রদক্ষিণ ছিল আড়ংয়ের এক বিশেষ আকর্ষণ। এরপর কয়েক দিন ধরে পশু প্রদর্শনের মাধ্যমে বকশিস তোলা হতো, যা পশুর বাজারমূল্যও বাড়িয়ে দিত।

প্রচারের ধরনও ছিল বেশ ব্যতিক্রমী। হাট-বাজারে ঢোল পিটিয়ে কিংবা খালি টিন বাজিয়ে আড়ংয়ের দিন-তারিখ ঘোষণা করা হতো, যা পুরো এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলত এবং উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দিত। সংস্কৃতি গবেষকদের মতে, আড়ংয়ের শিকড় প্রোথিত এ অঞ্চলের প্রাচীন লোকজ সংস্কৃতিতে। জলাভূমি ও টিলায় ঘেরা ভূপ্রকৃতিতে বসবাসকারী আর্য ও অনার্য জনগোষ্ঠীর পশুপালন ও বিনোদনচর্চা থেকেই এই উৎসবের বিকাশ ঘটেছিল। প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের চর্যাপদ-সংস্কৃতির সময়কাল থেকেই এ ধরনের লোকজ বিনোদনের ধারার অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

তবে সময়ের পরিক্রমায় এই ঐতিহ্যবাহী উৎসবের চিত্র পাল্টাতে শুরু করে। আড়ংয়ের নামে জুয়া, ঝগড়া-বিবাদ ও মারামারির প্রবণতা বাড়ায় এর জৌলুস কমতে থাকে। নিরাপত্তাহীনতা এবং পারস্পরিক সৌহার্দের অভাবে একপর্যায়ে এই আয়োজন বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে গ্রামীণ জীবন থেকে হারিয়ে যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাণবন্ত লোকজ উৎসব, যা রেখে যায় কেবল স্মৃতির রেশ।

সংস্কৃতিপ্রেমীরা মনে করেন, আড়ং শুধু একটি মেলা ছিল না—এটি ছিল গ্রামীণ সমাজের মিলনমেলা এবং ঐক্যের প্রতীক। যথাযথ গবেষণা, নথিভুক্তকরণ এবং নিয়ন্ত্রিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সম্ভব। অন্যথায়, আড়ং থেকে যাবে শুধুই স্মৃতির পাতায় বন্দি এক অধ্যায়, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অচেনাই থেকে যাবে।