ঢাকা ১১:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

মন্ত্রীর ‘ইনকিলাব’ আপত্তি: ভাষা, ইতিহাস ও রাজনীতির গভীর ভুল পাঠ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:২০:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এক আলোচনা সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ‘ইনকিলাব’, ‘ইনসাফ’, ‘আজাদি’র মতো শব্দ ব্যবহারে আপত্তি তুলে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা ভাষা, ইতিহাস ও রাজনীতির এক গভীর ভুল পাঠ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মন্ত্রীর এই মন্তব্য ভাষার গতিশীলতা, বহুত্ববাদ এবং জনআকাঙ্ক্ষার সঙ্গে ক্ষমতার সংঘাতকে নতুন করে সামনে এনেছে, যা গণতন্ত্র ও মুক্তচিন্তার জন্য উদ্বেগজনক।

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের আয়োজনে পৌর শহরের শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ওই সভায় মন্ত্রী মন্তব্য করেন, “আজ বাংলা ভাষা সম্পর্কে আমরা নিজেরা যদি একটু চিন্তা করতাম, তাহলে আজকের জেনজি ইনকিলাব বলত না। তারা ইনকিলাব বললে আমার রক্তক্ষরণ হয়। এটার জন্যই মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম? অথচ না গেলেও চলত। সমাজ পরিবর্তনের জন্য জীবন দিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সমাজ যে উল্টোদিকে হাঁটে, এখন সেটা দেখছি।” তিনি আরও বলেন, “বাংলাকে যদি ধারণ করতে হয়, বাংলা ভাষাকে যদি মায়ের ভাষা বলতে হয়, তাহলে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ চলবে না। ইনকিলাব, ইনকিলাব মঞ্চ ও আজাদির মতো এখন নতুন নতুন শব্দ শুনছি। এগুলোর বাংলার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। যারা আমাদের মায়ের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল, এগুলো তাদের ভাষা। সুতরাং দেশকে ভালোবেসে নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। এসব কথা বলায় অনেকেই আমাকে ভারতের দালাল ও ‘র’-এর এজেন্ট বানিয়ে ফেলবে। তারপরও আমি বলব।”

ভাষাবিদ ও ইতিহাসবিদরা মন্ত্রীর এই বক্তব্যকে কেবল একটি দৃষ্টিভঙ্গিগত ভুল হিসেবে দেখছেন না, বরং ভাষা, ইতিহাস ও রাজনীতির এক গভীর ভুল পাঠ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। তাদের মতে, ভাষা কোনো স্থির বা পবিত্র জাদুঘর নয়; এটি একটি জীবন্ত সত্তা, যা প্রতিনিয়ত গ্রহণ, বর্জন ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। যে ভাষা পরিবর্তিত হয় না, সে ভাষা টিকে থাকতে পারে না। বাংলা ভাষার ইতিহাসও এই সত্যের সাক্ষ্য দেয়। পালি, প্রাকৃত, আরবি, ফারসি, তুর্কি, ইংরেজি—বহু ভাষার শব্দ আত্মীকরণ করেই বাংলা ভাষা তার বর্তমান সমৃদ্ধ রূপ লাভ করেছে।

যদি বিদেশি শব্দ বর্জনের প্রশ্ন আসে, তবে কোথা থেকে শুরু হবে? ‘শহীদ’, ‘মিনার’, ‘ফেব্রুয়ারি’র মতো শব্দগুলো কি বাদ দেওয়া হবে, যা আমাদের জাতীয় জীবনে গভীরভাবে মিশে আছে? ‘কলম’, ‘খবর’, ‘দুনিয়া’, ‘কাগজ’—এমন বহু শব্দ যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেগুলোর উৎসও তো বিদেশি। সোশ্যাল মিডিয়ায় এক ঘণ্টার জন্য ‘খাঁটি বাংলা’ বলার চ্যালেঞ্জের বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ মানুষ ১০ মিনিটও টিকে থাকতে পারে না। কারণ আমরা যে বাংলা বলি, তা বহু শতকের আত্মীকরণের ফল। এখানে মন্ত্রীর বক্তব্য এক ধরনের দ্বিচারিতার শিকার; তিনি ‘ইনকিলাব’ হটাতে ইংরেজির আশ্রয় নিতে প্রস্তুত, কিন্তু আরবি শব্দে আপত্তি। এটি ভাষার প্রশ্ন নয়, এটি রাজনীতির প্রশ্ন। লক্ষণীয় যে, মন্ত্রীর নিজের নাম—ইকবাল হাসান মাহমুদ—এর কোনো শব্দই বাংলা ভাষার নয়, সবগুলোই আরবি উৎস থেকে আগত।

