দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে অনুষ্ঠিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিগত দিনগুলোতে যে অনিশ্চয়তা ও নানা রকম ষড়যন্ত্রের গুঞ্জন শোনা গেছে, তা অবশেষে থেমেছে। প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও অনেক সংশয় প্রকাশ করা হয়েছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় এমনও গুঞ্জন শোনা গিয়েছিল যে, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না। নির্বাচনের মাত্র সপ্তাহখানেক আগেও অনেকের মনে ছিল দ্বিধা। তবে সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে নির্ধারিত সময়েই একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন উপহার দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূস এবং তার উপদেষ্টা পরিষদ। এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের জন্য প্রফেসর ইউনূস নিঃসন্দেহে দেশবাসীর অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতার দাবিদার।
প্রফেসর ইউনূস তার কার্যকালে জনগণের প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষায় অবিচল ছিলেন। নিন্দুকদের সমালোচনা সত্ত্বেও, শপথ গ্রহণের পর তিনি যা বলেছিলেন, তা বাস্তবায়নের আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, একজন প্রকৃত শাসক জনগণের দেওয়া ওয়াদা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকেন। যদিও তার এই পথচলা কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। তার মেয়াদকালে বিভিন্ন পেশার মানুষের আন্দোলন-বিক্ষোভ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এমনকি নিজ বাসভবনে ঘেরাওয়ের মতো নজিরবিহীন ঘটনারও সম্মুখীন হয়েছেন তিনি। এতকিছুর পরও তিনি অবিচল থেকেছেন এবং সফলভাবে তার লক্ষ্য অর্জন করেছেন। শাসকের এই ঐতিহাসিক ভূমিকা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এই নির্বাচনের ফলাফলের মধ্য দিয়ে জুলাই বিপ্লবের চেতনা কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, তা নিয়ে ভবিষ্যতে বিস্তর আলোচনার অবকাশ রয়েছে। তবে আপাতত এটুকু বলা যায় যে, এই নির্বাচনে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো বিজয় লাভ করেছে। বিএনপি এবং জামায়াত-এনসিপি জোট উভয়েরই বিজয়কে জুলাই বিপ্লবের চেতনার প্রতিফলন হিসেবে দেখা যেতে পারে। কারণ, উভয় পক্ষই পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস, দলের বহু নেতাকর্মীর গুম-খুন এবং হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা—এসব ছিল এক নির্মম বাস্তবতা। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি এবং আওয়ামী লীগ কর্মীদের হামলায় জামায়াত নেতাদের আত্মদান—এসবও কম ত্যাগের ঘটনা নয়।
শাপলা চত্বরে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সেই ভয়াবহতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। সেই রাতে অতিদরিদ্র পরিবার থেকে আসা মাদ্রাসার নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর যে নৃশংসতা চালানো হয়েছিল, তা ইতিহাসের অনেক কালো অধ্যায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করলে সেই রাতের বর্বরতার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। সেই হামলায় যেখানে প্রায় ৮৩ জন নিরীহ মাদ্রাসা ছাত্র নিহত এবং দুই হাজারেরও বেশি আহত হয়েছিল, সেখানে জালিয়ানওয়ালাবাগে নিহত হয়েছিল ৩৭৯ জন নিরস্ত্র মানুষ। জুলাই বিপ্লবের পর ১৫ বছরের যে নিষ্ঠুর শাসনের অবসান ঘটেছে, ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচন সেই প্রেক্ষাপটে জাতীয় জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। এই আলোকে আরও উজ্জ্বল করার গুরুদায়িত্ব এখন নবনির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর।
আল্লামা ইকবালের ভাষায়, ‘গোলাপের সৌন্দর্য তার সুগন্ধে’, তেমনি একজন শাসকের সৌন্দর্য ও গৌরব নিহিত থাকে সুশাসন ও জনকল্যাণমূলক উন্নয়নে। অপশাসন এবং সংকীর্ণ উন্নয়ন শাসকের জন্য ডেকে আনে চরম বিপর্যয়, যা আমরা পূর্ববর্তী শাসনকালে প্রত্যক্ষ করেছি। তাই নির্বাচনে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সরকার গঠন করেছে এবং যারা বিরোধী আসনে বসেছে, উভয়েরই দায়িত্ব হলো জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া।
কেবলমাত্র কথার ফুলঝুরি বা বাগাড়ম্বরপূর্ণ ভাষণ দিয়ে জনগণকে মোহিত করার দিন শেষ হয়ে গেছে। এই নির্বাচনে বিভিন্ন সমীকরণ কাজ করেছে, পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী ভোটারদের পক্ষ পরিবর্তনেরও নজির দেখা গেছে। বিশেষ করে জুলাই বিপ্লবের পর শিক্ষিত মধ্যবিত্তThes_in_society-তে যে নতুন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে, তা প্রথাগত কূপমণ্ডূকতা থেকে বেরিয়ে এসেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দুই প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অনুপস্থিতি। শেখ হাসিনা এই বিপ্লবের মুখে দেশ ছেড়েছেন, আর বেগম খালেদা জিয়া তাঁর জীবনাবসান করেছেন। আজ যদি বেগম খালেদা জিয়া তাঁর দলের এই বিজয় দেখে যেতে পারতেন, তবে হয়তো তিনি শান্তিতে শেষ বিদায় নিতে পারতেন। দেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে বেগম খালেদা জিয়ার অবদানকে বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব যদি সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারে, তবে তা ইতিবাচক রাজনীতির পথ সুগম করবে। তবে, যদি কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ভুল পথে চালিত হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, তবে তা ভবিষ্যতে এক সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে, যা জনগণ বহন করতে পারবে না। এই পরিস্থিতির দায়-দায়িত্ব কেবল ক্ষমতাসীন দল নয়, বিরোধী দলকেও নিতে হবে।
তবে, এই পথচলা মসৃণ নয়। বিগত ১৫ বছরের শাসনামলে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, মানুষের আত্মবিশ্বাস ও আস্থার জায়গা সংকুচিত হয়েছে। ঘৃণা ও বিদ্বেষের ভিত্তিতে সমাজে বিভক্তি তীব্রতর হয়েছে। এই অবস্থায় রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কাজটি অত্যন্ত কঠিন। তবে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মুদ্রার রিজার্ভ, আন্তর্জাতিক দায় পরিশোধ এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি নতুন সরকারকে কিছুটা সুবিধা দেবে। কিন্তু জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার মতো দুরূহ কাজটি বিএনপি সরকারকেই করতে হবে। একই সঙ্গে, এই ঐক্য প্রতিষ্ঠায় বিরোধী দলের ভূমিকাও কম নয়। তাই, সরকারি ও বিরোধী উভয় দলকেই সংলাপের মাধ্যমে সমস্যাগুলোর সমাধান করে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে—এটাই জনগণের প্রত্যাশা। এতে ব্যর্থ হলে, বিশ্ববাসী হয়তো আরেকটি প্রতিশোধমূলক সংঘাতের সাক্ষী হবে।
—
রিপোর্টারের নাম 

























