ঢাকা ০১:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

‘ইনকিলাব’ নিয়ে মন্ত্রীর ‘রক্তক্ষরণ’: ভাষার রাজনীতি নাকি ক্ষমতার ভয়?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:০০:১৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

সম্প্রতি মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এক আলোচনা সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর ‘ইনকিলাব’ শব্দ ব্যবহার নিয়ে করা মন্তব্য দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তরুণ প্রজন্মের মুখে এই শব্দ শুনে নিজের ‘রক্তক্ষরণ’ হওয়ার কথা জানিয়ে মন্ত্রী এটিকে বাংলার সঙ্গে সম্পর্কহীন ও বিদেশি শক্তির ভাষা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে ভাষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মন্ত্রীর এই বক্তব্য কেবল ভাষাতাত্ত্বিক ভুল নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে ক্ষমতার রাজনীতি ও ভিন্ন মত দমনের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা।

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ওই সভায় মন্ত্রী বলেন, “আজ বাংলা ভাষা সম্পর্কে আমরা নিজেরা যদি একটু চিন্তা করতাম, তাহলে আজকের জেনজি ইনকিলাব বলত না। তারা ইনকিলাব বললে আমার রক্তক্ষরণ হয়। এটার জন্যই মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম? অথচ না গেলেও চলত। সমাজ পরিবর্তনের জন্য জীবন দিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সমাজ যে উল্টোদিকে হাঁটে, এখন সেটা দেখছি।” তিনি আরও যোগ করেন, “বাংলাকে যদি ধারণ করতে হয়, তাহলে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ চলবে না। ইনকিলাব, ইনকিলাব মঞ্চ ও আজাদির মতো নতুন শব্দ শুনছি। এগুলো বাংলার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। যারা আমাদের মায়ের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল, এগুলো তাদের ভাষা।” মন্ত্রী এমন কথা বলায় নিজেকে ‘ভারতের দালাল’ বা ‘র-এর এজেন্ট’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেন।

মন্ত্রীর এই কঠোর মন্তব্যের পরপরই ভাষা ও রাজনীতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। ভাষা কোনো স্থির বা পবিত্র জাদুঘর নয়, বরং এটি একটি বহমান সত্তা, যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, গ্রহণ করে এবং বর্জন করে। বাংলা ভাষার দীর্ঘ ইতিহাসই এর প্রমাণ। পালি, প্রাকৃত, আরবি, ফারসি, তুর্কি ও ইংরেজিÑবহু ভাষার সংমিশ্রণেই আজকের বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে। এই বহুমাত্রিকতাই বাংলার শক্তি।

যদি বিদেশি শব্দ বর্জনের প্রশ্ন ওঠে, তাহলে ‘শহীদ’, ‘মিনার’, ‘ফেব্রুয়ারি’, ‘কলম’, ‘খবর’ বা ‘দুনিয়া’র মতো অসংখ্য শব্দকে বাংলা থেকে বাদ দিতে হবে, যা প্রায় অসম্ভব। সমাজমাধ্যমে খাঁটি বাংলায় দশ মিনিট কথা বলার চ্যালেঞ্জের বাস্তবতা প্রমাণ করে, আমরা যে বাংলা বলি, তা বহু শতকের আত্মীকরণের ফল। এমনকি, মন্ত্রীর নিজের নাম ‘ইকবাল হাসান মাহমুদ’ও আরবি উৎস থেকে আসা। তাই নির্দিষ্ট কিছু আরবি শব্দে আপত্তি তুলে ইংরেজির আশ্রয় নেওয়া ভাষার প্রশ্ন নয়, এটি স্পষ্টতই রাজনীতির প্রশ্ন।

ভাষা সবসময়ই রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফ্রান্স, তুরস্ক বা ভারতের মতো দেশগুলোতেও ভাষার রাজনীতি বিদ্যমান। কিন্তু যখন ভাষার রাজনীতি দমনমূলক হয়ে ওঠে, তখন তা ফ্যাসিবাদী আচরণে পর্যবসিত হয়। ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া মানে মানুষের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া। একজন রাজনৈতিক দার্শনিক যেমন বলেছিলেন, স্বৈরতন্ত্রের প্রথম কাজই হলো মানুষের ভাষা ও বয়ান ধ্বংস করা, কারণ ভাষা ধ্বংস মানে চিন্তার বিকল্প ধ্বংস।