ভাষা সবসময়ই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু ভাষার রাজনীতি যখন দমনমূলক হয়, তখন তা এক স্বৈরাচারী আচরণে রূপ নেয়। ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া মানে চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া। একজন রাজনৈতিক দার্শনিক বলেছিলেন, স্বৈরতন্ত্রের প্রথম কাজ হলো মানুষের ভাষা ও বয়ান ধ্বংস করা। কারণ ভাষা ধ্বংস মানে চিন্তার বিকল্প ধ্বংস।

‘ইনকিলাব’ শব্দটি কোনো ধর্মীয় স্লোগান নয়, এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ও পরিবর্তনের ডাক। ইউরোপে যা ‘রেভল্যুশন’, ফ্রান্সে ‘রেভোল্যুশন’, বাংলায় বহুদিন ধরে ‘বিপ্লব’ নামে পরিচিত, উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ‘ইনকিলাব’ শব্দটিই রাজনৈতিক অর্থে প্রথম ব্যবহৃত হয়। শব্দের উৎস দিয়ে তার বৈধতা বিচার করা হয় না, বরং ব্যবহার, গ্রহণ ও টিকে থাকা দিয়ে তার শক্তি নির্ধারিত হয়।

সম্প্রতি জুলাই-আগস্টে তরুণরা ‘ইনকিলাব’, ‘ইনসাফ’, ‘আজাদি’র মতো শব্দগুলো অপূর্ব স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে ধারণ করেছে, কোনো হীনম্মন্যতা ছাড়াই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. সালেহ হাসান নকীবের মতে, “এই শব্দগুলো অবশ্যই টিকে যাবে। কতটা টিকে যাবে, তা নির্ভর করবে, এই শব্দগুলো নিয়ে অ্যালার্জির মাত্রার ওপর। যত অ্যালার্জি, শব্দগুলো ততই শক্তিশালী হয়ে উঠবে।” তিনি যথার্থই বলেছেন, যত অ্যালার্জি দেখানো হবে, শব্দ তত শক্তিশালী হবে। ইতিহাসও তাই বলে।

যারা আজ ভাষার পবিত্রতা নিয়ে কথা বলছেন, তাদের দীর্ঘদিনের ক্ষমতায় থাকাকালীন ভাষার জন্য কী করেছেন, সেই প্রশ্নও উঠছে। শিক্ষাব্যবস্থা, উচ্চ আদালত, প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়—সবখানে কি বাংলা প্রতিষ্ঠিত? বাস্তবতা হলো, ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তারা ভাষার ব্যবহারিক দিক নিয়ে তেমন কাজ করেননি, বরং এখন যখন ক্ষমতা টলে, তখন ভাষা হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ঘাঁটলে বোঝা যায়, এই বিতর্ক নতুন নয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার কবিতায় বিপুলভাবে আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছিলেন, যেমন—’খুন’, ‘শহীদ’, ‘ইনসাফ’, ‘কেয়ামত’। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আপত্তি করেছিলেন, কিছু শব্দ কানে ‘বীভৎস’ লাগে বলে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস কাকে সঠিক প্রমাণ করেছে? আজ ‘খুন’ বা ‘শহীদ’ শব্দে কারো আপত্তি নেই। ফররুখ আহমদ, আল মাহমুদ—তারাও এই ধারাকে এগিয়ে নিয়েছেন, যা বাংলা ভাষাকে সংকুচিত নয়, বরং সমৃদ্ধ করেছে। ভাষা কখনো একরৈখিক নয়, এটি বহুমুখী ও গণমানুষের।

রাজনৈতিক দার্শনিক রুশো বলেছিলেন, জনগণের সার্বভৌমত্ব অখণ্ড, কেউ তা দান করে না বা কেড়ে নিতে পারে না। ভাষা সেই সার্বভৌমত্ব প্রকাশের মাধ্যম। তরুণরা আজ যে ভাষা বেছে নিয়েছে, তা তাদের অভিজ্ঞতা, দমন ও বৈষম্য থেকে এসেছে। সেই ভাষাকে অস্বীকার করা মানে সেই অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করা। ‘ইনকিলাব’ কেবল স্লোগান নয়—এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে হৃদয়ের গর্জন। যে স্লোগান স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে, সেই স্লোগান তাদের উত্তরসূরিদের ভয়ের কারণ হবেই। ভয় থেকেই নিষেধ আসে, ভয় থেকেই ভাষার শুদ্ধতার বুলি ওঠে।

