ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ সম্পন্ন হলেও ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপি দলীয় নির্বাচিত সদস্যরা প্রস্তাবিত এই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেননি। তাদের যুক্তি, সংবিধানে এমন কোনো পরিষদের শপথ গ্রহণের বিধান এখনো অন্তর্ভুক্ত হয়নি। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি-র নির্বাচিত ৭৭ জন সদস্য সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রাষ্ট্রপতির জারি করা ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ অনুযায়ী, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একইসঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন। এই পরিষদের কার্যক্রম শুরুর জন্য ৬০ জন সদস্যের কোরামের প্রয়োজন। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার পর এই আদেশ বাস্তবায়নের কথা থাকলেও, বিএনপির শপথ বর্জনে পরিষদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংসদ ভবনে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ দলের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি জানান, তারা কেউ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হননি এবং সংবিধান এখনো এই ধারণাকে অন্তর্ভুক্ত করেনি। তারেক রহমানসহ সিনিয়র নেতাদের উপস্থিতিতে তিনি বলেন, গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলেও, সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে এর বিধান যুক্ত হওয়া এবং সদস্যদের শপথ গ্রহণের পদ্ধতি সাংবিধানিকভাবে গৃহীত হওয়া আবশ্যক। এরপরই কেবল পরিষদের সদস্যদের শপথ গ্রহণের বিধান করা যেতে পারে। বিএনপি সংবিধান মেনেই চলবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিএনপির এই সিদ্ধান্তে প্রাথমিকভাবে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখায় জামায়াত ও এনসিপি। এনসিপি-র মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মন্তব্য করেন, “গণভোটের জনরায়কে প্রথম দিনেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শুরু হলো নতুন সংসদের যাত্রা।” এনসিপি দলীয়ভাবে মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানও বয়কট করে। তবে শেষ পর্যন্ত জামায়াত ও এনসিপি উভয় দলই সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দ্বৈত শপথ গ্রহণ করে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, নির্বাচন কমিশন দুটি শপথের জন্য চিঠি দিয়েছে এবং বিএনপি একটি শপথ নিলে সংসদে যাওয়া অর্থহীন হয়ে পড়ে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, গণভোটের রায়ের কারণে যদি ‘জুলাই আদেশ’ বাস্তবায়নযোগ্য হয়েও যায়, তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৬০ জন পরিষদ সদস্যের উপস্থিতি প্রয়োজন। জামায়াত-এনসিপির ৭৭ জন সদস্য শপথ নেওয়ায় তারা চাইলে নিজেদের মতো করে একটি সংবিধান বানিয়ে ফেলতে পারেন, যা দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। তিনি আরও মনে করেন, এই আদেশের মধ্যেই পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার বীজ লুকানো আছে, যার উদ্দেশ্য হতে পারে অনির্বাচিত সরকার আনার প্রেক্ষাপট তৈরি করা।
অপরদিকে, সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক মনে করেন, যদি জুলাই আদেশ অনুযায়ী গণভোটের ফলের কারণে এটি বাস্তবায়নযোগ্য হয়ে যায়, তাহলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের আর প্রয়োজনই থাকে না। তবে ৭৭ জন সদস্য যারা শপথ নিয়েছেন, তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চাইলেও সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি করলে তা জনগণের সমর্থন পাবে না। তিনি বলেন, জনগণ এখন স্থিতিশীলতা চায়।
ইতিমধ্যে, গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এবং ফলাফল স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও, সংবিধানে গণভোটের বিধান না থাকায় এবং সংসদ বহাল না থাকা অবস্থায় জারি করা অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন ও অনুমোদনের আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিএনপি আগে থেকেই আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এবং সংসদে বিল উত্থাপনের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের কথা বলে আসছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটিই হবে সাংবিধানিক পন্থা। এর অন্যথা কিছু হলে তা জাতীয় স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। সব মিলিয়ে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের ভবিষ্যৎ এবং এর আইনি ও রাজনৈতিক পরিণতি নিয়ে বর্তমানে গভীর অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।
রিপোর্টারের নাম 




















