প্রাচীনকাল থেকেই ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্যপথগুলোতে আরব বণিকদের সরব উপস্থিতি ছিল। মালাবার, শ্রীলঙ্কা, জাভা, সুমাত্রা ও মালয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে তাদের বাণিজ্যিক বসতি গড়ে উঠেছিল। এই প্রেক্ষাপটে বাংলার উর্বর উপকূলীয় ভূমিতেও আরবদের আগমন ও বসতি স্থাপন স্বাভাবিক বলে মনে করেন ইতিহাসবিদদের একাংশ। কারণ তুলা, মসলা ও উৎকৃষ্ট আগর কাঠসহ মূল্যবান পণ্যের উৎপাদনে বাংলা ছিল এক সমৃদ্ধ জনপদ। তবে এই প্রাচীন আরব বসতির প্রকৃতি ও প্রভাব নিয়ে পণ্ডিতমহলে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে।
ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ অনুযায়ী, বাণিজ্য প্রসারের উদ্দেশ্যে আরব বণিকরা ভারত মহাসাগরের উপকূলবর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী বসতি স্থাপন করেছিলেন। এই ধারা মেনেই বাংলার সমৃদ্ধ উপকূলীয় অঞ্চলে তাদের পদচারণা ও বসতি গড়ে ওঠার সম্ভাবনাকে অনেকেই যুক্তিযুক্ত মনে করেন। যদিও বাংলার মাটিতে আরবদের প্রথম দিকের বসতি স্থাপনের সময়কাল ও প্রকৃতি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, তবুও কেউ কেউ অষ্টম শতকেই উত্তরবঙ্গে আরব মুসলিম শাসনের অস্তিত্ব প্রমাণের চেষ্টা করেছেন, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এই বিতর্কের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন ড. এনামুল হক। তার মতে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে আরব মুসলিমদের বসতি ধীরে ধীরে একটি সুসংগঠিত ও প্রভাবশালী সম্প্রদায়ে পরিণত হয়। কালক্রমে এই সম্প্রদায় চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল জুড়ে একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। এই মুসলিম রাজ্যের শাসকরা ‘সুলতান’ উপাধি ধারণ করতেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ড. এনামুল হকের এই ব্যাখ্যা মূলত একাধিক আরাকানি বৃত্তান্ত ও রাজবংশীয় ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এমন একটি আরাকানি বিবরণে উল্লেখ আছে যে, ৯৫১ থেকে ৯৫৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আরাকানের রাজা সু-লা-তাইং সান-দা-য়া ‘থু-রা-তান’ নামক এক ব্যক্তিকে পরাজিত করে চেত-তা-গং (চট্টগ্রাম) দখল করেন এবং সেখানে একটি বিজয়স্তম্ভ স্থাপন করেন। ড. হক মনে করেন, ‘থু-রা-তান’ শব্দটি মূলত আরবি ‘সুলতান’ শব্দের আরাকানি রূপান্তর, যা তৎকালীন শাসকের পদবি নির্দেশ করে।
ড. এনামুল হকের এই ভাষ্যকে সমর্থন করেছেন এম.এ. রহিমও। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ‘সুরতান’ হলো ‘সুলতান’ শব্দের আরাকানি বিকৃত রূপ। তবে মুসলিমদের সামরিক বিজয়ের পূর্বেই এই অঞ্চলে আরবদের প্রাচীন বসতি স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে ঐতিহাসিক এ.এইচ. দানি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, সামরিক অভিযান ছাড়া কেবল বাণিজ্যিক কারণে এত বড় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব ছিল না। এই ভিন্নমত বাংলার ইতিহাসে আরব মুসলিমদের ভূমিকা নিয়ে চলমান বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
রিপোর্টারের নাম 


















