ঢাকা ১১:৫৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সাত দিন: দৃঢ়তা ও জনমুখীতার বার্তা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:০৩:৪৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

‘সকালের সূর্যই বলে দেয় দিনটি কেমন যাবে’—জনপ্রিয় এই প্রবাদটি যেন সার্থকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে সদ্য নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম সপ্তাহের কার্যক্রমে। রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর তারেক রহমানের গতিশীল পদক্ষেপগুলো স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে তার বাবা, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সেই ঐতিহাসিক উক্তি, যেখানে তিনি রাজনীতিকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার এবং ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারকারীদের জন্য কঠিন করে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন, তারেক রহমানও পিতার সেই জনমুখী ধারাই অনুসরণ করছেন, যা তার প্রথম কয়েক দিনের কাজ থেকেই স্পষ্ট। নিঃসন্দেহে তার এই শুরুটা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

ইতিহাস সৃষ্টিকারী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তিনি ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রীসহ একটি সুষম মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন, যেখানে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তিনি নিজের কাছেই রেখেছেন। শপথ গ্রহণের পর তার সরকারের আজ সাত দিন পূর্ণ হয়েছে, এবং শুক্রবারে সরকারি ছুটি ব্যতীত অন্য সব দিনেই তাকে কর্মব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে।

প্রচলিত রীতি ভেঙে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় খোলা আকাশের নিচে, জনগণের সরাসরি উপস্থিতিতে শপথ গ্রহণ করে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ড. মোহামেদ মুইজ্জু, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে, ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ও পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়নমন্ত্রী আহসান ইকবাল চৌধুরীসহ ১৩টি দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন, যা অনুষ্ঠানটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তোলে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার আগে, ১৭ ফেব্রুয়ারি সকালে তারেক রহমান দলীয় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সঙ্গে ‘সংসদ সদস্য’ হিসেবে শপথ নেন। এরপর অনুষ্ঠিত সংসদীয় দলের সভায় তিনি সর্বসম্মতিক্রমে সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হন। এই সভাতেই তিনি ঘোষণা করেন যে, তার দলের কোনো সংসদ সদস্য শুল্কমুক্ত গাড়ি বা সরকারি প্লট বরাদ্দের সুবিধা গ্রহণ করবেন না। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকারি আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রথম দুদিন তিনি বাংলাদেশ সচিবালয়ে অফিস করেন এবং মন্ত্রিসভার বৈঠকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। জাতির উদ্দেশে দেওয়া তার প্রথম ভাষণে তিনি সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবং মন্ত্রীদের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় পরিহারের নির্দেশ দেন। পবিত্র রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা এবং সিন্ডিকেট দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের ঘোষণা দেন তিনি। তার এই ভাষণ সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বার্তা দেয়, যা একটি জবাবদিহিমূলক সরকারের প্রতিশ্রুতির ইঙ্গিত বহন করে। তিনি ঘোষণা করেন, রাজনৈতিক আদর্শ ভিন্ন হলেও দেশের সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হবে, যা একটি বৈষম্যহীন আগামীর পূর্বাভাস। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক বিভাজন দূর করে দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনে ‘জাতীয় ঐক্য’ ও শান্তির ডাক দেন।

গতানুগতিক ভিভিআইপি প্রথা ভেঙে তারেক রহমানকে সাধারণ জনগণের মতো ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে এবং কোনো রাস্তা বন্ধ না করে সচিবালয়ে যাতায়াত করতে দেখা গেছে। গত ২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারেও তাকে ব্যতিক্রমী রূপে দেখা যায়। একুশের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি তিনি শহীদ মিনারের বেদিতে দাঁড়িয়ে তাদের মাগফিরাত কামনায় দোয়া করেন। শপথ গ্রহণের তিন দিন পর, শনিবার নিজ কার্যালয়ে গিয়ে তিনি একটি ‘স্বর্ণচাঁপা’ ফুলের চারা রোপণ করেন। (উল্লেখ্য, অনেকের প্রত্যাশা ছিল তিনি কাঁঠালিচাঁপার গাছ রোপণ করবেন, যা তার মা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রিয় ফুল ছিল এবং ১৯৯৩ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই গাছ লাগিয়েছিলেন, যা পরবর্তীকালে কেটে ফেলা হয়।) তেজগাঁও কার্যালয়ে তিনি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বিশেষ স্মারক ডাকটিকিট ও উদ্বোধনী খাম উন্মোচন করেন।

শনিবার নিজ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানীর বিষয়। প্রাথমিকভাবে দেশের পাঁচ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এই কার্ড মূলত পরিবারের নারী সদস্য বা গৃহিণীর নামে ইস্যু করা হবে এবং এর মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারকে মাসিক দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা এবং প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হবে। রমজান মাসেই আটটি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে এই কার্যক্রম শুরু হবে এবং পর্যায়ক্রমে সারা দেশে এটি চালু করা হবে। এছাড়া, আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগেই দেশের বিভিন্ন এলাকার ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিনদের উৎসব ভাতা এবং মাসিক সম্মানী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাদের জন্য ‘সার্ভিস রুল’ (সেবা বিধিমালা) প্রণয়নেরও ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এই প্রকল্পগুলোকে তিনি দেশের তৃণমূল পর্যায়ের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ‘স্বপ্ন প্রকল্প’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো—তার নতুন সরকারের অগ্রাধিকারের শীর্ষে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণকে রাখা। তিনি প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে ১৮০ দিনের একটি বিশেষ পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। রমজানের প্রধান খাদ্যসামগ্রী যেমন খেজুর, ভোজ্যতেল এবং ডাল আমদানিতে শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বাজার মনিটরিং এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখার জন্য স্বরাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বল্পমূল্যে খাদ্য সহায়তার উদ্যোগ হিসেবে তিনি ১০ লাখ নিম্নবিত্ত পরিবারকে সুলভ মূল্যে মাছ, মাংস, দুধ, ডিম সরবরাহের জন্য খাদ্য ও মৎস্য মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিতে বলেছেন। রমজানে ইফতার, সাহরি ও তারাবির সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন।

পবিত্র রমজান মাসে বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিমপ্রধান দেশে সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও মালয়েশিয়ায় ১০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় ঘোষণা করা হয়। এমনকি অমুসলিম দেশ যুক্তরাজ্য ও কানাডাতেও রমজানে বিশেষ ছাড় দেখা যায়। তবে বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন; এখানকার ব্যবসায়ীরা রমজান মাসকে মুনাফা লাভের উপযুক্ত সময় হিসেবে দেখে দ্রব্যমূল্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেন। এই প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতির উদ্দেশে তার ভাষণে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে রমজানকে আত্মশুদ্ধির মাস হিসেবে উল্লেখ করে মুনাফা লাভের মাস না বানানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তার সরকার সব ধরনের মাফিয়া সিন্ডিকেট ও অনাচার-অনিয়ম ভেঙে দিতে বদ্ধপরিকর এবং অসাধু ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মন্তব্য দেখা গেছে। তবে বাস্তবতা হলো, ড. খলিলুর রহমান একজন অর্থনীতিবিদ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং কূটনীতি বিষয়ে একজন পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব। ১৯৭৭ সালের প্রথম নিয়মিত সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে তিনি ১৯৭৯ সালে পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জনের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস বিশ্ববিদ্যালয় এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। জাতিসংঘ সচিবালয়ে দীর্ঘ ২৫ বছর অত্যন্ত জ্যেষ্ঠ পদে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। ড. খলিলকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের পেছনে কৌশলগত ও পেশাদারী কারণ বিদ্যমান। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেনটেটিভ হিসেবে তার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক সম্পর্ক বজায় রাখতে সহায়ক হবে। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করার তার অভিজ্ঞতাও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য মূল্যবান।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ড. খলিলুর রহমান জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের ঘোষণা দিয়েছেন, যা গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত তাৎপর্য বহন করে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ৭০-এর দশকে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতি জনপ্রিয় করেছিলেন। ড. খলিলুর রহমান মনে করেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে, যেখানে আমেরিকা, চীন এবং ভারতের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে, সেখানে কোনো নির্দিষ্ট ব্লকে না গিয়ে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ। জিয়াউর রহমান ছিলেন সার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা, এবং ড. খলিল সার্ককে পুনরায় সক্রিয় করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার মতে, জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি ছিল ‘বাস্তবসম্মত এবং দেশপ্রেমিক,’ যা অনুসরণ করলে বাংলাদেশ বড় দেশগুলোর চাপের মুখেও নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে মূল ভিত্তি ধরে ড. খলিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১৮০ দিনের কর্মসূচি তৈরি করছেন, যেখানে কেবল বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এসব বিবেচনায় মনে হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবকিছু বিবেচনা করেই ড. খলিলুর রহমানকে তার মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সামনের দিনগুলোতে তার এই পদক্ষেপের সুফল আরও স্পষ্ট হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

‘আগে কাজ, পরে কথা’: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে মোস্তাকুর রহমানের কার্যভার গ্রহণ

নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সাত দিন: দৃঢ়তা ও জনমুখীতার বার্তা

আপডেট সময় : ১০:০৩:৪৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

‘সকালের সূর্যই বলে দেয় দিনটি কেমন যাবে’—জনপ্রিয় এই প্রবাদটি যেন সার্থকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে সদ্য নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম সপ্তাহের কার্যক্রমে। রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর তারেক রহমানের গতিশীল পদক্ষেপগুলো স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে তার বাবা, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সেই ঐতিহাসিক উক্তি, যেখানে তিনি রাজনীতিকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার এবং ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারকারীদের জন্য কঠিন করে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন, তারেক রহমানও পিতার সেই জনমুখী ধারাই অনুসরণ করছেন, যা তার প্রথম কয়েক দিনের কাজ থেকেই স্পষ্ট। নিঃসন্দেহে তার এই শুরুটা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

ইতিহাস সৃষ্টিকারী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তিনি ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রীসহ একটি সুষম মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন, যেখানে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তিনি নিজের কাছেই রেখেছেন। শপথ গ্রহণের পর তার সরকারের আজ সাত দিন পূর্ণ হয়েছে, এবং শুক্রবারে সরকারি ছুটি ব্যতীত অন্য সব দিনেই তাকে কর্মব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে।

প্রচলিত রীতি ভেঙে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় খোলা আকাশের নিচে, জনগণের সরাসরি উপস্থিতিতে শপথ গ্রহণ করে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ড. মোহামেদ মুইজ্জু, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে, ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ও পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়নমন্ত্রী আহসান ইকবাল চৌধুরীসহ ১৩টি দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন, যা অনুষ্ঠানটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তোলে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার আগে, ১৭ ফেব্রুয়ারি সকালে তারেক রহমান দলীয় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সঙ্গে ‘সংসদ সদস্য’ হিসেবে শপথ নেন। এরপর অনুষ্ঠিত সংসদীয় দলের সভায় তিনি সর্বসম্মতিক্রমে সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হন। এই সভাতেই তিনি ঘোষণা করেন যে, তার দলের কোনো সংসদ সদস্য শুল্কমুক্ত গাড়ি বা সরকারি প্লট বরাদ্দের সুবিধা গ্রহণ করবেন না। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকারি আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রথম দুদিন তিনি বাংলাদেশ সচিবালয়ে অফিস করেন এবং মন্ত্রিসভার বৈঠকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। জাতির উদ্দেশে দেওয়া তার প্রথম ভাষণে তিনি সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবং মন্ত্রীদের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় পরিহারের নির্দেশ দেন। পবিত্র রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা এবং সিন্ডিকেট দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের ঘোষণা দেন তিনি। তার এই ভাষণ সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বার্তা দেয়, যা একটি জবাবদিহিমূলক সরকারের প্রতিশ্রুতির ইঙ্গিত বহন করে। তিনি ঘোষণা করেন, রাজনৈতিক আদর্শ ভিন্ন হলেও দেশের সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হবে, যা একটি বৈষম্যহীন আগামীর পূর্বাভাস। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক বিভাজন দূর করে দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনে ‘জাতীয় ঐক্য’ ও শান্তির ডাক দেন।

গতানুগতিক ভিভিআইপি প্রথা ভেঙে তারেক রহমানকে সাধারণ জনগণের মতো ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে এবং কোনো রাস্তা বন্ধ না করে সচিবালয়ে যাতায়াত করতে দেখা গেছে। গত ২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারেও তাকে ব্যতিক্রমী রূপে দেখা যায়। একুশের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি তিনি শহীদ মিনারের বেদিতে দাঁড়িয়ে তাদের মাগফিরাত কামনায় দোয়া করেন। শপথ গ্রহণের তিন দিন পর, শনিবার নিজ কার্যালয়ে গিয়ে তিনি একটি ‘স্বর্ণচাঁপা’ ফুলের চারা রোপণ করেন। (উল্লেখ্য, অনেকের প্রত্যাশা ছিল তিনি কাঁঠালিচাঁপার গাছ রোপণ করবেন, যা তার মা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রিয় ফুল ছিল এবং ১৯৯৩ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই গাছ লাগিয়েছিলেন, যা পরবর্তীকালে কেটে ফেলা হয়।) তেজগাঁও কার্যালয়ে তিনি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বিশেষ স্মারক ডাকটিকিট ও উদ্বোধনী খাম উন্মোচন করেন।

শনিবার নিজ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানীর বিষয়। প্রাথমিকভাবে দেশের পাঁচ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এই কার্ড মূলত পরিবারের নারী সদস্য বা গৃহিণীর নামে ইস্যু করা হবে এবং এর মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারকে মাসিক দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা এবং প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হবে। রমজান মাসেই আটটি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে এই কার্যক্রম শুরু হবে এবং পর্যায়ক্রমে সারা দেশে এটি চালু করা হবে। এছাড়া, আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগেই দেশের বিভিন্ন এলাকার ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিনদের উৎসব ভাতা এবং মাসিক সম্মানী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাদের জন্য ‘সার্ভিস রুল’ (সেবা বিধিমালা) প্রণয়নেরও ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এই প্রকল্পগুলোকে তিনি দেশের তৃণমূল পর্যায়ের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ‘স্বপ্ন প্রকল্প’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো—তার নতুন সরকারের অগ্রাধিকারের শীর্ষে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণকে রাখা। তিনি প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে ১৮০ দিনের একটি বিশেষ পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। রমজানের প্রধান খাদ্যসামগ্রী যেমন খেজুর, ভোজ্যতেল এবং ডাল আমদানিতে শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বাজার মনিটরিং এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখার জন্য স্বরাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বল্পমূল্যে খাদ্য সহায়তার উদ্যোগ হিসেবে তিনি ১০ লাখ নিম্নবিত্ত পরিবারকে সুলভ মূল্যে মাছ, মাংস, দুধ, ডিম সরবরাহের জন্য খাদ্য ও মৎস্য মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিতে বলেছেন। রমজানে ইফতার, সাহরি ও তারাবির সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন।

পবিত্র রমজান মাসে বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিমপ্রধান দেশে সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও মালয়েশিয়ায় ১০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় ঘোষণা করা হয়। এমনকি অমুসলিম দেশ যুক্তরাজ্য ও কানাডাতেও রমজানে বিশেষ ছাড় দেখা যায়। তবে বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন; এখানকার ব্যবসায়ীরা রমজান মাসকে মুনাফা লাভের উপযুক্ত সময় হিসেবে দেখে দ্রব্যমূল্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেন। এই প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতির উদ্দেশে তার ভাষণে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে রমজানকে আত্মশুদ্ধির মাস হিসেবে উল্লেখ করে মুনাফা লাভের মাস না বানানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তার সরকার সব ধরনের মাফিয়া সিন্ডিকেট ও অনাচার-অনিয়ম ভেঙে দিতে বদ্ধপরিকর এবং অসাধু ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মন্তব্য দেখা গেছে। তবে বাস্তবতা হলো, ড. খলিলুর রহমান একজন অর্থনীতিবিদ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং কূটনীতি বিষয়ে একজন পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব। ১৯৭৭ সালের প্রথম নিয়মিত সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে তিনি ১৯৭৯ সালে পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জনের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস বিশ্ববিদ্যালয় এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। জাতিসংঘ সচিবালয়ে দীর্ঘ ২৫ বছর অত্যন্ত জ্যেষ্ঠ পদে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। ড. খলিলকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের পেছনে কৌশলগত ও পেশাদারী কারণ বিদ্যমান। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেনটেটিভ হিসেবে তার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক সম্পর্ক বজায় রাখতে সহায়ক হবে। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করার তার অভিজ্ঞতাও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য মূল্যবান।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ড. খলিলুর রহমান জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের ঘোষণা দিয়েছেন, যা গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত তাৎপর্য বহন করে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ৭০-এর দশকে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতি জনপ্রিয় করেছিলেন। ড. খলিলুর রহমান মনে করেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে, যেখানে আমেরিকা, চীন এবং ভারতের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে, সেখানে কোনো নির্দিষ্ট ব্লকে না গিয়ে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ। জিয়াউর রহমান ছিলেন সার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা, এবং ড. খলিল সার্ককে পুনরায় সক্রিয় করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার মতে, জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি ছিল ‘বাস্তবসম্মত এবং দেশপ্রেমিক,’ যা অনুসরণ করলে বাংলাদেশ বড় দেশগুলোর চাপের মুখেও নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে মূল ভিত্তি ধরে ড. খলিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১৮০ দিনের কর্মসূচি তৈরি করছেন, যেখানে কেবল বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এসব বিবেচনায় মনে হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবকিছু বিবেচনা করেই ড. খলিলুর রহমানকে তার মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সামনের দিনগুলোতে তার এই পদক্ষেপের সুফল আরও স্পষ্ট হবে।