ঢাকা ০১:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

অস্তিত্বের সংকটে ইরানের ইসলামি বিপ্লব: খামেনির সামনে কঠিনতম চ্যালেঞ্জ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৫৯:১৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

গত ১১ ফেব্রুয়ারি ৪৭তম বার্ষিকী উদযাপন করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লব। তবে এবারের উৎসবের আবহ ছাপিয়ে দেশটিতে এখন যুদ্ধের মেঘ ঘনীভূত। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসনের হুমকি এবং ইসরাইলের সর্বাত্মক প্রস্তুতির মুখে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে, এই অগ্নিপরীক্ষায় টিকে কি থাকতে পারবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র?

ইরানের ইসলামপন্থি সরকার বিপ্লবের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের কঠোর নিষেধাজ্ঞার শিকার। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশটির অর্থনীতি, দেখা দিয়েছে অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ। সর্বশেষ, দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচিতে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার পরও টিকে আছে তেহরান। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সরকার পরিবর্তনের হুমকি দিয়েছেন এবং যেকোনো সময় দেশটিতে হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ওয়াশিংটন ইতোমধ্যে বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও এর সহযোগী যুদ্ধজাহাজগুলো ইরানের কাছাকাছি পাঠিয়েছে। পথে রয়েছে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড। পাশাপাশি অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর অনুযায়ী, বৃহত্তর পরিসরে যুদ্ধে না জড়িয়ে ভেনেজুয়েলার মতো নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে সীমিত হামলা চালানো হতে পারে। এর মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিসহ ধর্মীয় নেতৃত্ব ও প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের হত্যা বা আটক করার বিষয়টিও বিবেচনাধীন রয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও ধ্বংস করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল।

৮৬ বছর বয়সী খামেনি এমন এক সময়ে মার্কিন ও ইসরাইলি আগ্রাসনের হুমকির মুখোমুখি হয়েছেন, যখন এই দুই দেশ মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র নিজেদের মতো করে পুনর্নির্মাণে ব্যস্ত। খোমেনির পর ১৯৮৯ সালে ৪৯ বছর বয়সে ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গত ৩৬ বছর ধরে সুপ্রিম লিডার হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। এর আগে ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তার দীর্ঘ শাসনামলের এই পর্যায়ে এসে তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের মুখোমুখি। ইসলামি শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক চাপের ভারসাম্য বজায় রাখাই তার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে না পারলে ইরান এবং এর আশপাশের অঞ্চলের ভূরাজনীতির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। দেশের চলমান তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতিতে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষের সাম্প্রতিক ব্যাপক আন্দোলন সরকার সহিংস পন্থায় দমন করেছে, যাতে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। ট্রাম্প এই বিষয়টিকে সামনে এনে পরমাণু ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত করে ইরানে হামলার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছেন।

গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব আগের চেয়ে অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও খামেনির প্রভাব অনেকটাই কমে গেছে। প্রধান মিত্রদের মধ্যে লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তি এখন দুর্বল, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদও আগের মতো শক্তিশালী অবস্থানে নেই। গাজা উপত্যকার হামাস অস্তিত্ব সংকটে এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। প্রধান মিত্র ও প্রতিনিধিরা দুর্বল হয়ে পড়ায় ইরানও বড় ধরনের চাপের মুখে। উপরন্তু, গত বছর জুন মাসে ইসরাইলি ও মার্কিন হামলায় গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি এখনো পঙ্গু। তা সত্ত্বেও, খামেনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে রক্ষা এবং তার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন। অতীতে বিভিন্ন সময়ে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব এবং বিদেশি চাপ মোকাবিলা করে ইসলামি বিপ্লবকে টিকিয়ে রাখার অভিজ্ঞতা রয়েছে এই বয়োবৃদ্ধ নেতার। তবে এবারের চ্যালেঞ্জ তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন।

রেজা শাহ পাহলভির শাসনামলে কারাবাস, ব্যাপক নির্যাতন ও হত্যার চেষ্টা থেকে বেঁচে ফেরা খামেনি নিঃসন্দেহে একজন লড়াকু মানুষ। তিনি একটি অনুগত নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে নিজেকে দুর্বলতা থেকে আধিপত্য বিস্তারের পর্যায়ে উন্নীত করেছেন। তার শাসনামলের প্রথমদিকে ধর্মীয় যোগ্যতার অভাব থাকলেও, তিনি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি), বাসিজ এবং কয়েক বিলিয়ন ডলার মূল্যের সেতাদ নামক একটি বিশাল আর্থিক সাম্রাজ্যের মাধ্যমে তার ক্ষমতাকে সুসংহত করেন। এগুলো তার রাজনৈতিক প্রভাব এবং কৌশলগত ও সামরিক উদ্যোগের তহবিল সংগ্রহের ক্ষমতা উভয়কেই শক্তিশালী করেছে। ক্ষমতার ওপর শক্ত দখল বজায় রাখার জন্য তিনি নিজেকে একজন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নেতা হিসেবে গড়ে তুলেছেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং পরে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার অভিজ্ঞতা ইরানের নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ককে দৃঢ় করেছে। তিনি একটি সুসংগঠিত নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করেন, যেখানে আইআরজিসি এবং আধাসামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’ অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও বিক্ষোভ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০০৯ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যু এবং সর্বশেষ গত জানুয়ারির ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর অস্থিরতা দমনে এই বাহিনীগুলো কার্যকর ছিল। এ কারণেই ট্রাম্পের হামলার হুমকির জবাবে খামেনি পাল্টা হুমকিও দিয়েছেন। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে জেনেভায় দ্বিতীয় দফার আলোচনা শুরুর দিনই যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেছেন, ইরান চাইলে পারস্য উপসাগরে মোতায়েন করা মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো ‘সমুদ্রের তলদেশে ডুবিয়ে দেওয়া’ সম্ভব। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীও এমন আঘাত পেতে পারে, যেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো তাদের জন্য কঠিন হবে।

