ঢাকা ০১:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আঞ্চলিক ভূরাজনীতির ঘূর্ণিপাকে সুপ্ত সার্ক: পুনরুজ্জীবনে বাংলাদেশের কৌশলগত নেতৃত্ব

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:০৮:৩৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ০ বার পড়া হয়েছে

দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্কের নাম হয়তো অনেকের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ বাংলাদেশই ছিল এই আঞ্চলিক জোটের মূল উদ্যোক্তা, যার স্বপ্ন দেখেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সংহতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন জোরদার করা। প্রায় ১৯০ কোটি মানুষের এই বৃহৎ অঞ্চলের জন্য অপার সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও, বিশেষত ভারত-পাকিস্তান রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সার্ক কার্যত অচল হয়ে আছে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায়, যখন বাংলাদেশ ভারত, পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিগুলোর বলয়ের মধ্যে এক জটিল কূটনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে, তখন সার্কের পুনরুজ্জীবন কেবল একটি কূটনৈতিক আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং এক কৌশলগত অপরিহার্যতা।

আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা—এই আটটি দেশ নিয়ে গঠিত সার্ক বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ ধারণ করে। এই অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এর জন্ম হলেও, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবিশ্বাস, বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান টানাপোড়েন এর কার্যক্রমকে স্থবির করে রেখেছে। এর ফলে আঞ্চলিক সহযোগিতার বিশাল একটি সুযোগ অব্যবহৃত থেকে গেছে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: আঞ্চলিক কূটনীতির এক বড় পরীক্ষা
সার্ক পুনরুজ্জীবনের পথে সাম্প্রতিক সময়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নজিরবিহীন অবনতি। ‘জুলাই ২০২৪’-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ায় এই সম্পর্ক গভীর সংকটে পড়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গণহত্যার মামলায় বিচারের মুখোমুখি করার জন্য তাকে ফেরত পাঠানোর আনুষ্ঠানিক অনুরোধে ভারত কোনো সাড়া না দেওয়ায় দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন চরমে পৌঁছেছে। এর ফলস্বরূপ দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং মানুষে-মানুষে সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী, কৌশলগত অংশীদার এবং প্রধান বাণিজ্যিক সহযোগী। একসময় দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্য ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ভিসা স্থগিত, যৌথ প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়া এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ কমে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক সংযোগ উদ্যোগগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের জন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা একদিকে যেমন কূটনৈতিক অপরিহার্যতা, অন্যদিকে তেমনি অর্থনৈতিক প্রয়োজন। বিশেষ করে জ্বালানি সংযোগ, সীমান্ত অবকাঠামো ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কৌশলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।

এই সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন নীরব কূটনীতি, সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে আইনগত ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা এবং রাজনৈতিক বিরোধকে অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতা থেকে আলাদা রাখা। একটি বাস্তববাদী পন্থা হতে পারে, আইনি প্রক্রিয়া চলমান রেখে বাণিজ্য, ট্রানজিট ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা কাঠামো, যেমন সার্ক, বিমসটেক ও বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল উদ্যোগ) আবার সক্রিয় করা। আঞ্চলিক দৃষ্টিকোণ থেকে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কই দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতার মূল ভিত্তি। ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক না হলে সার্কের পুনরুজ্জীবন কাঠামোগতভাবে সীমাবদ্ধই থাকবে। বিপরীতে কূটনৈতিক অগ্রগতি পুরো অঞ্চলে সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

সার্কের অর্থনৈতিক চিত্র: এক সুপ্ত দৈত্য
সার্কভুক্ত দেশগুলোর সম্মিলিত জিডিপি (নামমাত্র) ৪ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি এবং ক্রয়ক্ষমতা সমতা (পিপিপি) হিসেবে ১৬ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যার প্রায় ৭৫ শতাংশই ভারতের অবদান। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা এর পরের অবস্থানে। গত দুই দশকে গড় ছয়-সাত শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। যদিও পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা ঋণসংকট ও বৈদেশিক লেনদেনের চাপের মুখে পড়েছে, শ্রীলঙ্কা সম্প্রতি উল্লেখযোগ্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। নেপাল ও ভুটান মূলত প্রবাসী আয় ও জলবিদ্যুৎ রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল, আর মালদ্বীপের অর্থনীতি পর্যটননির্ভর। আফগানিস্তান নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও খনিজ ও ট্রানজিট সম্ভাবনা বহন করে।

