একুশে ফেব্রুয়ারি—বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়, অধিকার আদায় এবং ত্যাগের এক অবিনাশী প্রতীক। ১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় ঢাকার রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন বাংলার দামাল ছেলেরা। বাঙালির সেই ত্যাগের মহিমা আজ আর কেবল বাংলাদেশের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের ঐতিহাসিক স্বীকৃতির পর থেকে এই দিনটি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে।
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট: ১৯৫২ সালের সেই অগ্নিঝরা দিন
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি (৮ ফাল্গুন, ১৩৫৮) ছিল মাতৃভাষা বাংলার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলনের এক চরম মুহূর্ত। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের জারি করা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্রজনতা যখন মিছিল বের করেন, তখন পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। সেই গুলিবর্ষণে শহীদ হন সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত ও শফিউরসহ নাম না জানা আরও অনেক লড়াকু প্রাণ। তাঁদের এই আত্মদানই বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় আসীন করে এবং দিনটি বাঙালি হৃদয়ে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে চিরস্থায়ী আসন গেড়ে নেয়।
বিশ্বমঞ্চে একুশের পদধ্বনি
বাঙালির এই অনন্য আত্মত্যাগের ইতিহাসকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেন কানাডার ভ্যাঙ্কুভার প্রবাসী দুই বাঙালি—রফিকুল ইসলাম ও আব্দুস সালাম। ১৯৯৮ সালে তাঁরা তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনানের কাছে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব পাঠান। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে জাতিসংঘের সচিবালয় থেকে তাঁদের পরামর্শ দেওয়া হয় কোনো সদস্য রাষ্ট্রের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব আনার জন্য।
পরবর্তীতে তাঁরা ‘মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে একটি বহুভাষিক সংগঠন গড়ে তোলেন। এই সংগঠনের পক্ষ থেকে পুনরায় আবেদন জানানো হলে ইউনেস্কোর পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, প্রস্তাবটি অবশ্যই কোনো সদস্য দেশ থেকে উত্থাপিত হতে হবে। সেই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয় এবং ভারত, কানাডা, হাঙ্গেরি ও ফিনল্যান্ডসহ ২৯টি দেশ এই প্রস্তাবের প্রতি জোরালো সমর্থন জানায়।
ইউনেস্কোর স্বীকৃতি ও বিশ্বজনীন উদযাপন
দীর্ঘ চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৮৮টি দেশের সর্বসম্মতিক্রমে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিশ্বের সকল বিলুপ্তপ্রায় ভাষা রক্ষা এবং মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে, যা বাঙালির ত্যাগ ও বীরত্বগাথাকে বিশ্বজুড়ে অমর করে রেখেছে।
রিপোর্টারের নাম 





















