পবিত্র রমজান মাস আসন্ন। এই সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, খাদ্যের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন সরকারের কাছে ১৫ দফা সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছে বিসেফ ফাউন্ডেশন। গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন থেকে নাগরিক সমাজের পক্ষে এসব দাবি তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ ও নতুন সরকার জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণের শপথ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। সরকারের ঘোষিত নির্বাচনি ইশতেহারে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়। বক্তাদের মতে, শুধু খাদ্য নিরাপত্তা নয়, খাদ্যের নিরাপদতা ও পুষ্টিমান নিশ্চিত না হলে খাদ্য নিরাপত্তার ঘোষণা অর্থহীন হয়ে পড়ে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৫৮ শতাংশে, যা আগের মাসে ছিল ৭.৭১ শতাংশ। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মাছ, মাংস, ডিম ও শাকসবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের এই মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে, খাদ্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, কৃষি ও কৃষকের সমৃদ্ধি এবং পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য (এগ্রোইকোলজি) বিবেচনায় রেখে টেকসই কর্মসূচি গ্রহণের ওপর জোর দিয়ে নতুন সরকারের কাছে ১৫টি সুস্পষ্ট দাবি উত্থাপন করা হয়। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির নাগরিকদের পক্ষ থেকে এই দাবিগুলো উপস্থাপন করেন। দাবিগুলো হলো:
১. নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা। কৃষক যাতে সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পারে, সেজন্য প্রতিটি বাজারে ‘নিরাপদ কৃষকের বাজার’ প্রতিষ্ঠা করা।
২. রমজানে ব্যবহৃত খাদ্যসামগ্রী মজুদের মাধ্যমে মূল্য নিয়ন্ত্রণকারী বাজার সিন্ডিকেটদের বিরুদ্ধে কঠোর তদারকি ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৩. নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনে নিয়োজিত ব্যক্তি, দল ও প্রতিষ্ঠানকে প্রণোদনা সহায়তা দেওয়া।
৪. নিরাপদ খাদ্য আইন অনুযায়ী খাদ্য ব্যবসায়ীদের বিশেষ দায়-দায়িত্ব (ধারা-৪৩) এবং উৎপাদনকারী, মোড়ককারী, বিতরণকারী ও বিক্রয়কারীর বিশেষ দায়বদ্ধতা (ধারা-৪৪) নিশ্চিত করতে তদারকি জোরদার করা।
৫. বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রণীত ‘খাদ্য-সংযোজন দ্রব্য ব্যবহার প্রবিধানমালা, ২০১৭’ কঠোরভাবে অনুসরণ এবং ইফতার সামগ্রী প্রস্তুত ও বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত খাদ্যকর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি (সংক্রামক রোগমুক্ত, পরিচ্ছন্নতা, অ্যাপ্রন, ক্যাপ, হ্যান্ড গ্লাভস) ও খাদ্য স্থাপনার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা।
৬. শরবত ও পানীয় তৈরিতে অনিরাপদ পানি বা বরফ, অননুমোদিত সুগন্ধি বা রঞ্জক পদার্থের ব্যবহার বন্ধ করা। খোলা খাবার ধুলা-বালি ও পোকামাকড়ের সংক্রমণ থেকে রক্ষায় ব্যাপক জনসচেতনতা ও কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা।
৭. নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস এবং খাদ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক বছরব্যাপী গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার জোরদার করা। সংশ্লিষ্টদের করণীয় ও দায়িত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে পদক্ষেপ নেওয়া।
৮. রাসায়নিক উপাদান দিয়ে পাকানো ফল, বাসি-পচা, খোলা খাবার, রাস্তার পাশে খোলা জুস, খবরের কাগজে খাবার মোড়ানো, কৃত্রিম রং মেশানো খাবার, মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার বিক্রয় কঠোরভাবে বন্ধ করা।
৯. নিরাপদ খাদ্য আইনের ১৫ (১) ধারা অনুযায়ী গঠিত ‘কেন্দ্রীয় নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা সমন্বয় কমিটি’-কে কার্যকর করা। একইসঙ্গে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি, বাজার মালিক সমিতি, ইউনিয়ন পরিষদ এবং নিরাপদ খাদ্য নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধি সমন্বয়ে প্রতিটি বাজারে নাগরিক তদারকি কমিটি গঠন করে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ ও নিরাপদতা নিশ্চিত করা।
১০. বিএসটিআই এর পাশাপাশি দেশব্যাপী “নিরাপদ খাদ্য” সীল প্রবর্তন করা।
১১. সারাদেশে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা জোরদার করা। আইনের অপপ্রয়োগ রোধে অনুমানভিত্তিক নয়, বরং প্রমাণভিত্তিক ও স্থানীয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে শাস্তি নির্ধারণ করা।
১২. খাদ্যপণ্যে মেয়াদের পাশাপাশি পুষ্টিমান দৃশ্যমানভাবে বা কালার কোড ও কিউআর কোড ব্যবহারের মাধ্যমে প্রদর্শনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
১৩. নিরাপদ কীটনাশক (Biopesticides) আমদানি ও বাজারজাতকরণে বিদ্যমান বাধা দূর করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক ও আগাছানাশক নিষিদ্ধ করে নিরাপদ বিকল্পে রূপান্তরের জন্য মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা। একইসঙ্গে অবিলম্বে ১০টি সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক নিষিদ্ধ করা।
১৪. খাদ্য নিরাপদতা ও পুষ্টিকর খাদ্য সম্পর্কিত গবেষণা ও উদ্ভাবন জোরদার করার লক্ষ্যে বিশেষ তহবিল গঠন করা এবং তৃণমূলের উদ্ভাবন ও উত্তম কৃষি ও খাদ্য চর্চাকে সহায়তা প্রদান করা।
১৫. একক জানালা ভিত্তিক ডিজিটাল খাদ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (এফবিও) নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং পোর্টাল চালু করা।
বাপা সভাপতি নূর মোহাম্মদ তালুকদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সংবাদ সম্মেলনে সূচনা বক্তব্য রাখেন শিসউক এর নির্বাহী পরিচালক সাকিউল মিল্লাত মোরশেদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিকশিত বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন এর প্রধান নির্বাহী আতাউর রহমান মিটন। এছাড়াও ক্যাব সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান এবং বিসেফ ফাউন্ডেশন এর সাধারণ সম্পাদক ও সিইও রেজাউক করিম সিদ্দিক প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
রিপোর্টারের নাম 



