‘ইনকিলাব’ শব্দটি কোনো ধর্মীয় স্লোগান নয়, এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এবং পরিবর্তনের ডাক। ইউরোপে যাকে ‘রেভ্যুলিউশন’ বলা হয়, উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামেও ‘ইনকিলাব’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। শব্দের উৎস দিয়ে তার বৈধতা বিচার করা হয় না, বরং ব্যবহার, গ্রহণ এবং টিকে থাকার মাধ্যমেই শব্দের ক্ষমতা নির্ধারিত হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ঔপনিবেশিক ইংরেজদের হটাতে এই শব্দ প্রথম রাজনৈতিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছিল।

গত জুলাই-আগস্টে তরুণ প্রজন্ম ‘ইনকিলাব’, ‘ইনসাফ’ ও ‘আজাদি’র মতো শব্দগুলো কোনো হীনমন্যতা ছাড়াই ধারণ করেছে। তাদের দাবি, আকাঙ্ক্ষা এবং রাজপথ সবই নিজেদের। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. সালেহ হাসান নকীবের মন্তব্য এখানে প্রণিধানযোগ্য, “ইনকিলাব, ইনসাফ, আজাদি—এই শব্দগুলো আমাদের ছেলেমেয়েরা অপূর্ব স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে ২৪-এর জুলাই-আগস্টে ধারণ করেছে কোনো ধরনের হীনম্মন্যতা ছাড়াই। যত অ্যালার্জি, শব্দগুলো ততই শক্তিশালী হয়ে উঠবে।” তার এই কথা ইতিহাসের সত্যকে তুলে ধরে।

যারা আজ ভাষার বিশুদ্ধতা নিয়ে কথা বলছেন, তারা দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থেকেও শিক্ষাব্যবস্থা, উচ্চ আদালত, প্রশাসন বা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার পূর্ণাঙ্গ প্রচলনে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। প্রশ্ন ওঠে, তাদের এই ভাষারক্ষা চেষ্টার পেছনে কি ফ্যাসিবাদী শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য একটি মিথ্যা বয়ান তৈরির উদ্দেশ্য কাজ করছে না? ভাষার প্রশ্ন তখনই প্রবল হয়, যখন ক্ষমতা টলে ওঠে, আর তখন ভাষা হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণের এক শক্তিশালী হাতিয়ার।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেও এই বিতর্ক নতুন নয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার কবিতায় আরবি-ফারসি শব্দের বিপুল ব্যবহার করেছিলেন। ‘খুন’, ‘শহীদ’, ‘ইনসাফ’, ‘কেয়ামত’Ñএই শব্দগুলো তার কাব্যে নতুন শক্তি এনেছিল, যদিও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রাথমিকভাবে আপত্তি তুলেছিলেন। ইতিহাস প্রমাণ করেছে নজরুলই সঠিক ছিলেন। ফররুখ আহমদ, আল মাহমুদের মতো কবিরাও এই ধারাকে এগিয়ে নিয়ে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন, সংকুচিত করেননি। ভাষা কখনো একরৈখিক নয়, এটি বহুমুখী এবং গণমানুষের।

তরুণরা আজ যে ভাষা বেছে নিয়েছে, তা তাদের অভিজ্ঞতা, দমন-পীড়ন এবং বৈষম্য থেকেই উৎসারিত। এই ভাষাকে অস্বীকার করা মানে তাদের অভিজ্ঞতাকেই অস্বীকার করা। ‘ইনকিলাব’ শুধু একটি স্লোগান নয়, এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে হৃদয়ের গর্জন। যে স্লোগান স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে, সেই স্লোগান তাদের উত্তরসূরিদের ভয়ের কারণ হবেই। ভয় থেকেই নিষেধ আসে, ভয় থেকেই ভাষার শুদ্ধতার বুলি ওঠে। যখন জাতীয়তাবাদ নাগরিকতার বদলে গোত্রে পরিণত হয়, তখন রাষ্ট্র নয়, ট্রাইব কথা বলে। ‘ইনকিলাব’ বা ‘আজাদি’ শব্দগুলো এক শ্রেণির মানুষকে আতঙ্কিত করে, কারণ এই শব্দগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং সরাসরি অন্যায়কে চ্যালেঞ্জ করে।