বিশ্ব যখন অন্তর্ভুক্তির দিকে এগোচ্ছে, আমরা তখন ব্যস্ত বর্জনে। এই পথ শেষ পর্যন্ত কোথায় যায়, তা ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—সেখানে উন্নতি নেই, গণতন্ত্র নেই, শুধু গোত্রবাদ থাকে। ‘ইনকিলাব’, ‘আজাদি’, ‘জিন্দাবাদ’—এই শব্দগুলো শুনলেই এক শ্রেণির মানুষের শরীরে জ্বালা ধরে যায়। কারণ তারা এগুলোকে রাজনৈতিকভাবে ‘ভুল’ ট্রাইবের শব্দ মনে করে। ভাষা এখানে যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষা এখানে শত্রু চেনার টুল। এটাই গোত্রবাদ। জাতীয়তাবাদ যখন নাগরিকতার বদলে গোত্রে পরিণত হয়, তখন তা আর আধুনিক থাকে না, বরং ভয়ংকর হয়ে ওঠে। সভ্য সমাজে পার্থক্য থাকে, কিন্তু বর্জন থাকে না। বর্জন শুরু হলেই রাজনীতি নৈতিকতা হারায়।

এই ভয় ভাষার নয়, এই ভয় ক্ষমতার। ‘ইনকিলাব’ বা ‘আজাদি’ শব্দগুলো শাহবাগি ট্রাইবকে আতঙ্কিত করে, কারণ এই শব্দগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এই শব্দগুলো অনুমতি চায় না, সরাসরি অন্যায়কে চ্যালেঞ্জ করে। ভাষা যখন নিচ থেকে উঠে আসে, তখন উপরতলার মানুষ ভয় পায়। রাজনৈতিক চিন্তাবিদ বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন বলেছিলেন, জাতি আসলে একটি কল্পিত সম্প্রদায়, যা টিকে থাকে ভাষা ও বয়ানের মাধ্যমে। সেই বয়ান যদি হাতছাড়া হয়ে যায়, ক্ষমতাও হাতছাড়া হয়। এ কারণেই ভাষা নিয়ে এত হইচই, এ কারণেই শব্দকে শুদ্ধ-অশুদ্ধ ভাগ করা হয়, কিছু শব্দকে দেশপ্রেমিক আর কিছু শব্দকে দেশদ্রোহী বানানো হয়। এটি সভ্যতার লক্ষণ নয়, এটি এক ধরনের সংকীর্ণতা। যতদিন এই সংকীর্ণতা বজায় থাকবে, ততদিন আমরা সভ্য হতে পারব না, ততদিন ভাষাকে গোত্রীয় অস্ত্র বানিয়ে রাখা হবে, ততদিন গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়বে।

ভাষা নিয়ে বিতর্ক তোলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি ‘টেস্ট ফায়ার’। আজ শব্দ নিয়ে, কাল ভাবনা নিয়ে, পরশু মানুষ নিয়ে। এই ক্যান্সার আগেও ছিল, আবার মাথা তুলছে। তবে যারা ভাবছেন, ভাষা পুলিশিং করে সমাজকে ‘শুদ্ধ’ করা যাবে—তারা ইতিহাস পড়েননি। ভাষা দমন করলে ভাষা শক্তিশালী হয়, নিষেধাজ্ঞা দিলে শব্দ আরও ছড়ায়। এটাই বাস্তবতা। সভ্যতা মানে সহনশীলতা, সভ্যতা মানে ভিন্নতার সঙ্গে থাকা, সভ্যতা মানে নিজের ভাষাকে এত দুর্বল না ভাবা যে দু-চারটা ধার করা শব্দে সে ভেঙে পড়বে।

জুলাই বিপ্লবের জনআকাঙ্ক্ষাকে কোনো শব্দ-ভীতি দিয়ে থামানো যাবে না। ‘ইনকিলাব’ মানে পরিবর্তন, পরিবর্তন মানে ভয় ভাঙা। ভয় ভাঙলেই ভবিষ্যৎ আসে। ভাষা কারো একক সম্পত্তি নয়, বাংলা কোনো মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। এটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহার। শব্দ বাঁচে ব্যবহারে, ভাষা বাঁচে স্বাধীনতায়, গণতন্ত্র বাঁচে বাস্তবায়নে।

লেখক:
সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নীলফামারীতে মন্দিরের উঠান থেকে কৃষকের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার, এলাকায় চাঞ্চল্য

