ঢাকা ১১:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ঐতিহ্যের পরশে ঢাকার রমজান: শতবর্ষ আগের এক বর্ণিল চিত্র

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:১৫:২৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

বরেণ্য চিকিৎসক, সাহিত্যিক ও ইতিহাসবিদ হাকিম হাবিবুর রহমানের কালজয়ী গ্রন্থ ‘ঢাকা পাচাস বারাস প্যাহলে’ ঢাকার ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল। উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের প্রথম দিকের ঢাকার সমাজ, সংস্কৃতি এবং নাগরিক জীবনের বহুমাত্রিক রূপ এই গ্রন্থে সবিস্তারে বর্ণিত। লেখকের চোখে সেই সময়ের ঢাকায় রমজান মাস উদযাপনের এক বর্ণিল চিত্র উঠে এসেছে, যা আজকের দিনেও আমাদের কৌতূহলী করে তোলে। রমজানের প্রস্তুতি থেকে শুরু করে চাঁদ দেখা, তারাবিহ, সেহরি, ইফতার ও সামাজিকতার নানা দিক নিয়ে সেই হারিয়ে যাওয়া দিনের ঢাকার রমজানকে নতুন করে দেখা যাক।

রমজানের প্রস্তুতি: শবেবরাত থেকে শুরু
শবেবরাতের পর থেকেই রমজানুল মোবারকের আগমনী বার্তা প্রকাশ পেতে শুরু করত। শাবান মাসের ২০ তারিখের পর থেকে এই প্রস্তুতি জোরেশোরে আরম্ভ হতো। মসজিদগুলোতে মুসল্লিদের আনাগোনা বাড়ত, চুনকাম ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলত। অভিজাত পরিবারগুলো ঘরবাড়ি নতুন করে সাজিয়ে তুলত, আর সাধারণ মানুষও চাঁদ দেখার আগে নিজের ঘরকে চিকন মাটির লেপ দিয়ে ঝকঝকে করে রাখত। সামর্থ্য অনুযায়ী সবাই নিজেদের আবাসস্থল পরিপাটি করত। রমজান উপলক্ষে বালুমাটির নতুন নতুন সুরাই (মাটির পাত্র) আনা হতো এবং ঘরে সুগন্ধি রাখা হতো। ছোলাবুট পরিষ্কার করে রাখা হতো এবং প্রথম রোজার ইফতারে ব্যবহারের জন্য ২৭ শাবানে নতুন মাটির পাতিলে মুগ ডালের বীজ ভিজিয়ে অঙ্কুরিত করা হতো।

রমজানের চাঁদ দেখা: উৎসব ও আনন্দ
চানরাত থেকেই ঘরে ঘরে ফারাস ফারুস (বিশেষ ধরনের মাদুর) বিছানোর প্রস্তুতি চলত। শিশুদের খইল ও বেসনের পানি দিয়ে গোসল করিয়ে চাঁদ দেখার জন্য প্রস্তুত করা হতো। বড় কাটরা, আহসান মঞ্জিল, ছোট কাটরা ও হোসেনী দালানের মতো উঁচু অট্টালিকার ছাদে অনেক আগে থেকেই লোকজন ভিড় করত। শৌখিন ব্যক্তিরা নৌকায় করে মাঝনদীতে গিয়ে চাঁদ দেখত। কিশোর, যুবক, এমনকি বৃদ্ধরাও নিজেদের দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করার জন্য চাঁদ দেখতে যেত। চাঁদ দেখা গেলে আনন্দের রব উঠত, একে অপরকে মোবারকবাদ জানানো হতো। বন্দুকের গুলি ছোড়া হতো, তোপধ্বনি করা হতো। ছোটরা বড়দের সালাম জানাতে যেত, যা ছিল এক বিশেষ সামাজিক রীতি।

তারাবির নামাজ: হাফেজদের সম্মান ও খতমের বিশেষ আয়োজন
মসজিদের জন্য হাফেজ সাহেবরা আগে থেকেই মনোনীত থাকতেন। ঝাড়বাতি ও ফানুস পরিষ্কার করে মোমবাতি লাগানো হতো। প্রথম দিন তারাবিহ নামাজ কিছুটা দেরিতে শুরু হতো এবং মুসল্লিরা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী তারাবির সময় নির্ধারণ করতেন। বাজারের মসজিদে কিছুটা আগে এবং মহল্লার মসজিদে দেরিতে তারাবিহ শুরু হতো। সে সময়ে সুরা তারাবির রেওয়াজ বেশি ছিল, কারণ হাফেজদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। হাফেজদের অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া হতো। হাফেজ রেল, হাফেজ তুফান ও হাফেজ আমানের মতো ব্যক্তিরা তখন খুবই বিখ্যাত ছিলেন। বর্তমানে প্রতিটি মহল্লাতেই হাফেজ তৈরি হচ্ছে, যা এক ইতিবাচক পরিবর্তন।

১৪, ২১ অথবা ২৭ তারিখে খতম তারাবিহ কিছুটা দেরিতে শুরু হতো। হাফেজ সাহেবের জন্য মুসল্লিরা নজরানা দিতেন এবং খতমের পর কালোজিরা ও শবের মধ্যে দম করানো হতো। মুসল্লিদের মধ্যে মিষ্টান্ন, শিরবেরেঞ্জ (ফিরনিজাতীয় তরল খাবার) ও পোলাও বিতরণ করা হতো। এরপর থেকে প্রতিটি মসজিদে সুরা তারাবিহ পড়ানো হতো। সেকালে এতেকাফকারীদের সংখ্যা নামমাত্র থাকলেও বর্তমানে প্রতি বছর তাদের সংখ্যা বাড়ছে।

সাহরির আয়োজন: ‘সাহরিওয়ালা’র ডাক ও গরম খাবারের রেওয়াজ
তারাবিহ নামাজের পর সাহরির আয়োজন করে ঘুমানোর ব্যবস্থা করা হতো। শিশু-কিশোররা সাহরির সময় ঘুম থেকে উঠিয়ে দেওয়ার জন্য ওয়াদা নিত। তারাবির পর পুরুষেরা ঘরে এসে ঘুমিয়ে পড়লেও যুবকেরা গল্পগুজব করে সাহরি পর্যন্ত জেগে থাকার তালে থাকত। সে সময় রেস্টুরেন্ট বা বায়োস্কোপের তেমন প্রচলন ছিল না, তাই মহল্লাবাসী বাংলা ঘরে এবং অভিজাতরা নিজেদের বৈঠকখানায় জমায়েত হতেন। তখন ‘সাহরিওয়ালা’রা বেরিয়ে পড়ত। তারা ময়লা লণ্ঠন ও কুকুর থেকে বাঁচার জন্য লাঠি নিয়ে ‘রোজদারো উঠ্‌ঠো, সাহরি খাও, ওয়াক্ত হো গ্যয়া’ বলে দরজায় দরজায় ডাক দিত। এই ঘোরাঘুরি দ্বিপ্রহর রাত থেকে শুরু হয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত চলত। ঢাকার বাসিন্দারা সাহরির সময় গরম খাবার খাওয়ায় অভ্যস্ত ছিলেন এবং এই অভ্যাস এখনো বজায় আছে। সাহরির সময় শুধু ভাত টাটকা রান্না করা হতো, আর তরকারি দিনের বেলায় রান্না করে রাখা হতো, যা সাহরির সময় গরম করে দস্তরখানে পরিবেশন করা হতো।

সাহরির খাবারদাবার: রান্নার পটুত্ব ও বিশেষ পছন্দের পদ
আল্লাহ তায়ালা ঢাকার মহিলাদের রান্নার গুণে এক বিশেষ পটুত্ব দান করেছেন, যার প্রদর্শনী রোজার দিনে দেখা যেত। সে সময় ঢাকার সব বাড়িতে নানারকম খাদ্য রান্না হতো। ঢাকার বাসিন্দারা সাহরির জন্য সাধারণত কোরমা ও শিরবেরেঞ্জ (ফিরনিজাতীয় তরল খাবার) বেশি পছন্দ করতেন। এই সময় খাবারের প্রকার কম রাখা হতো, বরং সন্ধ্যার সময় যে খাবার ভালো লাগত, সেটি সাহরির জন্য তুলে রাখা হতো। পুরুষেরা অধিকাংশ সময় রুটি খেতেন, তবে মহিলারা ভাত খেতে পছন্দ করতেন। এই সময়ে চায়ের প্রচলন শুরু হলেও তখনো সর্বসাধারণের মধ্যে এর ব্যাপকতা ছিল না। মোগল অভিজাত ও কাশ্মীরি সম্মানিত ব্যক্তিরা সাহরির সময় অবশ্যই চা পান করতেন। সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা ফজরের আজান পর্যন্ত কোরআন তেলাওয়াত করতেন, আর অন্যরা ঘুমিয়ে পড়তেন। ফজরের নামাজের সময় অধিকাংশ মসজিদ শূন্য থাকত। ব্যবসায়ী লোকেরা সকাল সকাল জেগে উঠে নিজেদের কাজে নিয়োজিত হতেন, কিন্তু অভিজাতেরা জোহরের নামাজ পর্যন্ত আরাম করে ঘুমাতেন।

দিনের বেলায় দোকানপাট বন্ধ: এক ভিন্ন চিত্র
আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগেও পুরো শহরে সকালবেলা রুটির দোকান বন্ধ থাকত। এজন্য আগের রাতেই ছেলেপেলেদের জন্য দিনের রুটির ব্যবস্থা করে রাখা হতো। দিনের বেলায় রাস্তায় কোনো পানখেকো মুসলিমকে দেখা যেত না। কাউকে হুক্কা বা সিগারেট পান করতেও দেখা যেত না, যা ছিল সেকালের রমজানের এক বিশেষ সংযম।

ইফতারের খাবারদাবার: বৈচিত্র্য ও ঐতিহ্য
রমজান উপলক্ষে ঘরে ঘরে কোফতা অবশ্যই তেলে ভাজা হতো। কোথাও কোথাও সেটার কোরমা আবার কোথাও কালিয়া রান্না করা হতো। এটি সাহরির জন্য ঢাকার লোকদের পছন্দের খাবার ছিল। তারা রুটি ও ভাত দুটোই তৃপ্তি করে খেত। জোহরের পরে ভেজানো ছোলা থেকে বুট বের করা হতো অথবা পুরো বুট ইফতারির জন্য আলাদা করে রাখা হতো। ডাল পিষে ফুলুরি বানানো হতো, যা ইফতারের সময় গরম গরম দস্তরখানে পরিবেশন করা হতো। রোজার সময় প্রতিটি ঘরে মুড়ি অবশ্যই থাকত। পেঁয়াজ, মরিচ ও তেলের সমন্বয়ে মুড়ির ভর্তা ছিল রমজানে অপরিহার্য খাবার। তেলে ভাজা মুড়ির সঙ্গে তেলে ভাজা পনির বনেদি ঘরে ইফতারে অন্তর্ভুক্ত থাকত।

তেলে ভাজা মাখনার খইও সব জায়গায় পাওয়া যেত। দস্তরখানে জমজমের পানি থাকত, যা প্রত্যেকের ভাগ্যে দু-চার ফোঁটা করে জুটত। মাগরিবের আজান শোনার পর প্রথমে সবাই জমজমের পানি শরবতে ঢেলে পান করত এবং খোরমা-খেজুর ধোয়া ও কাটার পর দু-এক টুকরো মুখে দিত। এটাকে সওয়াবের কাজ মনে করা হতো। ঢাকায় অনেক রকমের শরবত তৈরি করা হতো। লোকেরা ফালুদা বেশি পছন্দ করত। মিছরির শরবতে সরু করে কাটা পেস্তা বাদাম মেশানো হতো। অধিকাংশ লোক সুগন্ধি তোকমার শরবত পান করত, আর কেউ কেউ বেলের শরবত পছন্দ করত।

কয়েক প্রকারের মুড়ি, নোনতা ও মিষ্টি সমুসা, কাঁচা ও ভুনা ডাল, ফলমূল এবং ফুলুরি তৈরি হতো। বাজার থেকে অবশ্যই গোলাবি ওখরা ও ভুনা চিড়া আসত, দোভাজা টিপা ফুলুরি আসত, মাষের ডালের বড়া ও বুট আসত ইফতারের সময়। ছোট ছেলেমেয়েরাও ইফতারে শামিল হতো। মাগরিবের নামাজ শেষে সবাই খাওয়ার জন্য আবার দস্তরখানে বসত। সেখানে অধিকাংশ সময় সাধারণ ও পনিরমিশ্রিত বাকরখানি অবশ্যই থাকত, সঙ্গে থাকত কাবাব।

রমজান মাসে হুক্কার বিশেষ ব্যবস্থা করা হতো। বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এ সময় মাটির হুক্কা পছন্দ করতেন। তারা ইফতারের পরে মিঠা কড়া তামাক সেবন করতেন আর সাহরির সময় তাওয়ার কড়া তামাক সেবন করতেন।

রমজানের বিশেষ সবজি ও ফল: ঋতুভেদে ভিন্নতা
যে ঋতুতেই রমজান হোক না কেন, সেকালে কয়েকটি বিশেষ খাবারের উপস্থিতি লক্ষণীয় ছিল। এর মধ্যে একটি হলো পুদিনা, আর অন্যটি হলো টাটকা ক্ষীরা (শসা), যা দেখে মনে হতো কৃষক বিশেষ যত্নে এই ফসল ফলিয়েছে। অমৌসুমি ফলও রমজানে পাওয়া যেত। অমৌসুমি তরকারি ও শাকসবজি অনেক দামে বিক্রি হতো। টাটকা ধনেপাতাও সে সময় বাজারে আসত।

ফলমূলের মধ্যে কাটা শিঙাড়া (পানিফল) খুঁজে নিয়ে আসা হতো। যখন গ্রীষ্মকাল শুরু হতো, রায়জীর বাগান থেকে গরিবেরা চীনা আলু জাতীয় শাক ও আলু নিয়ে আসত। এগুলো ভালো দামে বিক্রি হতো এবং ইফতারিতে অবশ্যই পরিবেশন করা হতো। রমজান মাসে সবসময় আখ পাওয়া যেত। আখ টুকরো করে গোলাপ বা কেওড়ার পানিতে ভিজিয়ে রাখা হতো। বেশিরভাগ সময় ইফতারিতে এটা শখ করে খাওয়া হতো।

চকের ইফতার বাজার: ঐতিহ্যবাহী এক কেন্দ্র
রমজান মাসে চকবাজারে ইফতারের দোকান বসত। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই এখান থেকে ইফতার কিনত। মহল্লায় মহল্লায় এখন যেরকম ইফতারের দোকান দেখা যায়, সেকালে তার নামনিশানাও ছিল না। প্রতিটি ব্যক্তিই চক থেকে কিছু না কিছু নিয়ে আসত। বিভিন্ন রকমের ভাজাপোড়া ও রমজানের বিশেষ সামগ্রী সেখানে পাওয়া যেত। এর মধ্যে গোলাবি ওখরা রমজান ছাড়া অন্য কোনো সময় পাওয়া যেত না। ৫০ বছর আগে আলাউদ্দিন হালওয়াই লক্ষ্ণৌ থেকে এসে চকবাজারে দোকান খুলেছিলেন। নিমকপারা, সমুসা ও লক্ষ্ণৌ শীরমাল একমাত্র তার দোকানেই পাওয়া যেত।

রমজানে মেহমানদারি: ভালোবাসা ও আতিথেয়তা
রমজানে প্রতিটি ঘরে উন্নত মানের খাদ্য তৈরি হতো। নিজেরা খাওয়ার পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের কাছেও পাঠানো হতো। তবে রমজান মাসে দাওয়াত দেওয়া বা নিমন্ত্রণে যাওয়া ঢাকার রীতির বিরুদ্ধে ছিল। এখানকার প্রকৃত বাসিন্দারা রমজান মাসে কাউকে নিমন্ত্রণ করাকে সমীচীন মনে করতেন না। তবে সম্বন্ধী বা নতুন আত্মীয়দের বাড়িতে ধুমধামের সঙ্গেই ইফতারের সামগ্রী পাঠানো হতো।

ছেলেদের আট বছর ও মেয়েদের ছয় বছর বয়স থেকে রোজা রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা হতো। বাচ্চাদের খুশি করার জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যবস্থা করা হতো। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের খবর দেওয়া হতো এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত মহিলা মেহমানেরা নানা রকমের ইফতার নিয়ে আসতেন। বাচ্চাদের বড় আগ্রহের সঙ্গে ইফতার করানো হতো। প্রথমে বাদাম পিষে মিছরি মিশিয়ে তাদের খাওয়ানো হতো। আত্মীয়স্বজনরা নগদ সালামি দিতেন। সেকালে বাচ্চাদের রোজার মিছিলও দেখা যেত, কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে মুসলমানেরা এখন এই আনুষ্ঠানিকতাকে বর্জন করেছে।

গৃহিণীদের ব্যস্ততা: কাবাবের বৈচিত্র্য
জোহরের পর থেকে গৃহিণীরা রান্নাঘরে প্রবেশ করতেন। অন্য দিনের তুলনায় রমজান মাসে রকমারি কাবাব বানানো হতো। বাজার থেকে শুধু শিককাবাব আসত। নার্গিসি কাবাব, কাসকাবাব বা বটি, শিকের মোরগকাবাব ও হান্ডির মোরগকাবাব অধিকাংশ সময় বাসাতেই বানানো হতো। কাবাবের জন্য রুটি-পরোটাও তৈরি হতো।

সংগীত: রাতের ঢাকাকে জাগিয়ে তুলত সুর
আজ থেকে ২০-২৫ বছর আগেও ঢাকাবাসীর মধ্যে সংগীতের প্রতি এক বিশেষ আকর্ষণ ছিল। রাত ১টার সময় অধিকাংশ মহল্লা থেকে গায়কেরা বের হয়ে আসত। তাদের সঙ্গে ঢোল বা তবলা-জাতীয় কোনো বাদ্যযন্ত্র থাকত না। তারা তাল ও সুরের সঙ্গে উর্দুতে গান গাইত, যা ছিল সেকালের রমজানের এক ভিন্নমাত্রা।

ইফতারের সামাজিকতা ও জাকাত প্রদান: সহযোগিতার হাত
রমজান মাসে সচ্ছল ব্যক্তি ও উদারমনা পরিবার থেকে মহল্লার মসজিদে ইফতার সামগ্রী পাঠানো হতো। যারা প্রতিদিন পাঠাতে পারত না, তারা বৃহস্পতি ও শুক্রবারে পাঠাত। বেশিরভাগ জায়গা থেকে শরবত আসত। সচ্ছল ব্যক্তিরা রমজানের প্রথম ১০ দিনের মধ্যেই জাকাতের হিসাব করে ফেলতেন। সেকালে জাকাত হিসেবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শাড়িই বণ্টন করা হতো, সঙ্গে নগদ টাকাও দেওয়া হতো।

২০ রোজার গুরুত্ব: এক বিশেষ দিন
একশ-দেড়শ বছর আগে ঢাকার মুসলমানরা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ২০ রোজাকে অত্যন্ত পবিত্র বলে বিবেচনা করত। বেশিরভাগ সময় সেদিন বাচ্চাদের প্রথম রোজা রাখার ব্যবস্থা করা হতো। সেদিন মসজিদে এত বেশি ইফতারি আসত যে, খাওয়ার লোকেরা রীতিমতো বিব্রত বোধ করত, যা ছিল সেকালের রমজানের এক বিশেষ সামাজিক চিত্র।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কলেজের জায়গায় অবৈধ দোকান নির্মাণ: বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে তোলপাড়

ঐতিহ্যের পরশে ঢাকার রমজান: শতবর্ষ আগের এক বর্ণিল চিত্র

আপডেট সময় : ১০:১৫:২৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বরেণ্য চিকিৎসক, সাহিত্যিক ও ইতিহাসবিদ হাকিম হাবিবুর রহমানের কালজয়ী গ্রন্থ ‘ঢাকা পাচাস বারাস প্যাহলে’ ঢাকার ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল। উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের প্রথম দিকের ঢাকার সমাজ, সংস্কৃতি এবং নাগরিক জীবনের বহুমাত্রিক রূপ এই গ্রন্থে সবিস্তারে বর্ণিত। লেখকের চোখে সেই সময়ের ঢাকায় রমজান মাস উদযাপনের এক বর্ণিল চিত্র উঠে এসেছে, যা আজকের দিনেও আমাদের কৌতূহলী করে তোলে। রমজানের প্রস্তুতি থেকে শুরু করে চাঁদ দেখা, তারাবিহ, সেহরি, ইফতার ও সামাজিকতার নানা দিক নিয়ে সেই হারিয়ে যাওয়া দিনের ঢাকার রমজানকে নতুন করে দেখা যাক।

রমজানের প্রস্তুতি: শবেবরাত থেকে শুরু
শবেবরাতের পর থেকেই রমজানুল মোবারকের আগমনী বার্তা প্রকাশ পেতে শুরু করত। শাবান মাসের ২০ তারিখের পর থেকে এই প্রস্তুতি জোরেশোরে আরম্ভ হতো। মসজিদগুলোতে মুসল্লিদের আনাগোনা বাড়ত, চুনকাম ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলত। অভিজাত পরিবারগুলো ঘরবাড়ি নতুন করে সাজিয়ে তুলত, আর সাধারণ মানুষও চাঁদ দেখার আগে নিজের ঘরকে চিকন মাটির লেপ দিয়ে ঝকঝকে করে রাখত। সামর্থ্য অনুযায়ী সবাই নিজেদের আবাসস্থল পরিপাটি করত। রমজান উপলক্ষে বালুমাটির নতুন নতুন সুরাই (মাটির পাত্র) আনা হতো এবং ঘরে সুগন্ধি রাখা হতো। ছোলাবুট পরিষ্কার করে রাখা হতো এবং প্রথম রোজার ইফতারে ব্যবহারের জন্য ২৭ শাবানে নতুন মাটির পাতিলে মুগ ডালের বীজ ভিজিয়ে অঙ্কুরিত করা হতো।

রমজানের চাঁদ দেখা: উৎসব ও আনন্দ
চানরাত থেকেই ঘরে ঘরে ফারাস ফারুস (বিশেষ ধরনের মাদুর) বিছানোর প্রস্তুতি চলত। শিশুদের খইল ও বেসনের পানি দিয়ে গোসল করিয়ে চাঁদ দেখার জন্য প্রস্তুত করা হতো। বড় কাটরা, আহসান মঞ্জিল, ছোট কাটরা ও হোসেনী দালানের মতো উঁচু অট্টালিকার ছাদে অনেক আগে থেকেই লোকজন ভিড় করত। শৌখিন ব্যক্তিরা নৌকায় করে মাঝনদীতে গিয়ে চাঁদ দেখত। কিশোর, যুবক, এমনকি বৃদ্ধরাও নিজেদের দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করার জন্য চাঁদ দেখতে যেত। চাঁদ দেখা গেলে আনন্দের রব উঠত, একে অপরকে মোবারকবাদ জানানো হতো। বন্দুকের গুলি ছোড়া হতো, তোপধ্বনি করা হতো। ছোটরা বড়দের সালাম জানাতে যেত, যা ছিল এক বিশেষ সামাজিক রীতি।

তারাবির নামাজ: হাফেজদের সম্মান ও খতমের বিশেষ আয়োজন
মসজিদের জন্য হাফেজ সাহেবরা আগে থেকেই মনোনীত থাকতেন। ঝাড়বাতি ও ফানুস পরিষ্কার করে মোমবাতি লাগানো হতো। প্রথম দিন তারাবিহ নামাজ কিছুটা দেরিতে শুরু হতো এবং মুসল্লিরা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী তারাবির সময় নির্ধারণ করতেন। বাজারের মসজিদে কিছুটা আগে এবং মহল্লার মসজিদে দেরিতে তারাবিহ শুরু হতো। সে সময়ে সুরা তারাবির রেওয়াজ বেশি ছিল, কারণ হাফেজদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। হাফেজদের অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া হতো। হাফেজ রেল, হাফেজ তুফান ও হাফেজ আমানের মতো ব্যক্তিরা তখন খুবই বিখ্যাত ছিলেন। বর্তমানে প্রতিটি মহল্লাতেই হাফেজ তৈরি হচ্ছে, যা এক ইতিবাচক পরিবর্তন।

১৪, ২১ অথবা ২৭ তারিখে খতম তারাবিহ কিছুটা দেরিতে শুরু হতো। হাফেজ সাহেবের জন্য মুসল্লিরা নজরানা দিতেন এবং খতমের পর কালোজিরা ও শবের মধ্যে দম করানো হতো। মুসল্লিদের মধ্যে মিষ্টান্ন, শিরবেরেঞ্জ (ফিরনিজাতীয় তরল খাবার) ও পোলাও বিতরণ করা হতো। এরপর থেকে প্রতিটি মসজিদে সুরা তারাবিহ পড়ানো হতো। সেকালে এতেকাফকারীদের সংখ্যা নামমাত্র থাকলেও বর্তমানে প্রতি বছর তাদের সংখ্যা বাড়ছে।

সাহরির আয়োজন: ‘সাহরিওয়ালা’র ডাক ও গরম খাবারের রেওয়াজ
তারাবিহ নামাজের পর সাহরির আয়োজন করে ঘুমানোর ব্যবস্থা করা হতো। শিশু-কিশোররা সাহরির সময় ঘুম থেকে উঠিয়ে দেওয়ার জন্য ওয়াদা নিত। তারাবির পর পুরুষেরা ঘরে এসে ঘুমিয়ে পড়লেও যুবকেরা গল্পগুজব করে সাহরি পর্যন্ত জেগে থাকার তালে থাকত। সে সময় রেস্টুরেন্ট বা বায়োস্কোপের তেমন প্রচলন ছিল না, তাই মহল্লাবাসী বাংলা ঘরে এবং অভিজাতরা নিজেদের বৈঠকখানায় জমায়েত হতেন। তখন ‘সাহরিওয়ালা’রা বেরিয়ে পড়ত। তারা ময়লা লণ্ঠন ও কুকুর থেকে বাঁচার জন্য লাঠি নিয়ে ‘রোজদারো উঠ্‌ঠো, সাহরি খাও, ওয়াক্ত হো গ্যয়া’ বলে দরজায় দরজায় ডাক দিত। এই ঘোরাঘুরি দ্বিপ্রহর রাত থেকে শুরু হয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত চলত। ঢাকার বাসিন্দারা সাহরির সময় গরম খাবার খাওয়ায় অভ্যস্ত ছিলেন এবং এই অভ্যাস এখনো বজায় আছে। সাহরির সময় শুধু ভাত টাটকা রান্না করা হতো, আর তরকারি দিনের বেলায় রান্না করে রাখা হতো, যা সাহরির সময় গরম করে দস্তরখানে পরিবেশন করা হতো।

সাহরির খাবারদাবার: রান্নার পটুত্ব ও বিশেষ পছন্দের পদ
আল্লাহ তায়ালা ঢাকার মহিলাদের রান্নার গুণে এক বিশেষ পটুত্ব দান করেছেন, যার প্রদর্শনী রোজার দিনে দেখা যেত। সে সময় ঢাকার সব বাড়িতে নানারকম খাদ্য রান্না হতো। ঢাকার বাসিন্দারা সাহরির জন্য সাধারণত কোরমা ও শিরবেরেঞ্জ (ফিরনিজাতীয় তরল খাবার) বেশি পছন্দ করতেন। এই সময় খাবারের প্রকার কম রাখা হতো, বরং সন্ধ্যার সময় যে খাবার ভালো লাগত, সেটি সাহরির জন্য তুলে রাখা হতো। পুরুষেরা অধিকাংশ সময় রুটি খেতেন, তবে মহিলারা ভাত খেতে পছন্দ করতেন। এই সময়ে চায়ের প্রচলন শুরু হলেও তখনো সর্বসাধারণের মধ্যে এর ব্যাপকতা ছিল না। মোগল অভিজাত ও কাশ্মীরি সম্মানিত ব্যক্তিরা সাহরির সময় অবশ্যই চা পান করতেন। সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা ফজরের আজান পর্যন্ত কোরআন তেলাওয়াত করতেন, আর অন্যরা ঘুমিয়ে পড়তেন। ফজরের নামাজের সময় অধিকাংশ মসজিদ শূন্য থাকত। ব্যবসায়ী লোকেরা সকাল সকাল জেগে উঠে নিজেদের কাজে নিয়োজিত হতেন, কিন্তু অভিজাতেরা জোহরের নামাজ পর্যন্ত আরাম করে ঘুমাতেন।

দিনের বেলায় দোকানপাট বন্ধ: এক ভিন্ন চিত্র
আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগেও পুরো শহরে সকালবেলা রুটির দোকান বন্ধ থাকত। এজন্য আগের রাতেই ছেলেপেলেদের জন্য দিনের রুটির ব্যবস্থা করে রাখা হতো। দিনের বেলায় রাস্তায় কোনো পানখেকো মুসলিমকে দেখা যেত না। কাউকে হুক্কা বা সিগারেট পান করতেও দেখা যেত না, যা ছিল সেকালের রমজানের এক বিশেষ সংযম।

ইফতারের খাবারদাবার: বৈচিত্র্য ও ঐতিহ্য
রমজান উপলক্ষে ঘরে ঘরে কোফতা অবশ্যই তেলে ভাজা হতো। কোথাও কোথাও সেটার কোরমা আবার কোথাও কালিয়া রান্না করা হতো। এটি সাহরির জন্য ঢাকার লোকদের পছন্দের খাবার ছিল। তারা রুটি ও ভাত দুটোই তৃপ্তি করে খেত। জোহরের পরে ভেজানো ছোলা থেকে বুট বের করা হতো অথবা পুরো বুট ইফতারির জন্য আলাদা করে রাখা হতো। ডাল পিষে ফুলুরি বানানো হতো, যা ইফতারের সময় গরম গরম দস্তরখানে পরিবেশন করা হতো। রোজার সময় প্রতিটি ঘরে মুড়ি অবশ্যই থাকত। পেঁয়াজ, মরিচ ও তেলের সমন্বয়ে মুড়ির ভর্তা ছিল রমজানে অপরিহার্য খাবার। তেলে ভাজা মুড়ির সঙ্গে তেলে ভাজা পনির বনেদি ঘরে ইফতারে অন্তর্ভুক্ত থাকত।

তেলে ভাজা মাখনার খইও সব জায়গায় পাওয়া যেত। দস্তরখানে জমজমের পানি থাকত, যা প্রত্যেকের ভাগ্যে দু-চার ফোঁটা করে জুটত। মাগরিবের আজান শোনার পর প্রথমে সবাই জমজমের পানি শরবতে ঢেলে পান করত এবং খোরমা-খেজুর ধোয়া ও কাটার পর দু-এক টুকরো মুখে দিত। এটাকে সওয়াবের কাজ মনে করা হতো। ঢাকায় অনেক রকমের শরবত তৈরি করা হতো। লোকেরা ফালুদা বেশি পছন্দ করত। মিছরির শরবতে সরু করে কাটা পেস্তা বাদাম মেশানো হতো। অধিকাংশ লোক সুগন্ধি তোকমার শরবত পান করত, আর কেউ কেউ বেলের শরবত পছন্দ করত।

কয়েক প্রকারের মুড়ি, নোনতা ও মিষ্টি সমুসা, কাঁচা ও ভুনা ডাল, ফলমূল এবং ফুলুরি তৈরি হতো। বাজার থেকে অবশ্যই গোলাবি ওখরা ও ভুনা চিড়া আসত, দোভাজা টিপা ফুলুরি আসত, মাষের ডালের বড়া ও বুট আসত ইফতারের সময়। ছোট ছেলেমেয়েরাও ইফতারে শামিল হতো। মাগরিবের নামাজ শেষে সবাই খাওয়ার জন্য আবার দস্তরখানে বসত। সেখানে অধিকাংশ সময় সাধারণ ও পনিরমিশ্রিত বাকরখানি অবশ্যই থাকত, সঙ্গে থাকত কাবাব।

রমজান মাসে হুক্কার বিশেষ ব্যবস্থা করা হতো। বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এ সময় মাটির হুক্কা পছন্দ করতেন। তারা ইফতারের পরে মিঠা কড়া তামাক সেবন করতেন আর সাহরির সময় তাওয়ার কড়া তামাক সেবন করতেন।

রমজানের বিশেষ সবজি ও ফল: ঋতুভেদে ভিন্নতা
যে ঋতুতেই রমজান হোক না কেন, সেকালে কয়েকটি বিশেষ খাবারের উপস্থিতি লক্ষণীয় ছিল। এর মধ্যে একটি হলো পুদিনা, আর অন্যটি হলো টাটকা ক্ষীরা (শসা), যা দেখে মনে হতো কৃষক বিশেষ যত্নে এই ফসল ফলিয়েছে। অমৌসুমি ফলও রমজানে পাওয়া যেত। অমৌসুমি তরকারি ও শাকসবজি অনেক দামে বিক্রি হতো। টাটকা ধনেপাতাও সে সময় বাজারে আসত।

ফলমূলের মধ্যে কাটা শিঙাড়া (পানিফল) খুঁজে নিয়ে আসা হতো। যখন গ্রীষ্মকাল শুরু হতো, রায়জীর বাগান থেকে গরিবেরা চীনা আলু জাতীয় শাক ও আলু নিয়ে আসত। এগুলো ভালো দামে বিক্রি হতো এবং ইফতারিতে অবশ্যই পরিবেশন করা হতো। রমজান মাসে সবসময় আখ পাওয়া যেত। আখ টুকরো করে গোলাপ বা কেওড়ার পানিতে ভিজিয়ে রাখা হতো। বেশিরভাগ সময় ইফতারিতে এটা শখ করে খাওয়া হতো।

চকের ইফতার বাজার: ঐতিহ্যবাহী এক কেন্দ্র
রমজান মাসে চকবাজারে ইফতারের দোকান বসত। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই এখান থেকে ইফতার কিনত। মহল্লায় মহল্লায় এখন যেরকম ইফতারের দোকান দেখা যায়, সেকালে তার নামনিশানাও ছিল না। প্রতিটি ব্যক্তিই চক থেকে কিছু না কিছু নিয়ে আসত। বিভিন্ন রকমের ভাজাপোড়া ও রমজানের বিশেষ সামগ্রী সেখানে পাওয়া যেত। এর মধ্যে গোলাবি ওখরা রমজান ছাড়া অন্য কোনো সময় পাওয়া যেত না। ৫০ বছর আগে আলাউদ্দিন হালওয়াই লক্ষ্ণৌ থেকে এসে চকবাজারে দোকান খুলেছিলেন। নিমকপারা, সমুসা ও লক্ষ্ণৌ শীরমাল একমাত্র তার দোকানেই পাওয়া যেত।

রমজানে মেহমানদারি: ভালোবাসা ও আতিথেয়তা
রমজানে প্রতিটি ঘরে উন্নত মানের খাদ্য তৈরি হতো। নিজেরা খাওয়ার পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের কাছেও পাঠানো হতো। তবে রমজান মাসে দাওয়াত দেওয়া বা নিমন্ত্রণে যাওয়া ঢাকার রীতির বিরুদ্ধে ছিল। এখানকার প্রকৃত বাসিন্দারা রমজান মাসে কাউকে নিমন্ত্রণ করাকে সমীচীন মনে করতেন না। তবে সম্বন্ধী বা নতুন আত্মীয়দের বাড়িতে ধুমধামের সঙ্গেই ইফতারের সামগ্রী পাঠানো হতো।

ছেলেদের আট বছর ও মেয়েদের ছয় বছর বয়স থেকে রোজা রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা হতো। বাচ্চাদের খুশি করার জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যবস্থা করা হতো। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের খবর দেওয়া হতো এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত মহিলা মেহমানেরা নানা রকমের ইফতার নিয়ে আসতেন। বাচ্চাদের বড় আগ্রহের সঙ্গে ইফতার করানো হতো। প্রথমে বাদাম পিষে মিছরি মিশিয়ে তাদের খাওয়ানো হতো। আত্মীয়স্বজনরা নগদ সালামি দিতেন। সেকালে বাচ্চাদের রোজার মিছিলও দেখা যেত, কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে মুসলমানেরা এখন এই আনুষ্ঠানিকতাকে বর্জন করেছে।

গৃহিণীদের ব্যস্ততা: কাবাবের বৈচিত্র্য
জোহরের পর থেকে গৃহিণীরা রান্নাঘরে প্রবেশ করতেন। অন্য দিনের তুলনায় রমজান মাসে রকমারি কাবাব বানানো হতো। বাজার থেকে শুধু শিককাবাব আসত। নার্গিসি কাবাব, কাসকাবাব বা বটি, শিকের মোরগকাবাব ও হান্ডির মোরগকাবাব অধিকাংশ সময় বাসাতেই বানানো হতো। কাবাবের জন্য রুটি-পরোটাও তৈরি হতো।

সংগীত: রাতের ঢাকাকে জাগিয়ে তুলত সুর
আজ থেকে ২০-২৫ বছর আগেও ঢাকাবাসীর মধ্যে সংগীতের প্রতি এক বিশেষ আকর্ষণ ছিল। রাত ১টার সময় অধিকাংশ মহল্লা থেকে গায়কেরা বের হয়ে আসত। তাদের সঙ্গে ঢোল বা তবলা-জাতীয় কোনো বাদ্যযন্ত্র থাকত না। তারা তাল ও সুরের সঙ্গে উর্দুতে গান গাইত, যা ছিল সেকালের রমজানের এক ভিন্নমাত্রা।

ইফতারের সামাজিকতা ও জাকাত প্রদান: সহযোগিতার হাত
রমজান মাসে সচ্ছল ব্যক্তি ও উদারমনা পরিবার থেকে মহল্লার মসজিদে ইফতার সামগ্রী পাঠানো হতো। যারা প্রতিদিন পাঠাতে পারত না, তারা বৃহস্পতি ও শুক্রবারে পাঠাত। বেশিরভাগ জায়গা থেকে শরবত আসত। সচ্ছল ব্যক্তিরা রমজানের প্রথম ১০ দিনের মধ্যেই জাকাতের হিসাব করে ফেলতেন। সেকালে জাকাত হিসেবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শাড়িই বণ্টন করা হতো, সঙ্গে নগদ টাকাও দেওয়া হতো।

২০ রোজার গুরুত্ব: এক বিশেষ দিন
একশ-দেড়শ বছর আগে ঢাকার মুসলমানরা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ২০ রোজাকে অত্যন্ত পবিত্র বলে বিবেচনা করত। বেশিরভাগ সময় সেদিন বাচ্চাদের প্রথম রোজা রাখার ব্যবস্থা করা হতো। সেদিন মসজিদে এত বেশি ইফতারি আসত যে, খাওয়ার লোকেরা রীতিমতো বিব্রত বোধ করত, যা ছিল সেকালের রমজানের এক বিশেষ সামাজিক চিত্র।