রাজনৈতিক চিন্তাবিদ বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন বলেছিলেন, জাতি আসলে একটি কল্পিত সম্প্রদায়, যা ভাষা ও বয়ানের মাধ্যমে টিকে থাকে। সেই বয়ান যদি হাতছাড়া হয়ে যায়, ক্ষমতাও হাতছাড়া হয়। এ কারণেই ভাষা নিয়ে এত হইচই। আজ শব্দ নিয়ে যে বিতর্ক, তা এক অর্থে ‘টেস্ট ফায়ার’। আজ শব্দ, কাল ভাবনা, পরশু মানুষ নিয়ে একই ধরনের আগ্রাসী প্রবণতা দেখা যেতে পারে। তবে ইতিহাস বলে, ভাষা দমন করলে তা আরও শক্তিশালী হয়। সভ্যতা মানে সহনশীলতা, ভিন্নতার সঙ্গে সহাবস্থান। বিশ্ব যখন অন্তর্ভুক্তির দিকে এগোচ্ছে, আমরা তখন ব্যস্ত বর্জনে। ভাষা কারো একক সম্পত্তি নয়, এটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহার। শব্দ বাঁচে ব্যবহারে, ভাষা বাঁচে স্বাধীনতায়, আর গণতন্ত্র বাঁচে বাস্তবায়নে। জুলাই বিপ্লবের জনআকাঙ্ক্ষাকে কোনো শব্দ-ভীতি দিয়ে থামানো যাবে না। ইনকিলাব মানে পরিবর্তন, পরিবর্তন মানে ভয় ভাঙা। ভয় ভাঙলেই ভবিষ্যতের পথ উন্মোচিত হয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শিল্প-সাহিত্যচর্চা রাজনীতির ঊর্ধ্বে: প্রধানমন্ত্রী

‘ইনকিলাব’ নিয়ে মন্ত্রীর ‘রক্তক্ষরণ’: ভাষার রাজনীতি নাকি ক্ষমতার ভয়?

আপডেট সময় : ১০:০০:১৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সম্প্রতি মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এক আলোচনা সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর ‘ইনকিলাব’ শব্দ ব্যবহার নিয়ে করা মন্তব্য দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তরুণ প্রজন্মের মুখে এই শব্দ শুনে নিজের ‘রক্তক্ষরণ’ হওয়ার কথা জানিয়ে মন্ত্রী এটিকে বাংলার সঙ্গে সম্পর্কহীন ও বিদেশি শক্তির ভাষা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে ভাষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মন্ত্রীর এই বক্তব্য কেবল ভাষাতাত্ত্বিক ভুল নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে ক্ষমতার রাজনীতি ও ভিন্ন মত দমনের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা।

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ওই সভায় মন্ত্রী বলেন, “আজ বাংলা ভাষা সম্পর্কে আমরা নিজেরা যদি একটু চিন্তা করতাম, তাহলে আজকের জেনজি ইনকিলাব বলত না। তারা ইনকিলাব বললে আমার রক্তক্ষরণ হয়। এটার জন্যই মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম? অথচ না গেলেও চলত। সমাজ পরিবর্তনের জন্য জীবন দিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সমাজ যে উল্টোদিকে হাঁটে, এখন সেটা দেখছি।” তিনি আরও যোগ করেন, “বাংলাকে যদি ধারণ করতে হয়, তাহলে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ চলবে না। ইনকিলাব, ইনকিলাব মঞ্চ ও আজাদির মতো নতুন শব্দ শুনছি। এগুলো বাংলার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। যারা আমাদের মায়ের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল, এগুলো তাদের ভাষা।” মন্ত্রী এমন কথা বলায় নিজেকে ‘ভারতের দালাল’ বা ‘র-এর এজেন্ট’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেন।

মন্ত্রীর এই কঠোর মন্তব্যের পরপরই ভাষা ও রাজনীতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। ভাষা কোনো স্থির বা পবিত্র জাদুঘর নয়, বরং এটি একটি বহমান সত্তা, যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, গ্রহণ করে এবং বর্জন করে। বাংলা ভাষার দীর্ঘ ইতিহাসই এর প্রমাণ। পালি, প্রাকৃত, আরবি, ফারসি, তুর্কি ও ইংরেজিÑবহু ভাষার সংমিশ্রণেই আজকের বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে। এই বহুমাত্রিকতাই বাংলার শক্তি।

যদি বিদেশি শব্দ বর্জনের প্রশ্ন ওঠে, তাহলে ‘শহীদ’, ‘মিনার’, ‘ফেব্রুয়ারি’, ‘কলম’, ‘খবর’ বা ‘দুনিয়া’র মতো অসংখ্য শব্দকে বাংলা থেকে বাদ দিতে হবে, যা প্রায় অসম্ভব। সমাজমাধ্যমে খাঁটি বাংলায় দশ মিনিট কথা বলার চ্যালেঞ্জের বাস্তবতা প্রমাণ করে, আমরা যে বাংলা বলি, তা বহু শতকের আত্মীকরণের ফল। এমনকি, মন্ত্রীর নিজের নাম ‘ইকবাল হাসান মাহমুদ’ও আরবি উৎস থেকে আসা। তাই নির্দিষ্ট কিছু আরবি শব্দে আপত্তি তুলে ইংরেজির আশ্রয় নেওয়া ভাষার প্রশ্ন নয়, এটি স্পষ্টতই রাজনীতির প্রশ্ন।

ভাষা সবসময়ই রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফ্রান্স, তুরস্ক বা ভারতের মতো দেশগুলোতেও ভাষার রাজনীতি বিদ্যমান। কিন্তু যখন ভাষার রাজনীতি দমনমূলক হয়ে ওঠে, তখন তা ফ্যাসিবাদী আচরণে পর্যবসিত হয়। ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া মানে মানুষের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া। একজন রাজনৈতিক দার্শনিক যেমন বলেছিলেন, স্বৈরতন্ত্রের প্রথম কাজই হলো মানুষের ভাষা ও বয়ান ধ্বংস করা, কারণ ভাষা ধ্বংস মানে চিন্তার বিকল্প ধ্বংস।

‘ইনকিলাব’ শব্দটি কোনো ধর্মীয় স্লোগান নয়, এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এবং পরিবর্তনের ডাক। ইউরোপে যাকে ‘রেভ্যুলিউশন’ বলা হয়, উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামেও ‘ইনকিলাব’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। শব্দের উৎস দিয়ে তার বৈধতা বিচার করা হয় না, বরং ব্যবহার, গ্রহণ এবং টিকে থাকার মাধ্যমেই শব্দের ক্ষমতা নির্ধারিত হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ঔপনিবেশিক ইংরেজদের হটাতে এই শব্দ প্রথম রাজনৈতিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছিল।

গত জুলাই-আগস্টে তরুণ প্রজন্ম ‘ইনকিলাব’, ‘ইনসাফ’ ও ‘আজাদি’র মতো শব্দগুলো কোনো হীনমন্যতা ছাড়াই ধারণ করেছে। তাদের দাবি, আকাঙ্ক্ষা এবং রাজপথ সবই নিজেদের। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. সালেহ হাসান নকীবের মন্তব্য এখানে প্রণিধানযোগ্য, “ইনকিলাব, ইনসাফ, আজাদি—এই শব্দগুলো আমাদের ছেলেমেয়েরা অপূর্ব স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে ২৪-এর জুলাই-আগস্টে ধারণ করেছে কোনো ধরনের হীনম্মন্যতা ছাড়াই। যত অ্যালার্জি, শব্দগুলো ততই শক্তিশালী হয়ে উঠবে।” তার এই কথা ইতিহাসের সত্যকে তুলে ধরে।

