ঢাকা ১১:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

গণআকাঙ্ক্ষা পূরণ ও স্থিতিশীলতার ১৮ মাস: নির্বাচন শেষে ড. ইউনূস সরকারের বিদায়

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:২৭:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ, রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেওয়ার মাধ্যমে শেষ হলো ১৮ মাসের এই অন্তর্বর্তীকালীন অধ্যায়। দেউলিয়া হওয়ার পথে থাকা অর্থনীতি এবং ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করলেও, বিদায়লগ্নে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দৃষ্টান্ত রেখে গেছে এই সরকার।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণ করেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শুরুতেই এই সরকারকে বহুমুখী ষড়যন্ত্র ও চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হয়েছে। সচিবালয় ঘেরাও, আনসার বিদ্রোহ এবং বিচার বিভাগীয় ক্যুর মতো পরিস্থিতি সামলে প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে আনা ছিল এক কঠিন পরীক্ষা। এছাড়া বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে ১৬০০-এর বেশি সভা-সমাবেশ ও আন্দোলনের মুখেও সরকার তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সরকারের অন্যতম বড় সাফল্য হলো একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপ ছিল না, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই নির্বাচনকে ২০০৮ সালের পর সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন। নির্বাচনের পর বিজয়ী দল বিএনপি সরকার গঠন করেছে এবং প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকারকে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বিগত ১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকার কেবল নির্বাচনই নয়, বরং সুদূরপ্রসারী প্রশাসনিক ও আইনি সংস্কারের পথেও হেঁটেছে। এই সময়ে ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী এবং প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি করা হয়েছে, যার সিংহভাগই বাস্তবায়িত হয়েছে। শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে গণহত্যার বিচার শুরু এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নে ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন ছিল সরকারের অন্যতম সাহসী পদক্ষেপ। এছাড়া বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা প্রায় ২৪ হাজার মামলা থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ প্রায় পাঁচ লাখ নেতাকর্মীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে ড. ইউনূস সরকার। বিগত সরকারের ‘নতজানু’ নীতি পরিহার করে সমমর্যাদার ভিত্তিতে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত একতরফা ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট চুক্তিগুলো পর্যালোচনা এবং মিরসরাইয়ে ভারতকে দেওয়া ৯০০ একর জমি অবমুক্ত করার বিষয়টি ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের প্রমাণ দেয়।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারেও অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে এই সরকার। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে পাচার হওয়া প্রায় ২৪০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষত নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও, ১৮ মাসের মাথায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিগত আমলের ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র জনসমক্ষে আনা হয়েছে। বর্তমানে বাজারে ডলারের দাম স্থিতিশীল রয়েছে এবং রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে একটি মজবুত কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়ে বিদায় নিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কলেজের জায়গায় অবৈধ দোকান নির্মাণ: বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে তোলপাড়

গণআকাঙ্ক্ষা পূরণ ও স্থিতিশীলতার ১৮ মাস: নির্বাচন শেষে ড. ইউনূস সরকারের বিদায়

আপডেট সময় : ০৯:২৭:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ, রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেওয়ার মাধ্যমে শেষ হলো ১৮ মাসের এই অন্তর্বর্তীকালীন অধ্যায়। দেউলিয়া হওয়ার পথে থাকা অর্থনীতি এবং ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করলেও, বিদায়লগ্নে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দৃষ্টান্ত রেখে গেছে এই সরকার।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণ করেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শুরুতেই এই সরকারকে বহুমুখী ষড়যন্ত্র ও চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হয়েছে। সচিবালয় ঘেরাও, আনসার বিদ্রোহ এবং বিচার বিভাগীয় ক্যুর মতো পরিস্থিতি সামলে প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে আনা ছিল এক কঠিন পরীক্ষা। এছাড়া বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে ১৬০০-এর বেশি সভা-সমাবেশ ও আন্দোলনের মুখেও সরকার তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সরকারের অন্যতম বড় সাফল্য হলো একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপ ছিল না, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই নির্বাচনকে ২০০৮ সালের পর সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন। নির্বাচনের পর বিজয়ী দল বিএনপি সরকার গঠন করেছে এবং প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকারকে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বিগত ১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকার কেবল নির্বাচনই নয়, বরং সুদূরপ্রসারী প্রশাসনিক ও আইনি সংস্কারের পথেও হেঁটেছে। এই সময়ে ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী এবং প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি করা হয়েছে, যার সিংহভাগই বাস্তবায়িত হয়েছে। শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে গণহত্যার বিচার শুরু এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নে ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন ছিল সরকারের অন্যতম সাহসী পদক্ষেপ। এছাড়া বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা প্রায় ২৪ হাজার মামলা থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ প্রায় পাঁচ লাখ নেতাকর্মীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে ড. ইউনূস সরকার। বিগত সরকারের ‘নতজানু’ নীতি পরিহার করে সমমর্যাদার ভিত্তিতে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত একতরফা ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট চুক্তিগুলো পর্যালোচনা এবং মিরসরাইয়ে ভারতকে দেওয়া ৯০০ একর জমি অবমুক্ত করার বিষয়টি ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের প্রমাণ দেয়।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারেও অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে এই সরকার। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে পাচার হওয়া প্রায় ২৪০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষত নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও, ১৮ মাসের মাথায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিগত আমলের ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র জনসমক্ষে আনা হয়েছে। বর্তমানে বাজারে ডলারের দাম স্থিতিশীল রয়েছে এবং রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে একটি মজবুত কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়ে বিদায় নিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।