এদিকে, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দেশটির হোম ফ্রন্ট কমান্ড ও বিভিন্ন উদ্ধার সংস্থাকে প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ইসরাইলি গণমাধ্যমে এ তথ্য প্রকাশিত হয়। নেতানিয়াহু সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে বলেছেন এবং দেশের বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থায় ‘সর্বোচ্চ সতর্কতা’ জারি করা হয়েছে। ইসরাইলের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, ইরান ইস্যুতে নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার পূর্বনির্ধারিত বৈঠক পিছিয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। ইসরাইল ট্রাম্প প্রশাসনের সবুজসংকেতের অপেক্ষায় রয়েছে, যাতে তারা ইরানের ব্যালাস্টিক মিসাইল সিস্টেমে আঘাত করতে পারে। ইসরাইলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আমানের সাবেক প্রধান আমোস ইয়াদলিন বলেছেন, ‘আমরা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে হামলার অনেক কাছাকাছি অবস্থানে আছি।’ নেতানিয়াহুর সরকার মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে ইরান তার প্রথম প্রতিক্রিয়া জানাবে ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বিত আক্রমণের সম্ভাবনা বাড়ায় ইসরাইলও ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান করে খামেনি কি পারবেন ইসলামি বিপ্লবের পথচলা অব্যাহত রেখে ৪৮তম বার্ষিকী উদযাপন করতে? নাকি ৪৭তম বছরেই থেমে যাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পথ চলা – মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এখন এই প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শিল্প-সাহিত্যচর্চা রাজনীতির ঊর্ধ্বে: প্রধানমন্ত্রী

অস্তিত্বের সংকটে ইরানের ইসলামি বিপ্লব: খামেনির সামনে কঠিনতম চ্যালেঞ্জ

আপডেট সময় : ০৯:৫৯:১৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

গত ১১ ফেব্রুয়ারি ৪৭তম বার্ষিকী উদযাপন করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লব। তবে এবারের উৎসবের আবহ ছাপিয়ে দেশটিতে এখন যুদ্ধের মেঘ ঘনীভূত। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসনের হুমকি এবং ইসরাইলের সর্বাত্মক প্রস্তুতির মুখে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে, এই অগ্নিপরীক্ষায় টিকে কি থাকতে পারবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র?

ইরানের ইসলামপন্থি সরকার বিপ্লবের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের কঠোর নিষেধাজ্ঞার শিকার। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশটির অর্থনীতি, দেখা দিয়েছে অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ। সর্বশেষ, দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচিতে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার পরও টিকে আছে তেহরান। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সরকার পরিবর্তনের হুমকি দিয়েছেন এবং যেকোনো সময় দেশটিতে হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ওয়াশিংটন ইতোমধ্যে বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও এর সহযোগী যুদ্ধজাহাজগুলো ইরানের কাছাকাছি পাঠিয়েছে। পথে রয়েছে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড। পাশাপাশি অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর অনুযায়ী, বৃহত্তর পরিসরে যুদ্ধে না জড়িয়ে ভেনেজুয়েলার মতো নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে সীমিত হামলা চালানো হতে পারে। এর মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিসহ ধর্মীয় নেতৃত্ব ও প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের হত্যা বা আটক করার বিষয়টিও বিবেচনাধীন রয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও ধ্বংস করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল।

৮৬ বছর বয়সী খামেনি এমন এক সময়ে মার্কিন ও ইসরাইলি আগ্রাসনের হুমকির মুখোমুখি হয়েছেন, যখন এই দুই দেশ মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র নিজেদের মতো করে পুনর্নির্মাণে ব্যস্ত। খোমেনির পর ১৯৮৯ সালে ৪৯ বছর বয়সে ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গত ৩৬ বছর ধরে সুপ্রিম লিডার হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। এর আগে ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তার দীর্ঘ শাসনামলের এই পর্যায়ে এসে তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের মুখোমুখি। ইসলামি শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক চাপের ভারসাম্য বজায় রাখাই তার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে না পারলে ইরান এবং এর আশপাশের অঞ্চলের ভূরাজনীতির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। দেশের চলমান তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতিতে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষের সাম্প্রতিক ব্যাপক আন্দোলন সরকার সহিংস পন্থায় দমন করেছে, যাতে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। ট্রাম্প এই বিষয়টিকে সামনে এনে পরমাণু ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত করে ইরানে হামলার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছেন।

গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব আগের চেয়ে অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও খামেনির প্রভাব অনেকটাই কমে গেছে। প্রধান মিত্রদের মধ্যে লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তি এখন দুর্বল, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদও আগের মতো শক্তিশালী অবস্থানে নেই। গাজা উপত্যকার হামাস অস্তিত্ব সংকটে এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। প্রধান মিত্র ও প্রতিনিধিরা দুর্বল হয়ে পড়ায় ইরানও বড় ধরনের চাপের মুখে। উপরন্তু, গত বছর জুন মাসে ইসরাইলি ও মার্কিন হামলায় গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি এখনো পঙ্গু। তা সত্ত্বেও, খামেনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে রক্ষা এবং তার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন। অতীতে বিভিন্ন সময়ে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব এবং বিদেশি চাপ মোকাবিলা করে ইসলামি বিপ্লবকে টিকিয়ে রাখার অভিজ্ঞতা রয়েছে এই বয়োবৃদ্ধ নেতার। তবে এবারের চ্যালেঞ্জ তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন।

রেজা শাহ পাহলভির শাসনামলে কারাবাস, ব্যাপক নির্যাতন ও হত্যার চেষ্টা থেকে বেঁচে ফেরা খামেনি নিঃসন্দেহে একজন লড়াকু মানুষ। তিনি একটি অনুগত নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে নিজেকে দুর্বলতা থেকে আধিপত্য বিস্তারের পর্যায়ে উন্নীত করেছেন। তার শাসনামলের প্রথমদিকে ধর্মীয় যোগ্যতার অভাব থাকলেও, তিনি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি), বাসিজ এবং কয়েক বিলিয়ন ডলার মূল্যের সেতাদ নামক একটি বিশাল আর্থিক সাম্রাজ্যের মাধ্যমে তার ক্ষমতাকে সুসংহত করেন। এগুলো তার রাজনৈতিক প্রভাব এবং কৌশলগত ও সামরিক উদ্যোগের তহবিল সংগ্রহের ক্ষমতা উভয়কেই শক্তিশালী করেছে। ক্ষমতার ওপর শক্ত দখল বজায় রাখার জন্য তিনি নিজেকে একজন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নেতা হিসেবে গড়ে তুলেছেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং পরে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার অভিজ্ঞতা ইরানের নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ককে দৃঢ় করেছে। তিনি একটি সুসংগঠিত নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করেন, যেখানে আইআরজিসি এবং আধাসামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’ অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও বিক্ষোভ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০০৯ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যু এবং সর্বশেষ গত জানুয়ারির ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর অস্থিরতা দমনে এই বাহিনীগুলো কার্যকর ছিল। এ কারণেই ট্রাম্পের হামলার হুমকির জবাবে খামেনি পাল্টা হুমকিও দিয়েছেন। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে জেনেভায় দ্বিতীয় দফার আলোচনা শুরুর দিনই যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেছেন, ইরান চাইলে পারস্য উপসাগরে মোতায়েন করা মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো ‘সমুদ্রের তলদেশে ডুবিয়ে দেওয়া’ সম্ভব। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীও এমন আঘাত পেতে পারে, যেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো তাদের জন্য কঠিন হবে।

এদিকে, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দেশটির হোম ফ্রন্ট কমান্ড ও বিভিন্ন উদ্ধার সংস্থাকে প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ইসরাইলি গণমাধ্যমে এ তথ্য প্রকাশিত হয়। নেতানিয়াহু সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে বলেছেন এবং দেশের বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থায় ‘সর্বোচ্চ সতর্কতা’ জারি করা হয়েছে। ইসরাইলের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, ইরান ইস্যুতে নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার পূর্বনির্ধারিত বৈঠক পিছিয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। ইসরাইল ট্রাম্প প্রশাসনের সবুজসংকেতের অপেক্ষায় রয়েছে, যাতে তারা ইরানের ব্যালাস্টিক মিসাইল সিস্টেমে আঘাত করতে পারে। ইসরাইলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আমানের সাবেক প্রধান আমোস ইয়াদলিন বলেছেন, ‘আমরা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে হামলার অনেক কাছাকাছি অবস্থানে আছি।’ নেতানিয়াহুর সরকার মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে ইরান তার প্রথম প্রতিক্রিয়া জানাবে ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বিত আক্রমণের সম্ভাবনা বাড়ায় ইসরাইলও ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান করে খামেনি কি পারবেন ইসলামি বিপ্লবের পথচলা অব্যাহত রেখে ৪৮তম বার্ষিকী উদযাপন করতে? নাকি ৪৭তম বছরেই থেমে যাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পথ চলা – মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এখন এই প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে।