ঢাকা ১১:৩১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সফলতা-ব্যর্থতায় অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৪১:৫৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

## অন্তর্বর্তী সরকারের দুই বছর: সাফল্য, চ্যালেঞ্জ ও নবদিগন্ত

ঢাকা: ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নিয়েছে। ১৮ মাসের এই সরকার দেশের অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম সংকটময় মুহূর্তে দায়িত্ব গ্রহণ করে। বিরাজমান রাজনৈতিক ডামাডোল এবং বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে সক্ষম হয়েছে সরকার। বিদায়কালে সন্তোষজনক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রেখে যাওয়াকে অনেকেই সরকারের অন্যতম সাফল্য হিসেবে দেখছেন।

পটভূমি ও দায়িত্ব গ্রহণ: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ও পলায়নের পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুরুতেই প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার কিছু বাধার সম্মুখীন হয়। আনসার বিদ্রোহ, প্রশাসনিক ষড়যন্ত্র এবং বিচার বিভাগের কিছু ঘটনা সরকারকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে। এসবের পাশাপাশি বিভিন্ন দাবিতে প্রায় ১৬০০-এর বেশি আন্দোলন মোকাবিলা করতে হয় সরকারকে।

সাফল্যের খতিয়ান:
অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন: সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে ভারতের হস্তক্ষেপমুক্ত একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে সক্ষমতা। যদিও কিছু রাজনৈতিক দল নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, তবে সামগ্রিকভাবে নির্বাচনটি কাঙ্ক্ষিত মানে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকরা মত দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনও তাদের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সফল বলে জানিয়েছে।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার: মেগা প্রকল্পের নামে ব্যাপক লুটপাট ও অর্থপাচারের ফলে ভঙ্গুর হয়ে পড়া অর্থনীতিকে গতিশীল করতে অন্তর্বর্তী সরকার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়। ব্রিটিশ দৈনিক ফিনান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচার হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি এই সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির বেহাল চিত্র তুলে ধরেছে। সরকারের প্রেস সচিবের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৫-১৭ বিলিয়ন ডলার থেকে ২৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা মোট হিসাবে ৩৪ বিলিয়ন ডলার। ডলারের বিপরীতে টাকার দরও স্থিতিশীল হয়েছে। রাজস্ব আহরণে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি এবং খাদ্য মজুত ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে।
জুলাই সনদ ও বিচার প্রক্রিয়া: মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে পুনরুজ্জীবিত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে বিচার শুরু হয় এবং একটি ট্রাইব্যুনাল এই রায় ঘোষণা করে।
রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার: পূর্ববর্তী সরকারের আমলে দায়ের করা প্রায় ২৪ হাজার মামলা থেকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলামসহ বিভিন্ন দলের পাঁচ লাখ নেতাকর্মীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
ন্যায়ভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি: নতজানু পররাষ্ট্রনীতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিবেশীদের সঙ্গে ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছে সরকার। ভারতকে দেওয়া ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং ‘ফেনী চিকেন নেক’ হিসেবে পরিচিত মিরসরাইয়ে ভারতকে দেওয়া ৯০০ একর জমি অবমুক্ত করা হয়েছে।

চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা:
প্রশাসনে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা: জনপ্রশাসনের সঙ্গে টানাপোড়েন, আমলাতন্ত্রের অসহযোগিতা, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব এবং উপদেষ্টা পরিষদের মধ্যে মতভেদের কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রদানে সরকার কিছুটা ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দ্বারা উপদেষ্টাদের ঘেরাও এবং সচিবালয় অচলের মতো ঘটনাও ঘটেছে।
আন্দোলন মোকাবিলা: অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রায় দুই হাজার আন্দোলন হয়েছে। তবে সরকার শান্তিপূর্ণভাবে এসব আন্দোলন মোকাবিলা করেছে এবং লাইভ বুলেট ব্যবহার করা হয়নি বলে জানানো হয়েছে।

ভবিষ্যৎ展望: অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া সংস্কার ও জুলাই সনদ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন দেশের ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং ন্যায়ভিত্তিক বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার পথে অন্তর্বর্তী সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং সমন্বয়ের অভাবের মতো চ্যালেঞ্জগুলো ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কলেজের জায়গায় অবৈধ দোকান নির্মাণ: বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে তোলপাড়

সফলতা-ব্যর্থতায় অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর

আপডেট সময় : ১০:৪১:৫৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

## অন্তর্বর্তী সরকারের দুই বছর: সাফল্য, চ্যালেঞ্জ ও নবদিগন্ত

ঢাকা: ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নিয়েছে। ১৮ মাসের এই সরকার দেশের অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম সংকটময় মুহূর্তে দায়িত্ব গ্রহণ করে। বিরাজমান রাজনৈতিক ডামাডোল এবং বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে সক্ষম হয়েছে সরকার। বিদায়কালে সন্তোষজনক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রেখে যাওয়াকে অনেকেই সরকারের অন্যতম সাফল্য হিসেবে দেখছেন।

পটভূমি ও দায়িত্ব গ্রহণ: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ও পলায়নের পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুরুতেই প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার কিছু বাধার সম্মুখীন হয়। আনসার বিদ্রোহ, প্রশাসনিক ষড়যন্ত্র এবং বিচার বিভাগের কিছু ঘটনা সরকারকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে। এসবের পাশাপাশি বিভিন্ন দাবিতে প্রায় ১৬০০-এর বেশি আন্দোলন মোকাবিলা করতে হয় সরকারকে।

সাফল্যের খতিয়ান:
অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন: সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে ভারতের হস্তক্ষেপমুক্ত একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে সক্ষমতা। যদিও কিছু রাজনৈতিক দল নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, তবে সামগ্রিকভাবে নির্বাচনটি কাঙ্ক্ষিত মানে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকরা মত দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনও তাদের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সফল বলে জানিয়েছে।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার: মেগা প্রকল্পের নামে ব্যাপক লুটপাট ও অর্থপাচারের ফলে ভঙ্গুর হয়ে পড়া অর্থনীতিকে গতিশীল করতে অন্তর্বর্তী সরকার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়। ব্রিটিশ দৈনিক ফিনান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচার হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি এই সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির বেহাল চিত্র তুলে ধরেছে। সরকারের প্রেস সচিবের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৫-১৭ বিলিয়ন ডলার থেকে ২৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা মোট হিসাবে ৩৪ বিলিয়ন ডলার। ডলারের বিপরীতে টাকার দরও স্থিতিশীল হয়েছে। রাজস্ব আহরণে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি এবং খাদ্য মজুত ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে।
জুলাই সনদ ও বিচার প্রক্রিয়া: মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে পুনরুজ্জীবিত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে বিচার শুরু হয় এবং একটি ট্রাইব্যুনাল এই রায় ঘোষণা করে।
রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার: পূর্ববর্তী সরকারের আমলে দায়ের করা প্রায় ২৪ হাজার মামলা থেকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলামসহ বিভিন্ন দলের পাঁচ লাখ নেতাকর্মীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
ন্যায়ভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি: নতজানু পররাষ্ট্রনীতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিবেশীদের সঙ্গে ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছে সরকার। ভারতকে দেওয়া ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং ‘ফেনী চিকেন নেক’ হিসেবে পরিচিত মিরসরাইয়ে ভারতকে দেওয়া ৯০০ একর জমি অবমুক্ত করা হয়েছে।

চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা:
প্রশাসনে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা: জনপ্রশাসনের সঙ্গে টানাপোড়েন, আমলাতন্ত্রের অসহযোগিতা, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব এবং উপদেষ্টা পরিষদের মধ্যে মতভেদের কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রদানে সরকার কিছুটা ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দ্বারা উপদেষ্টাদের ঘেরাও এবং সচিবালয় অচলের মতো ঘটনাও ঘটেছে।
আন্দোলন মোকাবিলা: অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রায় দুই হাজার আন্দোলন হয়েছে। তবে সরকার শান্তিপূর্ণভাবে এসব আন্দোলন মোকাবিলা করেছে এবং লাইভ বুলেট ব্যবহার করা হয়নি বলে জানানো হয়েছে।

ভবিষ্যৎ展望: অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া সংস্কার ও জুলাই সনদ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন দেশের ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং ন্যায়ভিত্তিক বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার পথে অন্তর্বর্তী সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং সমন্বয়ের অভাবের মতো চ্যালেঞ্জগুলো ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হবে।