## গণতন্ত্রের নতুন দিগন্ত: ছায়া মন্ত্রিসভা হতে পারে কার্যকর হাতিয়ার
ঢাকা: বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ ধারণা। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার রাজনীতিতে আবর্তিত দেশের রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়শই গঠনমূলক সমালোচনার পরিবর্তে সংঘাত ও পারস্পরিক দোষারোপের এক দুষ্টচক্রে আবদ্ধ থেকেছে। এই প্রেক্ষাপটে, July বিপ্লবের পর গণতন্ত্রের যে নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে, তাকে সুসংহত করতে বিরোধী দলগুলোর শক্তিশালী ও ইতিবাচক ভূমিকা অপরিহার্য। আর এই ভূমিকাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ছায়া মন্ত্রিসভা হতে পারে একটি কার্যকর মাধ্যম।
রাজনৈতিক মেরুকরণে ছায়া মন্ত্রিসভার প্রয়োজনীয়তা:
গণতন্ত্রের সুষ্ঠু চর্চার জন্য সরকারি ও বিরোধী উভয় পক্ষের শক্তিশালী ভূমিকা অনস্বীকার্য। যেখানে সরকারি দলকে বিরোধী দলের কার্যক্রমের জন্য উন্মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হয়, সেখানে বিরোধী দলগুলোরও উচিত সরকারের নীতি ও কার্যক্রমের গঠনমূলক সমালোচনা করা। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার কেন্দ্রিকতা এবং ক্ষমতা ধরে রাখার নানা কারসাজির কারণে এই সুস্থ চর্চা ব্যাহত হয়েছে। ক্ষমতায় থাকা দলগুলো প্রায়শই বিরোধী দলের ওপর দমন-নিপীড়ন চালিয়েছে, আর বিরোধী দলগুলো নির্বাচন প্রত্যাখ্যান, সংসদ বর্জন এবং সহিংস আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছে। এই অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য নতুন রাজনৈতিক হাতিয়ারের প্রয়োজন, এবং ছায়া মন্ত্রিসভা সেই লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণা:
ছায়া মন্ত্রিসভা হলো সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি দল, যারা সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের সমান্তরালে দায়িত্ব পালন করে। তারা সরকারের নীতিমালা ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে, সমালোচনা করে এবং বিকল্প নীতি উপস্থাপন করে। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, আয়ারল্যান্ড, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে এই ধারণাটি বিভিন্ন নামে ও রূপে কার্যকর রয়েছে।
যুক্তরাজ্যে: প্রধান বিরোধী দল প্রধান বিরোধী দল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং জ্যেষ্ঠ এমপি ও লর্ডদের নিয়ে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করে।
অস্ট্রেলিয়া: ছায়া মন্ত্রণালয়ের সদস্যরা পার্টি দ্বারা নির্বাচিত বা প্রধান বিরোধীদলীয় নেতার পছন্দানুসারে বাছাই হতে পারেন। এক্ষেত্রে বিরোধী জোটভুক্ত একাধিক দল থেকেও সদস্য নেওয়া হতে পারে।
কানাডা: এখানে ‘সমালোচক’ (critic) পরিভাষাটি বেশি ব্যবহৃত হয় এবং কাঠামো তুলনামূলকভাবে কম সুসংহত।
মালয়েশিয়া ও জাপান: এই দেশগুলোতেও ছায়া মন্ত্রিসভার চর্চা শুরু হয়েছে, যদিও তা এখনো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়নি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছায়া মন্ত্রিসভার গঠন ভিন্ন হলেও কিছু অভিন্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। সদস্য নির্বাচন সাধারণত বিরোধীদলীয় নেতা বা দলের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের মাধ্যমে হয়। জোটবদ্ধ বিরোধী দলের ক্ষেত্রে আলোচনা সাপেক্ষে একাধিক দল থেকে সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রতিটি সদস্য সরকারের কোনো না কোনো মন্ত্রণালয়ের সমান্তরালে কাজ করে, নীতি পর্যবেক্ষণ ও সমালোচনা করে। অনেক দেশে ছায়া মন্ত্রিসভাকে ‘অপেক্ষমাণ সরকার’ (Government-in-waiting) বা ‘পরবর্তী সরকার’ (next cabinet) হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়, যা সরকার পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ছায়া মন্ত্রিসভার সম্ভাবনা:
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচন পরবর্তী সময়ে, ১১-দলীয় বিরোধী জোটের বৃহত্তম দল জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যতম জোটসঙ্গী এনসিপি ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের ঘোষণা দিয়েছে, যা সরকারে থাকা বিএনপিও স্বাগত জানিয়েছে। যদিও এই ছায়া মন্ত্রিসভা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করবে না, তবুও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য যুগান্তকারী হতে পারে।
ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের ফলে:
সংসদ প্রাণবন্ত হবে: বিরোধী দলগুলো সংসদের বাইরে অপ্রয়োজনীয় সংঘাতে না গিয়ে সরকারের নীতির সুচারুভাবে পর্যালোচনা ও সমালোচনা করতে পারবে।
সরকারের জবাবদিহিতা বাড়বে: সরকারের নীতি ও কার্যক্রমের গঠনমূলক সমালোচনা এবং বিকল্প প্রস্তাবনা সরকারকে আরো সতর্ক ও সচেতনভাবে দেশ পরিচালনায় উদ্বুদ্ধ করবে।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাধানের পথ উন্মোচিত হবে।
ভবিষ্যৎ পথ ও করণীয়:
বিরোধী দলগুলোর উচিত হবে, ছায়া মন্ত্রিসভাকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য সংসদ ও সংসদের বাইরে জনসচেতনতা তৈরি করা এবং দাবি উত্থাপন করা। বর্তমান পরিস্থিতিতে, আলাদা আলাদা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের পরিবর্তে বিরোধী দলগুলোর একক ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা অধিক ফলপ্রসূ হতে পারে। এতে যেমন বিরোধী দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আলোচনা ও সমন্বয় বজায় থাকবে, তেমনি বৃহত্তর পরিসরে জাতীয় ঐক্য ও সৌহার্দ্যও বৃদ্ধি পাবে। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসা জোটকে সংযত রাখতেও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা প্রয়োজন, যা একক ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের মাধ্যমে সহজতর হবে।
বাংলাদেশের ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ ধারণাকে যদি যথাযথভাবে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও কার্যকর করা যায়, তাহলে July বিপ্লবের মাধ্যমে জাতি নতুনভাবে গণতন্ত্রের দিকে যে যাত্রা শুরু করেছিল, তা এক নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকে পৌঁছাবে। এটি কেবল রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনই আনবে না, বরং দেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক কাঠামোকে শক্তিশালী করবে।
রিপোর্টারের নাম 

























