ঢাকা ০৬:৪৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে দ্বন্দ্ব: শপথ ইস্যুতে মুখোমুখি বিএনপি ও ১১ দলীয় জোট

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:১৯:৪১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলেও ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর শপথকে কেন্দ্র করে এক গভীর বিভক্তি ও জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করলেও ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের মিত্র ১১ দলীয় জোট এই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করে সরাসরি বিএনপির অবস্থানের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে।

বুধবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের এক মন্তব্যে এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়। তিনি সাংবাদিকদের সাফ জানান, বিএনপি কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবে, কারণ তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হননি এবং বর্তমানে সংবিধানে এই পরিষদের কোনো আইনি কাঠামো নেই। তাঁর যুক্তি হলো, সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যে শপথের বিধান রয়েছে, বিএনপি কেবল সেটিই পালন করবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, গণভোটের রায় অনুযায়ী যদি কোনো পরিষদ গঠন করতে হয়, তবে তা আগে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

জামায়াত ও এনসিপির তীব্র প্রতিক্রিয়া: বিএনপির এই অনড় অবস্থানের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক ক্ষোভ প্রকাশ করে ১১ দলীয় জোট। জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া একে ‘জুলাই সনদের পরিপন্থী’ এবং ‘শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এনসিপি নেতারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরাসরি বিএনপিকে আক্রমণ করে বলেন, যে আদেশের অধীনে নির্বাচন হয়েছে, সেই একই আদেশের অধীনে হওয়া গণভোটের ম্যান্ডেট (জুলাই সনদ) অস্বীকার করা জনগণের সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করার শামিল।

নাটকীয় শপথ গ্রহণ ও বয়কট: দিনভর নানা জল্পনা-কল্পনার পর দুপুরে ১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্যরা সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ—উভয় হিসেবেই শপথ গ্রহণ করেন। তবে তারা প্রতিবাদস্বরূপ বিএনপি নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বয়কট করার ঘোষণা দেন। নাটকীয়তার এখানেই শেষ নয়; বিলম্বে আসায় জামায়াতের এমপিদের সঙ্গেই সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন বিএনপির ইশরাক হোসেন ও স্বতন্ত্র সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। কিন্তু যখন সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ অনুষ্ঠান শুরু হয়, তখন তাঁরা দুজনেই কক্ষ থেকে বের হয়ে যান, যা রাজনৈতিক মহলে আলোচনার খোরাক জোগাচ্ছে।

রাজনীতিবিদদের পাল্টাপাল্টি মত: রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল কাইয়ুম বিষয়টিকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, বিএনপি যে যুক্তিতে এই শপথ এড়িয়ে যাচ্ছে তা দুর্বল। কারণ রাষ্ট্রপতির আদেশেই নির্বাচন ও গণভোট উভয়ই হয়েছে। অন্যদিকে, বাসদ সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বিএনপির সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বলেছেন, সংবিধানে এই পরিষদের শপথের কোনো আইনি ভিত্তি নেই, তাই বিএনপির অবস্থান যৌক্তিক।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ক্ষমতার হস্তান্তরের প্রথম দিনেই ১১ দলীয় জোটের মন্ত্রিসভা বয়কট এবং সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে তাদের এই মুখোমুখি অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আগামী দিনগুলোতে রাজপথের রাজনীতি ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ বাস্তবায়নের প্রশ্নে এই দুই পক্ষের সংঘাত নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

বাতিল হওয়া মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাইটের যাত্রীদের রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা করছে সরকার

সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে দ্বন্দ্ব: শপথ ইস্যুতে মুখোমুখি বিএনপি ও ১১ দলীয় জোট

আপডেট সময় : ০২:১৯:৪১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলেও ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর শপথকে কেন্দ্র করে এক গভীর বিভক্তি ও জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করলেও ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের মিত্র ১১ দলীয় জোট এই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করে সরাসরি বিএনপির অবস্থানের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে।

বুধবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের এক মন্তব্যে এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়। তিনি সাংবাদিকদের সাফ জানান, বিএনপি কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবে, কারণ তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হননি এবং বর্তমানে সংবিধানে এই পরিষদের কোনো আইনি কাঠামো নেই। তাঁর যুক্তি হলো, সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যে শপথের বিধান রয়েছে, বিএনপি কেবল সেটিই পালন করবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, গণভোটের রায় অনুযায়ী যদি কোনো পরিষদ গঠন করতে হয়, তবে তা আগে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

জামায়াত ও এনসিপির তীব্র প্রতিক্রিয়া: বিএনপির এই অনড় অবস্থানের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক ক্ষোভ প্রকাশ করে ১১ দলীয় জোট। জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া একে ‘জুলাই সনদের পরিপন্থী’ এবং ‘শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এনসিপি নেতারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরাসরি বিএনপিকে আক্রমণ করে বলেন, যে আদেশের অধীনে নির্বাচন হয়েছে, সেই একই আদেশের অধীনে হওয়া গণভোটের ম্যান্ডেট (জুলাই সনদ) অস্বীকার করা জনগণের সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করার শামিল।

নাটকীয় শপথ গ্রহণ ও বয়কট: দিনভর নানা জল্পনা-কল্পনার পর দুপুরে ১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্যরা সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ—উভয় হিসেবেই শপথ গ্রহণ করেন। তবে তারা প্রতিবাদস্বরূপ বিএনপি নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বয়কট করার ঘোষণা দেন। নাটকীয়তার এখানেই শেষ নয়; বিলম্বে আসায় জামায়াতের এমপিদের সঙ্গেই সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন বিএনপির ইশরাক হোসেন ও স্বতন্ত্র সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। কিন্তু যখন সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ অনুষ্ঠান শুরু হয়, তখন তাঁরা দুজনেই কক্ষ থেকে বের হয়ে যান, যা রাজনৈতিক মহলে আলোচনার খোরাক জোগাচ্ছে।

রাজনীতিবিদদের পাল্টাপাল্টি মত: রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল কাইয়ুম বিষয়টিকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, বিএনপি যে যুক্তিতে এই শপথ এড়িয়ে যাচ্ছে তা দুর্বল। কারণ রাষ্ট্রপতির আদেশেই নির্বাচন ও গণভোট উভয়ই হয়েছে। অন্যদিকে, বাসদ সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বিএনপির সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বলেছেন, সংবিধানে এই পরিষদের শপথের কোনো আইনি ভিত্তি নেই, তাই বিএনপির অবস্থান যৌক্তিক।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ক্ষমতার হস্তান্তরের প্রথম দিনেই ১১ দলীয় জোটের মন্ত্রিসভা বয়কট এবং সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে তাদের এই মুখোমুখি অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আগামী দিনগুলোতে রাজপথের রাজনীতি ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ বাস্তবায়নের প্রশ্নে এই দুই পক্ষের সংঘাত নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।