তবে, এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সার্কভুক্ত দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য মোট বাণিজ্যের ছয় শতাংশেরও কম, যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নে এটি ৬৫ শতাংশ এবং আসিয়ানে ৩৫ শতাংশ। এই বিশাল বৈষম্যই আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতির অব্যবহৃত সম্ভাবনাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

ভূরাজনীতি ও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান
বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের ভূকৌশলগত অবস্থান দেশটিকে ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলো দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব বিস্তারে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায়, একটি পুনরুজ্জীবিত সার্ক দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা প্রশমনে এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে সম্মিলিত দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে একটি কার্যকর বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসও আঞ্চলিক সহযোগিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য সার্ক পুনরুজ্জীবনের গুরুত্বের কথা তুলে ধরেছেন।

রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নতুন সরকারের অঙ্গীকার
দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরে আসা নতুন সরকার, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এটি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আঞ্চলিক সংহতির দূরদর্শী ভাবনার প্রতিধ্বনি। এজন্য প্রয়োজন ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সক্রিয় কূটনীতি, আস্থা তৈরির পদক্ষেপ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাকে রাজনীতিমুক্ত রাখা। প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোগী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই নেতৃত্ব দেওয়ার অনন্য অবস্থানে রয়েছে।

সার্ক সহযোগিতার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
১. বাণিজ্য ও বিনিয়োগ: কার্যকর দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য এলাকা (সাফটা) চালু হলে আঞ্চলিক বাণিজ্য তিন থেকে পাঁচগুণ বাড়তে পারে। টেক্সটাইল, ওষুধ, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আইসিটি খাতে আঞ্চলিক ভ্যালু চেইন গড়ে উঠতে পারে।
২. জ্বালানি সহযোগিতা: ভুটান ও নেপালের জলবিদ্যুৎ, বাংলাদেশ ও ভারতের গ্যাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি একীভূত করে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ গ্রিড গড়ে তোলা সম্ভব।
৩. সংযোগ ও অবকাঠামো: আঞ্চলিক পরিবহন করিডোর ও বন্দর সংযোগ বাণিজ্য ব্যয় কমাবে। চট্টগ্রাম, মংলা ও পায়রা বন্দর নেপাল, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য গেটওয়ে হতে পারে।
৪. মানবসম্পদ ও শ্রম চলাচল: যুব শ্রমশক্তির দক্ষতা স্বীকৃতি ও মানসম্মত শ্রম নীতিমালা বৈধ শ্রম চলাচল সহজ করবে।

সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংহতি
ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতিতে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে গভীর মিল রয়েছে। সাহিত্য, সিনেমা, সংগীত ও খাদ্য সংস্কৃতির মাধ্যমে সাংস্কৃতিক কূটনীতি আস্থা বাড়াতে পারে। সার্ক সাংস্কৃতিক উৎসব, শিক্ষাবিনিময় ও যুব কর্মসূচি মানুষে মানুষে সম্পর্ক জোরদার করতে পারে।

গণমাধ্যম ও আঞ্চলিক ফোরামের ভূমিকা
আঞ্চলিক বয়ান গঠনে গণমাধ্যম, বিশেষ করে সার্ক সাংবাদিক ফোরাম, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যৌথ প্রতিবেদন, মিডিয়া বিনিময় ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ভুল ধারণা দূর করতে সহায়ক হবে।

চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
সার্ক পুনরুজ্জীবনের প্রধান বাধা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক অবিশ্বাস। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, জনস্বাস্থ্য ও ডিজিটাল রূপান্তর—এই বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো রাজনৈতিক সীমা ছাড়িয়ে সহযোগিতার যৌক্তিকতা তৈরি করে। বাংলাদেশ ‘রাজনীতিমুক্ত সার্ক’ ধারণা তুলে ধরে বাণিজ্য, জলবায়ু সহনশীলতা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে পারে।

উপসংহার
সার্ক মৃত নয়, এটি কেবল সুপ্ত। ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এক অনস্বীকার্য প্রয়োজন। সার্কের স্থপতি হিসেবে বাংলাদেশ এই পুনরুজ্জীবনে নেতৃত্ব দেওয়ার নৈতিক ও কৌশলগত অধিকার রাখে। নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার, আঞ্চলিক নেতাদের সমর্থন এবং গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণে সার্ক আবারও সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে। এটি শুধু জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী উত্তরাধিকারকে সম্মান জানাবে না, বরং প্রায় দুই বিলিয়ন দক্ষিণ এশীয় মানুষের জন্য একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শিল্প-সাহিত্যচর্চা রাজনীতির ঊর্ধ্বে: প্রধানমন্ত্রী

আঞ্চলিক ভূরাজনীতির ঘূর্ণিপাকে সুপ্ত সার্ক: পুনরুজ্জীবনে বাংলাদেশের কৌশলগত নেতৃত্ব

আপডেট সময় : ০৯:০৮:৩৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্কের নাম হয়তো অনেকের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ বাংলাদেশই ছিল এই আঞ্চলিক জোটের মূল উদ্যোক্তা, যার স্বপ্ন দেখেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সংহতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন জোরদার করা। প্রায় ১৯০ কোটি মানুষের এই বৃহৎ অঞ্চলের জন্য অপার সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও, বিশেষত ভারত-পাকিস্তান রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সার্ক কার্যত অচল হয়ে আছে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায়, যখন বাংলাদেশ ভারত, পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিগুলোর বলয়ের মধ্যে এক জটিল কূটনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে, তখন সার্কের পুনরুজ্জীবন কেবল একটি কূটনৈতিক আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং এক কৌশলগত অপরিহার্যতা।

আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা—এই আটটি দেশ নিয়ে গঠিত সার্ক বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ ধারণ করে। এই অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এর জন্ম হলেও, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবিশ্বাস, বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান টানাপোড়েন এর কার্যক্রমকে স্থবির করে রেখেছে। এর ফলে আঞ্চলিক সহযোগিতার বিশাল একটি সুযোগ অব্যবহৃত থেকে গেছে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: আঞ্চলিক কূটনীতির এক বড় পরীক্ষা
সার্ক পুনরুজ্জীবনের পথে সাম্প্রতিক সময়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নজিরবিহীন অবনতি। ‘জুলাই ২০২৪’-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ায় এই সম্পর্ক গভীর সংকটে পড়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গণহত্যার মামলায় বিচারের মুখোমুখি করার জন্য তাকে ফেরত পাঠানোর আনুষ্ঠানিক অনুরোধে ভারত কোনো সাড়া না দেওয়ায় দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন চরমে পৌঁছেছে। এর ফলস্বরূপ দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং মানুষে-মানুষে সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী, কৌশলগত অংশীদার এবং প্রধান বাণিজ্যিক সহযোগী। একসময় দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্য ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ভিসা স্থগিত, যৌথ প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়া এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ কমে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক সংযোগ উদ্যোগগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের জন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা একদিকে যেমন কূটনৈতিক অপরিহার্যতা, অন্যদিকে তেমনি অর্থনৈতিক প্রয়োজন। বিশেষ করে জ্বালানি সংযোগ, সীমান্ত অবকাঠামো ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কৌশলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।

এই সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন নীরব কূটনীতি, সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে আইনগত ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা এবং রাজনৈতিক বিরোধকে অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতা থেকে আলাদা রাখা। একটি বাস্তববাদী পন্থা হতে পারে, আইনি প্রক্রিয়া চলমান রেখে বাণিজ্য, ট্রানজিট ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা কাঠামো, যেমন সার্ক, বিমসটেক ও বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল উদ্যোগ) আবার সক্রিয় করা। আঞ্চলিক দৃষ্টিকোণ থেকে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কই দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতার মূল ভিত্তি। ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক না হলে সার্কের পুনরুজ্জীবন কাঠামোগতভাবে সীমাবদ্ধই থাকবে। বিপরীতে কূটনৈতিক অগ্রগতি পুরো অঞ্চলে সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

সার্কের অর্থনৈতিক চিত্র: এক সুপ্ত দৈত্য
সার্কভুক্ত দেশগুলোর সম্মিলিত জিডিপি (নামমাত্র) ৪ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি এবং ক্রয়ক্ষমতা সমতা (পিপিপি) হিসেবে ১৬ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যার প্রায় ৭৫ শতাংশই ভারতের অবদান। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা এর পরের অবস্থানে। গত দুই দশকে গড় ছয়-সাত শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। যদিও পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা ঋণসংকট ও বৈদেশিক লেনদেনের চাপের মুখে পড়েছে, শ্রীলঙ্কা সম্প্রতি উল্লেখযোগ্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। নেপাল ও ভুটান মূলত প্রবাসী আয় ও জলবিদ্যুৎ রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল, আর মালদ্বীপের অর্থনীতি পর্যটননির্ভর। আফগানিস্তান নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও খনিজ ও ট্রানজিট সম্ভাবনা বহন করে।

তবে, এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সার্কভুক্ত দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য মোট বাণিজ্যের ছয় শতাংশেরও কম, যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নে এটি ৬৫ শতাংশ এবং আসিয়ানে ৩৫ শতাংশ। এই বিশাল বৈষম্যই আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতির অব্যবহৃত সম্ভাবনাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

ভূরাজনীতি ও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান
বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের ভূকৌশলগত অবস্থান দেশটিকে ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলো দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব বিস্তারে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায়, একটি পুনরুজ্জীবিত সার্ক দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা প্রশমনে এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে সম্মিলিত দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে একটি কার্যকর বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসও আঞ্চলিক সহযোগিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য সার্ক পুনরুজ্জীবনের গুরুত্বের কথা তুলে ধরেছেন।

রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নতুন সরকারের অঙ্গীকার
দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরে আসা নতুন সরকার, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এটি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আঞ্চলিক সংহতির দূরদর্শী ভাবনার প্রতিধ্বনি। এজন্য প্রয়োজন ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সক্রিয় কূটনীতি, আস্থা তৈরির পদক্ষেপ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাকে রাজনীতিমুক্ত রাখা। প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোগী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই নেতৃত্ব দেওয়ার অনন্য অবস্থানে রয়েছে।

সার্ক সহযোগিতার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
১. বাণিজ্য ও বিনিয়োগ: কার্যকর দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য এলাকা (সাফটা) চালু হলে আঞ্চলিক বাণিজ্য তিন থেকে পাঁচগুণ বাড়তে পারে। টেক্সটাইল, ওষুধ, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আইসিটি খাতে আঞ্চলিক ভ্যালু চেইন গড়ে উঠতে পারে।
২. জ্বালানি সহযোগিতা: ভুটান ও নেপালের জলবিদ্যুৎ, বাংলাদেশ ও ভারতের গ্যাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি একীভূত করে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ গ্রিড গড়ে তোলা সম্ভব।
৩. সংযোগ ও অবকাঠামো: আঞ্চলিক পরিবহন করিডোর ও বন্দর সংযোগ বাণিজ্য ব্যয় কমাবে। চট্টগ্রাম, মংলা ও পায়রা বন্দর নেপাল, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য গেটওয়ে হতে পারে।
৪. মানবসম্পদ ও শ্রম চলাচল: যুব শ্রমশক্তির দক্ষতা স্বীকৃতি ও মানসম্মত শ্রম নীতিমালা বৈধ শ্রম চলাচল সহজ করবে।

সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংহতি
ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতিতে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে গভীর মিল রয়েছে। সাহিত্য, সিনেমা, সংগীত ও খাদ্য সংস্কৃতির মাধ্যমে সাংস্কৃতিক কূটনীতি আস্থা বাড়াতে পারে। সার্ক সাংস্কৃতিক উৎসব, শিক্ষাবিনিময় ও যুব কর্মসূচি মানুষে মানুষে সম্পর্ক জোরদার করতে পারে।

গণমাধ্যম ও আঞ্চলিক ফোরামের ভূমিকা
আঞ্চলিক বয়ান গঠনে গণমাধ্যম, বিশেষ করে সার্ক সাংবাদিক ফোরাম, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যৌথ প্রতিবেদন, মিডিয়া বিনিময় ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ভুল ধারণা দূর করতে সহায়ক হবে।

চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
সার্ক পুনরুজ্জীবনের প্রধান বাধা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক অবিশ্বাস। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, জনস্বাস্থ্য ও ডিজিটাল রূপান্তর—এই বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো রাজনৈতিক সীমা ছাড়িয়ে সহযোগিতার যৌক্তিকতা তৈরি করে। বাংলাদেশ ‘রাজনীতিমুক্ত সার্ক’ ধারণা তুলে ধরে বাণিজ্য, জলবায়ু সহনশীলতা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে পারে।

উপসংহার
সার্ক মৃত নয়, এটি কেবল সুপ্ত। ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এক অনস্বীকার্য প্রয়োজন। সার্কের স্থপতি হিসেবে বাংলাদেশ এই পুনরুজ্জীবনে নেতৃত্ব দেওয়ার নৈতিক ও কৌশলগত অধিকার রাখে। নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার, আঞ্চলিক নেতাদের সমর্থন এবং গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণে সার্ক আবারও সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে। এটি শুধু জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী উত্তরাধিকারকে সম্মান জানাবে না, বরং প্রায় দুই বিলিয়ন দক্ষিণ এশীয় মানুষের জন্য একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবে।