## শিরোনাম: বিশ্বজুড়ে বিপন্ন ভাষা: একুশের চেতনায় বৈশ্বিক লড়াই
লিড প্যারাগ্রাফ:
ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সেই অবিস্মরণীয় গান, “ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়।” ১৯৫২ সালে ঢাকার রাজপথে যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম হয়েছিল, তার মূল মন্ত্র ছিল ঔপনিবেশিক শক্তির আগ্রাসন। কিন্তু একুশ শতকের এই সময়ে, যেখানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে, সেই একই পঙ্ক্তি এক নতুন, আরও ব্যাপক অর্থ ধারণ করেছে। এটি এখন কেবল একটি নির্দিষ্ট জাতির নয়, বরং বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার বিপন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত আকুতি। আধুনিক সভ্যতার চাকচিক্যের আড়ালে, আমাজন থেকে আর্কটিক এবং অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী অঞ্চলগুলোতে প্রতিনিয়ত নীরবে ঘটে চলেছে এক একটি ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’।
বিস্তারিত বর্ণনা:
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় সাত হাজার ভাষার মধ্যে ৪০ শতাংশই আজ বিলুপ্তির পথে। প্রতি দুই সপ্তাহে পৃথিবী থেকে একটি ভাষা চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। এই হারানো কেবল কিছু ধ্বনি বা বর্ণের বিলুপ্তি নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি, প্রথাগত পরিবেশগত জ্ঞান এবং একটি জাতির শেকড়ের বিনাশ। একটি ভাষা যখন মারা যায়, তখন তার সাথে হারিয়ে যায় হাজার বছরের ঔষধি গাছের নাম, বৃষ্টির পূর্বাভাস জানার কৌশল এবং পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শোনা অমূল্য সৃষ্টিতত্ত্ব।
ঐতিহাসিকভাবে, ভাষা কেড়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত পদ্ধতিগত এবং নিষ্ঠুর। উত্তর আমেরিকার ‘ইন্ডিয়ান বোর্ডিং স্কুল’ এবং কানাডার ‘রেসিডেন্সিয়াল স্কুল’-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুদের মাতৃভাষা কেড়ে নিয়ে আধিপত্যশীল সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য ছিল। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের ২০৫টি ভাষার প্রায় সবকটিই ঔপনিবেশিক নীতির কারণে আজ বিলুপ্তপ্রায়। শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় নীতিই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনও ভাষার জন্য এক ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর্কটিকের বরফ গলে যাওয়ায় ইনুইট সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার পরিবর্তন তাদের ভাষার শব্দভাণ্ডারকেও দ্রুত বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একইভাবে, আফ্রিকার মাসাই সম্প্রদায়ের ‘মা’ (Maa) ভাষা নগরায়ণের চাপে পিষ্ট হচ্ছে।
এশিয়ায়, আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেই প্রায় ২০০টি ভাষা বিপন্ন তালিকায় রয়েছে। ওড়িশার ‘গাদাবা’ বা আন্দামানি ভাষাগুলো প্রায় বিলুপ্তির পথে। জাপানের হোক্কাইদো অঞ্চলের ‘আইনু’ (Ainu) ভাষা একসময় নিষিদ্ধ ছিল এবং বর্তমানে কেবল হাতেগোনা কয়েকজন বৃদ্ধের স্মৃতিতে টিকে আছে। ইউরোপের আয়ারল্যান্ডে ‘আইরিশ গ্যালিক’ ভাষা ইংরেজির দাপটে কোণঠাসা। লাতিন আমেরিকায় কেচুয়া (Quechua) বা আইমারা (Aymara) ভাষাগুলো স্প্যানিশ ও পর্তুগিজের আধিপত্যে সংকুচিত হচ্ছে।
