ঢাকা ০১:১৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

রমজানের শুরুতে চাহিদা বাড়ার প্রভাব নিত্যপণ্যের দামে

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:০৬:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

রমজান ঘিরে চড়া নিত্যপণ্যের বাজার: ভোগান্তি সাধারণ মানুষের

রমজান মাস শুরু হতেই দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ইফতার ও সেহরির প্রয়োজনীয় সামগ্রী থেকে শুরু করে পেঁয়াজ, মুরগি, মাংস, মাছসহ প্রায় সকল নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সপ্তাহের ব্যবধানে ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি করেছে।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রমজানের শুরুতে চাহিদা বাড়ার সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সরবরাহ সংকটের অজুহাত দেখিয়ে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। যদিও ব্যবসায়ীরা বলছেন, রমজানের প্রথম কয়েকদিন চাহিদা বেশি থাকলেও পরবর্তীতে তা স্বাভাবিক হয়ে আসে এবং দামও কমে আসে। তবে এই অল্প সময়েই ক্রেতাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

বাজারের চিত্র:

কারওয়ান বাজার, নয়াবাজার, কেরানীগঞ্জ বৌবাজার ও হাতিরপুল কাঁচাবাজারসহ বিভিন্ন বাজারে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। দোকানিদের দম ফেলারও সময় নেই। ক্রেতারা ইফতার ও সেহরির জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী, চাল, ডাল, তেল, চিনি, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, মাংস, মাছ, ফলমূলসহ বিভিন্ন পণ্য কিনছেন।

মূল্যবৃদ্ধির কারণ ও প্রভাব:

ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, রমজান মাসকে ঘিরে প্রতি বছরই চাহিদা বাড়ে এবং কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে দাম বাড়িয়ে দেয়। ক্রেতারাও মনে করছেন, রমজানকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন। বিশেষ করে, নির্বাচন ও নতুন সরকার গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যে বাজার তদারকি সঠিকভাবে না হওয়ায় অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছেন।

পণ্যের দামের তারতম্য:

পেঁয়াজ: সপ্তাহের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে। পাইকারি বাজারে দেশি পেঁয়াজ ৫৩-৫৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ৪২-৪৬ টাকা ছিল। খুচরা বাজারে দাম ৬০-৭০ টাকা।
মুরগি: সোনালি মুরগির দাম কেজিতে প্রায় ৩০ টাকা বেড়ে ৩৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ৩০০ টাকা ছিল। ব্রয়লার মুরগির দামও ১০ টাকা বেড়ে ১৯০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
মাংস: খাসির মাংসের দাম কেজিতে ৫০ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংসের দামও কেজিতে ২০-৫০ টাকা বেড়ে ৭৮০-৮০০ টাকায় পৌঁছেছে।
ইফতার সামগ্রী: লেবু, কাঁচামরিচ, টমেটো, বেগুন, শসা, ধনেপাতা এবং খেজুরের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে, গত বছরের তুলনায় জাহিদি খেজুরের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
ফল: আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর, আনারসহ প্রায় সকল আমদানি করা ফলের দাম কেজিতে ২০-৬০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। দেশি ফলের দামও চড়া।

তবে, ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন যে ছোলা, চিনি, লুজ সয়াবিন তেলের দাম গত বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে।

সরকারি উদ্যোগ ও বাস্তবতা:

রমজান উপলক্ষে সাশ্রয়ী মূল্যে টিসিবির পণ্য বিক্রির দ্বিতীয় দিনেও বিভিন্ন পয়েন্টে ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন লক্ষ্য করা গেছে। টিসিবির ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের পেছনে হুড়োহুড়ি করে পণ্য কিনতে দেখা গেছে। অনেকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও পণ্য না পেয়ে খালি হাতে ফিরে গেছেন। ক্রেতারা অভিযোগ করেছেন, লাইনে শৃঙ্খলা নেই এবং কিছু লোক বারবার পণ্য কিনছেন, যার ফলে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছেন।

অন্যদিকে, খাদ্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে ভর্তুকি মূল্যে ওএমএসের ট্রাকের সামনেও নিম্ন আয়ের মানুষের ভিড় দেখা গেছে। এখান থেকে চাল ও আটা সাশ্রয়ী মূল্যে কেনা যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ মতামত:

এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক আব্দুর রহিম খান জানিয়েছেন, ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ, ডালসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে মূল্য বাড়ানোর সুযোগ নেই। তিনি বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে চাঁদাবাজি রোধে কর্তৃপক্ষের কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সাথে, ভোক্তাদের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পণ্য ক্রয় করে বাজারে বাড়তি চাপ সৃষ্টি না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন মনে করেন, চলতি বছর নির্বাচনের কারণে সরকারি নজরদারির অভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যার ফলে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। তিনি নতুন সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে, রমজান মাস জুড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এই মূল্যবৃদ্ধি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজার তদারকি জোরদার এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে এই সংকট নিরসন সম্ভব বলে আশা করা যায়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানজুড়ে ব্যাপক হামলা: ২০ প্রদেশ লক্ষ্যবস্তু, রেড ক্রিসেন্টের সতর্কবার্তা

রমজানের শুরুতে চাহিদা বাড়ার প্রভাব নিত্যপণ্যের দামে

আপডেট সময় : ০৬:০৬:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রমজান ঘিরে চড়া নিত্যপণ্যের বাজার: ভোগান্তি সাধারণ মানুষের

রমজান মাস শুরু হতেই দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ইফতার ও সেহরির প্রয়োজনীয় সামগ্রী থেকে শুরু করে পেঁয়াজ, মুরগি, মাংস, মাছসহ প্রায় সকল নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সপ্তাহের ব্যবধানে ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি করেছে।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রমজানের শুরুতে চাহিদা বাড়ার সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সরবরাহ সংকটের অজুহাত দেখিয়ে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। যদিও ব্যবসায়ীরা বলছেন, রমজানের প্রথম কয়েকদিন চাহিদা বেশি থাকলেও পরবর্তীতে তা স্বাভাবিক হয়ে আসে এবং দামও কমে আসে। তবে এই অল্প সময়েই ক্রেতাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

বাজারের চিত্র:

কারওয়ান বাজার, নয়াবাজার, কেরানীগঞ্জ বৌবাজার ও হাতিরপুল কাঁচাবাজারসহ বিভিন্ন বাজারে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। দোকানিদের দম ফেলারও সময় নেই। ক্রেতারা ইফতার ও সেহরির জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী, চাল, ডাল, তেল, চিনি, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, মাংস, মাছ, ফলমূলসহ বিভিন্ন পণ্য কিনছেন।

মূল্যবৃদ্ধির কারণ ও প্রভাব:

ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, রমজান মাসকে ঘিরে প্রতি বছরই চাহিদা বাড়ে এবং কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে দাম বাড়িয়ে দেয়। ক্রেতারাও মনে করছেন, রমজানকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন। বিশেষ করে, নির্বাচন ও নতুন সরকার গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যে বাজার তদারকি সঠিকভাবে না হওয়ায় অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছেন।

পণ্যের দামের তারতম্য:

পেঁয়াজ: সপ্তাহের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে। পাইকারি বাজারে দেশি পেঁয়াজ ৫৩-৫৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ৪২-৪৬ টাকা ছিল। খুচরা বাজারে দাম ৬০-৭০ টাকা।
মুরগি: সোনালি মুরগির দাম কেজিতে প্রায় ৩০ টাকা বেড়ে ৩৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ৩০০ টাকা ছিল। ব্রয়লার মুরগির দামও ১০ টাকা বেড়ে ১৯০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
মাংস: খাসির মাংসের দাম কেজিতে ৫০ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংসের দামও কেজিতে ২০-৫০ টাকা বেড়ে ৭৮০-৮০০ টাকায় পৌঁছেছে।
ইফতার সামগ্রী: লেবু, কাঁচামরিচ, টমেটো, বেগুন, শসা, ধনেপাতা এবং খেজুরের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে, গত বছরের তুলনায় জাহিদি খেজুরের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
ফল: আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর, আনারসহ প্রায় সকল আমদানি করা ফলের দাম কেজিতে ২০-৬০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। দেশি ফলের দামও চড়া।

তবে, ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন যে ছোলা, চিনি, লুজ সয়াবিন তেলের দাম গত বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে।

সরকারি উদ্যোগ ও বাস্তবতা:

রমজান উপলক্ষে সাশ্রয়ী মূল্যে টিসিবির পণ্য বিক্রির দ্বিতীয় দিনেও বিভিন্ন পয়েন্টে ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন লক্ষ্য করা গেছে। টিসিবির ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের পেছনে হুড়োহুড়ি করে পণ্য কিনতে দেখা গেছে। অনেকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও পণ্য না পেয়ে খালি হাতে ফিরে গেছেন। ক্রেতারা অভিযোগ করেছেন, লাইনে শৃঙ্খলা নেই এবং কিছু লোক বারবার পণ্য কিনছেন, যার ফলে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছেন।

অন্যদিকে, খাদ্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে ভর্তুকি মূল্যে ওএমএসের ট্রাকের সামনেও নিম্ন আয়ের মানুষের ভিড় দেখা গেছে। এখান থেকে চাল ও আটা সাশ্রয়ী মূল্যে কেনা যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ মতামত:

এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক আব্দুর রহিম খান জানিয়েছেন, ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ, ডালসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে মূল্য বাড়ানোর সুযোগ নেই। তিনি বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে চাঁদাবাজি রোধে কর্তৃপক্ষের কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সাথে, ভোক্তাদের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পণ্য ক্রয় করে বাজারে বাড়তি চাপ সৃষ্টি না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন মনে করেন, চলতি বছর নির্বাচনের কারণে সরকারি নজরদারির অভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যার ফলে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। তিনি নতুন সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে, রমজান মাস জুড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এই মূল্যবৃদ্ধি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজার তদারকি জোরদার এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে এই সংকট নিরসন সম্ভব বলে আশা করা যায়।