ঢাকা ০১:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৩৬:৫২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

## কৃষি পর্যটন: দেশের টেকসই উন্নয়নে নতুন আশা

ঢাকা: কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশ আজ এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই পরিস্থিতিতে, কৃষি পর্যটন (Agro-Tourism) দেশের জন্য এক সমন্বিত উন্নয়ন মডেল হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। এটি কেবল বিনোদন নয়, বরং উৎপাদন, ভোগ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক মেলবন্ধন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এবং জাতীয় উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

কৃষি পর্যটন একটি ব্যাপক ধারণা, যা বিভিন্ন ধরনের কৃষিজ উৎপাদন এবং গ্রামীণ পরিবেশকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করে। খামার, মৎস্যঘের, ডেইরি, পোলট্রি, চা-বাগান, হাওর, বিল, সুন্দরবন সংলগ্ন নদী এলাকা, পাহাড়ি অঞ্চল, বরেন্দ্র ভূমি, এবং উপকূলীয় তটভূমি—এইসব স্থানই হতে পারে কৃষি পর্যটনের কেন্দ্রবিন্দু। যখন এই স্থানগুলো পর্যটনের গন্তব্যে পরিণত হবে, তখন কৃষকরা কেবল উৎপাদক হিসেবেই নয়, বরং উদ্যোক্তা এবং সেবাদাতা হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন।

এই মডেলের কেন্দ্রে থাকতে পারে সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক এবং কুটিরশিল্প উদ্যোক্তারা এককভাবে বাজারে টিকে থাকতে হিমশিম খান। কিন্তু সমবায়ের মাধ্যমে কৃষি পর্যটন কেন্দ্র, হোমস্টে (কৃষকের বাড়িতে পর্যটকদের থাকার ও খাওয়ার ব্যবস্থা), নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং পর্যটন সেবা পরিচালনা করলে ঝুঁকি কমে আসে এবং লাভের ন্যায্য অংশীদারত্ব নিশ্চিত হয়। ইউরোপের ইতালি এবং জাপানের গ্রামীণ কৃষি সমবায়গুলো এই মডেলের সফল উদাহরণ, যেখানে কৃষকরা সমবায়ভিত্তিক পর্যটন ও খাদ্য বিপণনের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছেন।

কৃষি পর্যটনকেন্দ্রগুলো রপ্তানিমুখী কৃষিপণ্য ও খাদ্যপণ্যের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। কৃষি পর্যটনের মাধ্যমে যে নিরাপদ, ট্রেসেবল ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তা আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যের পণ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পায়। জৈব খাদ্য, ঐতিহ্যবাহী চাল, মধু, দুগ্ধজাত পণ্য, দেশি ফল, উচ্চমূল্যের সবজি, শুকনো মাছ বা প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য—এইসবই পর্যটনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ‘বাংলাদেশ ব্র্যান্ড’ হিসেবে রপ্তানির সুযোগ তৈরি করতে পারে। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম কৃষি পর্যটনের মাধ্যমে স্থানীয় পণ্যকে বৈশ্বিক বাজারে পরিচিত করেছে, যা বাংলাদেশও অনুসরণ করতে পারে।

এই মডেলকে টেকসই করতে হলে সার্কুলার ইকোনমি (বৃত্তাকার অর্থনীতি) ও গ্রিন ইকোনমি (সবুজ অর্থনীতি) নীতির বাস্তব প্রয়োগ প্রয়োজন। কৃষি পর্যটন এলাকায় বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করা যায়। খামারের গোবর থেকে বায়োগ্যাস ও জৈব সার, কৃষি অবশিষ্টাংশ থেকে কম্পোস্ট ও পশুখাদ্য, এবং পর্যটন স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে একটি পরিবেশবান্ধব উৎপাদনচক্র গড়ে তোলা সম্ভব। নেদারল্যান্ডসের গ্রিন ফার্মিং এবং ডেনমার্কের সার্কুলার অ্যাগ্রিকালচার মডেল দেখিয়েছে, কীভাবে কৃষি ও পর্যটন একসঙ্গে পরিবেশের ওপর চাপ কমাতে পারে।

বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে কৃষি পর্যটন গ্রামীণ জনপদভিত্তিক স্টার্টআপ উন্নয়নের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে। শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তারা কৃষিপ্রযুক্তি, ডিজিটাল বুকিং ও সরবরাহ, স্মার্ট ফার্মিং, স্থানীয় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ইকো-ট্যুর গাইডিং, হস্তশিল্প ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ নিয়ে নতুন ব্যবসা গড়ে তুলতে পারেন। এর ফলে গ্রাম থেকেই নতুন উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ভারতের কেরালা ও কর্ণাটকের গ্রামীণ অ্যাগ্রো-স্টার্টআপগুলো দেখিয়েছে, কীভাবে পর্যটন ও কৃষিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় যুবসমাজকে গ্রামেই সফল উদ্যোক্তা হিসেবে ধরে রাখা যায়।