এই ভাষিক বিপর্যয়ের মূল কারণ হলো ‘ফোর্সড অ্যাসিমিলেশন’ বা জোরপূর্বক একীভূতকরণ নীতি। রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থায় প্রভাবশালী ভাষা চাপিয়ে দেওয়া, আদিবাসীদের ভূমি দখল এবং বিশ্বজুড়ে ইংরেজি, ম্যান্ডারিন বা স্প্যানিশের মতো বিশ্ব ভাষার একচেটিয়া প্রভাব শিশুদের তাদের মাতৃভাষা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। আন্দামানের ‘বো’ (Bo) বা জাপানের ‘আইনু’ (Ainu) ভাষার মতো ভাষাগুলো আজ কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ। এমনকি আয়ারল্যান্ডের মতো উন্নত দেশেও ‘আইরিশ গ্যালিক’ ইংরেজির সাথে টিকে থাকার লড়াই করছে। লাতিন আমেরিকায় স্প্যানিশের দাপটে কেচুয়া ভাষাভাষীরা নিজেদের ভাষা বলতে এখন লজ্জিত বোধ করে। এই ‘ভাষিক লজ্জা’ বা ‘Linguistic Shame’ তৈরির মাধ্যমে আধুনিক বিশ্বায়ন আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নিচ্ছে। বিশ্বজুড়ে ইংরেজি, ম্যান্ডারিন বা হিন্দির মতো কয়েকটি ভাষা এখন পৃথিবীকে শাসন করছে, আর হারিয়ে যাচ্ছে বৈচিত্র্যের অপার সৌন্দর্য।
তবে আশার আলোও একেবারে নিভে যায়নি। নিউজিল্যান্ডে মাওরি (Maori) ভাষার পুনরুজ্জীবন এবং মরক্কোতে তামাজাইট (Tamazight) ভাষাকে দাপ্তরিক স্বীকৃতি দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ওয়েলশ (Welsh) ভাষার প্রযুক্তি ও শিক্ষার মাধ্যমে ফিরে আসার ঘটনা বিশ্বকে শিক্ষা দিতে পারে। জাতিসংঘ ঘোষিত ‘আদিবাসী ভাষা দশক (২০২২-২০৩২)’ একটি সুযোগ তৈরি করেছে, কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কেবল দিবস পালন করে ভাষাকে বাঁচানো সম্ভব নয়।
এই একুশের মাসে আমাদের প্রশ্ন করা উচিত, আমরা কি কেবল নিজেদের ভাষা রক্ষা করেই আমাদের দায়িত্ব শেষ করব? “ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়” – এই ‘ওরা’ কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা গোষ্ঠী নয়, বরং এটি একটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা যা সংখ্যাগরিষ্ঠের দাপটে সংখ্যালঘুর অস্তিত্বকে গ্রাস করে। যদি আমরা আজ বৈশ্বিক এই ভাষিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হই, তবে একদিন পৃথিবী হয়তো মাত্র কয়েকটি ভাষায় কথা বলবে। সেদিন মানবজাতির চিন্তার বৈচিত্র্য এবং জ্ঞানের ভান্ডার চরমভাবে সংকুচিত হয়ে পড়বে।
ভাষা কেড়ে নেওয়া মানে একটি মানুষের আত্মাকে পঙ্গু করে দেওয়া। একুশের এই মাসে আমাদের অঙ্গীকার কেবল ফুল দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকুক। আমরা যেন বিশ্বের প্রতিটি কোনায় ‘মুখের ভাষা’ কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হই। কারণ বৈচিত্র্যহীন একভাষী পৃথিবী হবে একটি ধূসর মরুভূমির মতো। পৃথিবীর প্রতিটি ভাষা যেন তার নিজস্ব মহিমায় বেঁচে থাকতে পারে, কারণ ভাষা বেঁচে থাকলেই মানুষ তার আপন পরিচয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। ভাষা আমাদের অস্তিত্বের প্রমাণ। একটি ভাষাকে ধ্বংস করা মানে একটি জনগোষ্ঠীর আত্মাকে হত্যা করা। তাই একুশের এই লগ্নে আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক আমরা বিশ্বের প্রতিটি বিপন্ন ভাষার পাশে দাঁড়াব। কারণ যতদিন ভাষা বেঁচে থাকে, ততদিন মানুষের বৈচিত্র্যময় পরিচয় বেঁচে থাকে।
রিপোর্টারের নাম 

