মন্ত্রীর ‘ইনকিলাব’ আপত্তি: ভাষা, ইতিহাস ও রাজনীতির গভীর ভুল পাঠ

আপডেট সময় : ১১:২০:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এক আলোচনা সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ‘ইনকিলাব’, ‘ইনসাফ’, ‘আজাদি’র মতো শব্দ ব্যবহারে আপত্তি তুলে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা ভাষা, ইতিহাস ও রাজনীতির এক গভীর ভুল পাঠ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মন্ত্রীর এই মন্তব্য ভাষার গতিশীলতা, বহুত্ববাদ এবং জনআকাঙ্ক্ষার সঙ্গে ক্ষমতার সংঘাতকে নতুন করে সামনে এনেছে, যা গণতন্ত্র ও মুক্তচিন্তার জন্য উদ্বেগজনক।

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের আয়োজনে পৌর শহরের শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ওই সভায় মন্ত্রী মন্তব্য করেন, “আজ বাংলা ভাষা সম্পর্কে আমরা নিজেরা যদি একটু চিন্তা করতাম, তাহলে আজকের জেনজি ইনকিলাব বলত না। তারা ইনকিলাব বললে আমার রক্তক্ষরণ হয়। এটার জন্যই মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম? অথচ না গেলেও চলত। সমাজ পরিবর্তনের জন্য জীবন দিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সমাজ যে উল্টোদিকে হাঁটে, এখন সেটা দেখছি।” তিনি আরও বলেন, “বাংলাকে যদি ধারণ করতে হয়, বাংলা ভাষাকে যদি মায়ের ভাষা বলতে হয়, তাহলে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ চলবে না। ইনকিলাব, ইনকিলাব মঞ্চ ও আজাদির মতো এখন নতুন নতুন শব্দ শুনছি। এগুলোর বাংলার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। যারা আমাদের মায়ের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল, এগুলো তাদের ভাষা। সুতরাং দেশকে ভালোবেসে নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। এসব কথা বলায় অনেকেই আমাকে ভারতের দালাল ও ‘র’-এর এজেন্ট বানিয়ে ফেলবে। তারপরও আমি বলব।”

ভাষাবিদ ও ইতিহাসবিদরা মন্ত্রীর এই বক্তব্যকে কেবল একটি দৃষ্টিভঙ্গিগত ভুল হিসেবে দেখছেন না, বরং ভাষা, ইতিহাস ও রাজনীতির এক গভীর ভুল পাঠ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। তাদের মতে, ভাষা কোনো স্থির বা পবিত্র জাদুঘর নয়; এটি একটি জীবন্ত সত্তা, যা প্রতিনিয়ত গ্রহণ, বর্জন ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। যে ভাষা পরিবর্তিত হয় না, সে ভাষা টিকে থাকতে পারে না। বাংলা ভাষার ইতিহাসও এই সত্যের সাক্ষ্য দেয়। পালি, প্রাকৃত, আরবি, ফারসি, তুর্কি, ইংরেজি—বহু ভাষার শব্দ আত্মীকরণ করেই বাংলা ভাষা তার বর্তমান সমৃদ্ধ রূপ লাভ করেছে।

যদি বিদেশি শব্দ বর্জনের প্রশ্ন আসে, তবে কোথা থেকে শুরু হবে? ‘শহীদ’, ‘মিনার’, ‘ফেব্রুয়ারি’র মতো শব্দগুলো কি বাদ দেওয়া হবে, যা আমাদের জাতীয় জীবনে গভীরভাবে মিশে আছে? ‘কলম’, ‘খবর’, ‘দুনিয়া’, ‘কাগজ’—এমন বহু শব্দ যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেগুলোর উৎসও তো বিদেশি। সোশ্যাল মিডিয়ায় এক ঘণ্টার জন্য ‘খাঁটি বাংলা’ বলার চ্যালেঞ্জের বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ মানুষ ১০ মিনিটও টিকে থাকতে পারে না। কারণ আমরা যে বাংলা বলি, তা বহু শতকের আত্মীকরণের ফল। এখানে মন্ত্রীর বক্তব্য এক ধরনের দ্বিচারিতার শিকার; তিনি ‘ইনকিলাব’ হটাতে ইংরেজির আশ্রয় নিতে প্রস্তুত, কিন্তু আরবি শব্দে আপত্তি। এটি ভাষার প্রশ্ন নয়, এটি রাজনীতির প্রশ্ন। লক্ষণীয় যে, মন্ত্রীর নিজের নাম—ইকবাল হাসান মাহমুদ—এর কোনো শব্দই বাংলা ভাষার নয়, সবগুলোই আরবি উৎস থেকে আগত।