কৃষি পর্যটন জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের একটি কার্যকর কৌশলও বটে। বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। খরা, বন্যা, লবণাক্ততা ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব মোকাবিলায় বৈচিত্র্যময় আয়ের উৎস জরুরি। কৃষি পর্যটন কৃষকের আয়ের ঝুঁকি কমায়, কারণ এতে কেবল ফসলের ওপর নির্ভরতা থাকে না। হাওর, চর ও উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, মৎস্য ও পর্যটন একত্রে পরিচালিত হলে অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ে। ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের উপকূলীয় কৃষি পর্যটন প্রকল্পগুলো জলবায়ু-সহনশীল জীবিকার সফল উদাহরণ।

এছাড়াও, কৃষি পর্যটন শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির একটি শক্তিশালী মাধ্যম। নগরবাসী ও শিক্ষার্থীরা, বিশেষত স্কুলগামী শিশুরা, যখন সরাসরি খামার দেখে এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতি শেখে, তখন জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার বার্তা তাদের মনোজগতে গেঁথে যায়। কৃষি পর্যটন মডেল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দায়িত্বশীল ভোক্তা ও নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করে।

এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, অর্থের জোগান এবং উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি। কৃষি, পর্যটন, সমবায়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, পরিকল্পনা, অর্থ, স্থানীয় সরকার, পরিবেশ ও যুব উন্নয়ন—এই খাতগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি। সহজ ঋণ, সমবায়বান্ধব নীতি, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কৃষি পর্যটন কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাবে না।

বর্তমান বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা বলছে, কৃষি পর্যটন বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি নতুন পর্যটন ধারণা নয়; এটি হতে পারে সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যম, রপ্তানি সম্প্রসারণকে বহুমাত্রিক করার হাতিয়ার, সার্কুলার ও গ্রিন ইকোনমি বাস্তবায়নের পথ এবং জলবায়ু অভিযোজনের সমন্বিত উন্নয়ন কৌশল। গ্রাম শক্তিশালী হলে দেশও শক্তিশালী হবে। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষি পর্যটন আগামীর বাংলাদেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই ও আত্মনির্ভর উন্নয়ন মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শিল্প-সাহিত্যচর্চা রাজনীতির ঊর্ধ্বে: প্রধানমন্ত্রী

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

আপডেট সময় : ০৯:৩৬:৫২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

## কৃষি পর্যটন: দেশের টেকসই উন্নয়নে নতুন আশা

ঢাকা: কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশ আজ এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই পরিস্থিতিতে, কৃষি পর্যটন (Agro-Tourism) দেশের জন্য এক সমন্বিত উন্নয়ন মডেল হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। এটি কেবল বিনোদন নয়, বরং উৎপাদন, ভোগ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক মেলবন্ধন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এবং জাতীয় উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

কৃষি পর্যটন একটি ব্যাপক ধারণা, যা বিভিন্ন ধরনের কৃষিজ উৎপাদন এবং গ্রামীণ পরিবেশকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করে। খামার, মৎস্যঘের, ডেইরি, পোলট্রি, চা-বাগান, হাওর, বিল, সুন্দরবন সংলগ্ন নদী এলাকা, পাহাড়ি অঞ্চল, বরেন্দ্র ভূমি, এবং উপকূলীয় তটভূমি—এইসব স্থানই হতে পারে কৃষি পর্যটনের কেন্দ্রবিন্দু। যখন এই স্থানগুলো পর্যটনের গন্তব্যে পরিণত হবে, তখন কৃষকরা কেবল উৎপাদক হিসেবেই নয়, বরং উদ্যোক্তা এবং সেবাদাতা হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন।

এই মডেলের কেন্দ্রে থাকতে পারে সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক এবং কুটিরশিল্প উদ্যোক্তারা এককভাবে বাজারে টিকে থাকতে হিমশিম খান। কিন্তু সমবায়ের মাধ্যমে কৃষি পর্যটন কেন্দ্র, হোমস্টে (কৃষকের বাড়িতে পর্যটকদের থাকার ও খাওয়ার ব্যবস্থা), নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং পর্যটন সেবা পরিচালনা করলে ঝুঁকি কমে আসে এবং লাভের ন্যায্য অংশীদারত্ব নিশ্চিত হয়। ইউরোপের ইতালি এবং জাপানের গ্রামীণ কৃষি সমবায়গুলো এই মডেলের সফল উদাহরণ, যেখানে কৃষকরা সমবায়ভিত্তিক পর্যটন ও খাদ্য বিপণনের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছেন।

কৃষি পর্যটনকেন্দ্রগুলো রপ্তানিমুখী কৃষিপণ্য ও খাদ্যপণ্যের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। কৃষি পর্যটনের মাধ্যমে যে নিরাপদ, ট্রেসেবল ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তা আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যের পণ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পায়। জৈব খাদ্য, ঐতিহ্যবাহী চাল, মধু, দুগ্ধজাত পণ্য, দেশি ফল, উচ্চমূল্যের সবজি, শুকনো মাছ বা প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য—এইসবই পর্যটনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ‘বাংলাদেশ ব্র্যান্ড’ হিসেবে রপ্তানির সুযোগ তৈরি করতে পারে। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম কৃষি পর্যটনের মাধ্যমে স্থানীয় পণ্যকে বৈশ্বিক বাজারে পরিচিত করেছে, যা বাংলাদেশও অনুসরণ করতে পারে।

এই মডেলকে টেকসই করতে হলে সার্কুলার ইকোনমি (বৃত্তাকার অর্থনীতি) ও গ্রিন ইকোনমি (সবুজ অর্থনীতি) নীতির বাস্তব প্রয়োগ প্রয়োজন। কৃষি পর্যটন এলাকায় বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করা যায়। খামারের গোবর থেকে বায়োগ্যাস ও জৈব সার, কৃষি অবশিষ্টাংশ থেকে কম্পোস্ট ও পশুখাদ্য, এবং পর্যটন স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে একটি পরিবেশবান্ধব উৎপাদনচক্র গড়ে তোলা সম্ভব। নেদারল্যান্ডসের গ্রিন ফার্মিং এবং ডেনমার্কের সার্কুলার অ্যাগ্রিকালচার মডেল দেখিয়েছে, কীভাবে কৃষি ও পর্যটন একসঙ্গে পরিবেশের ওপর চাপ কমাতে পারে।

বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে কৃষি পর্যটন গ্রামীণ জনপদভিত্তিক স্টার্টআপ উন্নয়নের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে। শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তারা কৃষিপ্রযুক্তি, ডিজিটাল বুকিং ও সরবরাহ, স্মার্ট ফার্মিং, স্থানীয় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ইকো-ট্যুর গাইডিং, হস্তশিল্প ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ নিয়ে নতুন ব্যবসা গড়ে তুলতে পারেন। এর ফলে গ্রাম থেকেই নতুন উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ভারতের কেরালা ও কর্ণাটকের গ্রামীণ অ্যাগ্রো-স্টার্টআপগুলো দেখিয়েছে, কীভাবে পর্যটন ও কৃষিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় যুবসমাজকে গ্রামেই সফল উদ্যোক্তা হিসেবে ধরে রাখা যায়।

কৃষি পর্যটন জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের একটি কার্যকর কৌশলও বটে। বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। খরা, বন্যা, লবণাক্ততা ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব মোকাবিলায় বৈচিত্র্যময় আয়ের উৎস জরুরি। কৃষি পর্যটন কৃষকের আয়ের ঝুঁকি কমায়, কারণ এতে কেবল ফসলের ওপর নির্ভরতা থাকে না। হাওর, চর ও উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, মৎস্য ও পর্যটন একত্রে পরিচালিত হলে অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ে। ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের উপকূলীয় কৃষি পর্যটন প্রকল্পগুলো জলবায়ু-সহনশীল জীবিকার সফল উদাহরণ।

এছাড়াও, কৃষি পর্যটন শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির একটি শক্তিশালী মাধ্যম। নগরবাসী ও শিক্ষার্থীরা, বিশেষত স্কুলগামী শিশুরা, যখন সরাসরি খামার দেখে এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতি শেখে, তখন জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার বার্তা তাদের মনোজগতে গেঁথে যায়। কৃষি পর্যটন মডেল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দায়িত্বশীল ভোক্তা ও নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করে।

এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, অর্থের জোগান এবং উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি। কৃষি, পর্যটন, সমবায়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, পরিকল্পনা, অর্থ, স্থানীয় সরকার, পরিবেশ ও যুব উন্নয়ন—এই খাতগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি। সহজ ঋণ, সমবায়বান্ধব নীতি, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কৃষি পর্যটন কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাবে না।

বর্তমান বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা বলছে, কৃষি পর্যটন বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি নতুন পর্যটন ধারণা নয়; এটি হতে পারে সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যম, রপ্তানি সম্প্রসারণকে বহুমাত্রিক করার হাতিয়ার, সার্কুলার ও গ্রিন ইকোনমি বাস্তবায়নের পথ এবং জলবায়ু অভিযোজনের সমন্বিত উন্নয়ন কৌশল। গ্রাম শক্তিশালী হলে দেশও শক্তিশালী হবে। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষি পর্যটন আগামীর বাংলাদেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই ও আত্মনির্ভর উন্নয়ন মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।