যারা আজ ভাষার বিশুদ্ধতা নিয়ে কথা বলছেন, তারা দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থেকেও শিক্ষাব্যবস্থা, উচ্চ আদালত, প্রশাসন বা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার পূর্ণাঙ্গ প্রচলনে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। প্রশ্ন ওঠে, তাদের এই ভাষারক্ষা চেষ্টার পেছনে কি ফ্যাসিবাদী শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য একটি মিথ্যা বয়ান তৈরির উদ্দেশ্য কাজ করছে না? ভাষার প্রশ্ন তখনই প্রবল হয়, যখন ক্ষমতা টলে ওঠে, আর তখন ভাষা হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণের এক শক্তিশালী হাতিয়ার।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেও এই বিতর্ক নতুন নয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার কবিতায় আরবি-ফারসি শব্দের বিপুল ব্যবহার করেছিলেন। ‘খুন’, ‘শহীদ’, ‘ইনসাফ’, ‘কেয়ামত’Ñএই শব্দগুলো তার কাব্যে নতুন শক্তি এনেছিল, যদিও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রাথমিকভাবে আপত্তি তুলেছিলেন। ইতিহাস প্রমাণ করেছে নজরুলই সঠিক ছিলেন। ফররুখ আহমদ, আল মাহমুদের মতো কবিরাও এই ধারাকে এগিয়ে নিয়ে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন, সংকুচিত করেননি। ভাষা কখনো একরৈখিক নয়, এটি বহুমুখী এবং গণমানুষের।

তরুণরা আজ যে ভাষা বেছে নিয়েছে, তা তাদের অভিজ্ঞতা, দমন-পীড়ন এবং বৈষম্য থেকেই উৎসারিত। এই ভাষাকে অস্বীকার করা মানে তাদের অভিজ্ঞতাকেই অস্বীকার করা। ‘ইনকিলাব’ শুধু একটি স্লোগান নয়, এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে হৃদয়ের গর্জন। যে স্লোগান স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে, সেই স্লোগান তাদের উত্তরসূরিদের ভয়ের কারণ হবেই। ভয় থেকেই নিষেধ আসে, ভয় থেকেই ভাষার শুদ্ধতার বুলি ওঠে। যখন জাতীয়তাবাদ নাগরিকতার বদলে গোত্রে পরিণত হয়, তখন রাষ্ট্র নয়, ট্রাইব কথা বলে। ‘ইনকিলাব’ বা ‘আজাদি’ শব্দগুলো এক শ্রেণির মানুষকে আতঙ্কিত করে, কারণ এই শব্দগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং সরাসরি অন্যায়কে চ্যালেঞ্জ করে।

রাজনৈতিক চিন্তাবিদ বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন বলেছিলেন, জাতি আসলে একটি কল্পিত সম্প্রদায়, যা ভাষা ও বয়ানের মাধ্যমে টিকে থাকে। সেই বয়ান যদি হাতছাড়া হয়ে যায়, ক্ষমতাও হাতছাড়া হয়। এ কারণেই ভাষা নিয়ে এত হইচই। আজ শব্দ নিয়ে যে বিতর্ক, তা এক অর্থে ‘টেস্ট ফায়ার’। আজ শব্দ, কাল ভাবনা, পরশু মানুষ নিয়ে একই ধরনের আগ্রাসী প্রবণতা দেখা যেতে পারে। তবে ইতিহাস বলে, ভাষা দমন করলে তা আরও শক্তিশালী হয়। সভ্যতা মানে সহনশীলতা, ভিন্নতার সঙ্গে সহাবস্থান। বিশ্ব যখন অন্তর্ভুক্তির দিকে এগোচ্ছে, আমরা তখন ব্যস্ত বর্জনে। ভাষা কারো একক সম্পত্তি নয়, এটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহার। শব্দ বাঁচে ব্যবহারে, ভাষা বাঁচে স্বাধীনতায়, আর গণতন্ত্র বাঁচে বাস্তবায়নে। জুলাই বিপ্লবের জনআকাঙ্ক্ষাকে কোনো শব্দ-ভীতি দিয়ে থামানো যাবে না। ইনকিলাব মানে পরিবর্তন, পরিবর্তন মানে ভয় ভাঙা। ভয় ভাঙলেই ভবিষ্যতের পথ উন্মোচিত হয়।