ভাষা সবসময়ই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু ভাষার রাজনীতি যখন দমনমূলক হয়, তখন তা এক স্বৈরাচারী আচরণে রূপ নেয়। ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া মানে চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া। একজন রাজনৈতিক দার্শনিক বলেছিলেন, স্বৈরতন্ত্রের প্রথম কাজ হলো মানুষের ভাষা ও বয়ান ধ্বংস করা। কারণ ভাষা ধ্বংস মানে চিন্তার বিকল্প ধ্বংস।

‘ইনকিলাব’ শব্দটি কোনো ধর্মীয় স্লোগান নয়, এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ও পরিবর্তনের ডাক। ইউরোপে যা ‘রেভল্যুশন’, ফ্রান্সে ‘রেভোল্যুশন’, বাংলায় বহুদিন ধরে ‘বিপ্লব’ নামে পরিচিত, উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ‘ইনকিলাব’ শব্দটিই রাজনৈতিক অর্থে প্রথম ব্যবহৃত হয়। শব্দের উৎস দিয়ে তার বৈধতা বিচার করা হয় না, বরং ব্যবহার, গ্রহণ ও টিকে থাকা দিয়ে তার শক্তি নির্ধারিত হয়।

সম্প্রতি জুলাই-আগস্টে তরুণরা ‘ইনকিলাব’, ‘ইনসাফ’, ‘আজাদি’র মতো শব্দগুলো অপূর্ব স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে ধারণ করেছে, কোনো হীনম্মন্যতা ছাড়াই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. সালেহ হাসান নকীবের মতে, “এই শব্দগুলো অবশ্যই টিকে যাবে। কতটা টিকে যাবে, তা নির্ভর করবে, এই শব্দগুলো নিয়ে অ্যালার্জির মাত্রার ওপর। যত অ্যালার্জি, শব্দগুলো ততই শক্তিশালী হয়ে উঠবে।” তিনি যথার্থই বলেছেন, যত অ্যালার্জি দেখানো হবে, শব্দ তত শক্তিশালী হবে। ইতিহাসও তাই বলে।

যারা আজ ভাষার পবিত্রতা নিয়ে কথা বলছেন, তাদের দীর্ঘদিনের ক্ষমতায় থাকাকালীন ভাষার জন্য কী করেছেন, সেই প্রশ্নও উঠছে। শিক্ষাব্যবস্থা, উচ্চ আদালত, প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়—সবখানে কি বাংলা প্রতিষ্ঠিত? বাস্তবতা হলো, ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তারা ভাষার ব্যবহারিক দিক নিয়ে তেমন কাজ করেননি, বরং এখন যখন ক্ষমতা টলে, তখন ভাষা হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ঘাঁটলে বোঝা যায়, এই বিতর্ক নতুন নয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার কবিতায় বিপুলভাবে আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছিলেন, যেমন—’খুন’, ‘শহীদ’, ‘ইনসাফ’, ‘কেয়ামত’। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আপত্তি করেছিলেন, কিছু শব্দ কানে ‘বীভৎস’ লাগে বলে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস কাকে সঠিক প্রমাণ করেছে? আজ ‘খুন’ বা ‘শহীদ’ শব্দে কারো আপত্তি নেই। ফররুখ আহমদ, আল মাহমুদ—তারাও এই ধারাকে এগিয়ে নিয়েছেন, যা বাংলা ভাষাকে সংকুচিত নয়, বরং সমৃদ্ধ করেছে। ভাষা কখনো একরৈখিক নয়, এটি বহুমুখী ও গণমানুষের।

রাজনৈতিক দার্শনিক রুশো বলেছিলেন, জনগণের সার্বভৌমত্ব অখণ্ড, কেউ তা দান করে না বা কেড়ে নিতে পারে না। ভাষা সেই সার্বভৌমত্ব প্রকাশের মাধ্যম। তরুণরা আজ যে ভাষা বেছে নিয়েছে, তা তাদের অভিজ্ঞতা, দমন ও বৈষম্য থেকে এসেছে। সেই ভাষাকে অস্বীকার করা মানে সেই অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করা। ‘ইনকিলাব’ কেবল স্লোগান নয়—এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে হৃদয়ের গর্জন। যে স্লোগান স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে, সেই স্লোগান তাদের উত্তরসূরিদের ভয়ের কারণ হবেই। ভয় থেকেই নিষেধ আসে, ভয় থেকেই ভাষার শুদ্ধতার বুলি ওঠে।

বিশ্ব যখন অন্তর্ভুক্তির দিকে এগোচ্ছে, আমরা তখন ব্যস্ত বর্জনে। এই পথ শেষ পর্যন্ত কোথায় যায়, তা ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—সেখানে উন্নতি নেই, গণতন্ত্র নেই, শুধু গোত্রবাদ থাকে। ‘ইনকিলাব’, ‘আজাদি’, ‘জিন্দাবাদ’—এই শব্দগুলো শুনলেই এক শ্রেণির মানুষের শরীরে জ্বালা ধরে যায়। কারণ তারা এগুলোকে রাজনৈতিকভাবে ‘ভুল’ ট্রাইবের শব্দ মনে করে। ভাষা এখানে যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষা এখানে শত্রু চেনার টুল। এটাই গোত্রবাদ। জাতীয়তাবাদ যখন নাগরিকতার বদলে গোত্রে পরিণত হয়, তখন তা আর আধুনিক থাকে না, বরং ভয়ংকর হয়ে ওঠে। সভ্য সমাজে পার্থক্য থাকে, কিন্তু বর্জন থাকে না। বর্জন শুরু হলেই রাজনীতি নৈতিকতা হারায়।

এই ভয় ভাষার নয়, এই ভয় ক্ষমতার। ‘ইনকিলাব’ বা ‘আজাদি’ শব্দগুলো শাহবাগি ট্রাইবকে আতঙ্কিত করে, কারণ এই শব্দগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এই শব্দগুলো অনুমতি চায় না, সরাসরি অন্যায়কে চ্যালেঞ্জ করে। ভাষা যখন নিচ থেকে উঠে আসে, তখন উপরতলার মানুষ ভয় পায়। রাজনৈতিক চিন্তাবিদ বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন বলেছিলেন, জাতি আসলে একটি কল্পিত সম্প্রদায়, যা টিকে থাকে ভাষা ও বয়ানের মাধ্যমে। সেই বয়ান যদি হাতছাড়া হয়ে যায়, ক্ষমতাও হাতছাড়া হয়। এ কারণেই ভাষা নিয়ে এত হইচই, এ কারণেই শব্দকে শুদ্ধ-অশুদ্ধ ভাগ করা হয়, কিছু শব্দকে দেশপ্রেমিক আর কিছু শব্দকে দেশদ্রোহী বানানো হয়। এটি সভ্যতার লক্ষণ নয়, এটি এক ধরনের সংকীর্ণতা। যতদিন এই সংকীর্ণতা বজায় থাকবে, ততদিন আমরা সভ্য হতে পারব না, ততদিন ভাষাকে গোত্রীয় অস্ত্র বানিয়ে রাখা হবে, ততদিন গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়বে।

ভাষা নিয়ে বিতর্ক তোলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি ‘টেস্ট ফায়ার’। আজ শব্দ নিয়ে, কাল ভাবনা নিয়ে, পরশু মানুষ নিয়ে। এই ক্যান্সার আগেও ছিল, আবার মাথা তুলছে। তবে যারা ভাবছেন, ভাষা পুলিশিং করে সমাজকে ‘শুদ্ধ’ করা যাবে—তারা ইতিহাস পড়েননি। ভাষা দমন করলে ভাষা শক্তিশালী হয়, নিষেধাজ্ঞা দিলে শব্দ আরও ছড়ায়। এটাই বাস্তবতা। সভ্যতা মানে সহনশীলতা, সভ্যতা মানে ভিন্নতার সঙ্গে থাকা, সভ্যতা মানে নিজের ভাষাকে এত দুর্বল না ভাবা যে দু-চারটা ধার করা শব্দে সে ভেঙে পড়বে।

জুলাই বিপ্লবের জনআকাঙ্ক্ষাকে কোনো শব্দ-ভীতি দিয়ে থামানো যাবে না। ‘ইনকিলাব’ মানে পরিবর্তন, পরিবর্তন মানে ভয় ভাঙা। ভয় ভাঙলেই ভবিষ্যৎ আসে। ভাষা কারো একক সম্পত্তি নয়, বাংলা কোনো মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। এটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহার। শব্দ বাঁচে ব্যবহারে, ভাষা বাঁচে স্বাধীনতায়, গণতন্ত্র বাঁচে বাস্তবায়নে।

লেখক:
সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন