ঢাকা ০৪:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

এবার নির্বাচন-পরবর্তী সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে প্রচারণা নেই

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:৩১:৫৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

নির্বাচন-পরবর্তী সংখ্যালঘু নির্যাতন: এবার ভিন্ন চিত্র

ঢাকা: বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচন ঘিরে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও সহিংসতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। প্রতিবারই নির্বাচন পরবর্তী সময়ে এই সম্প্রদায়ের ওপর নানা ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ সামনে এসেছে। ১৯৯১ সালের পর থেকে প্রায় প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। তবে, সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এই প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। এবারের নির্বাচনে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বড় কোনো অভিযোগ বা প্রচারণা দৃশ্যমান হয়নি, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অতীত প্রেক্ষাপট

সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ওঠে ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম সংসদ নির্বাচনের পর। সে সময় আওয়ামী লীগ ‘সংখ্যালঘু নির্যাতনের কার্ড’ ব্যবহার করে চারদলীয় জোট সরকারকে দেশ-বিদেশে ব্যাপক চাপে ফেলেছিল। যদিও বরাবরই সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগের সুবিধা রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে, তবে উভয় প্রধান রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেই সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।

শেখ হাসিনার শাসনামলে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ তিনটি সংসদ নির্বাচনের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিবারই নির্বাচনের আগে ও পরে বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয় লক্ষ্য করে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, সংখ্যালঘু সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এমন ধারাবাহিক নিপীড়নের প্রবণতার কথা উঠে এসেছিল। যদিও এসব নির্বাচনকে অনেক সময় ‘একতরফা’, ‘ভোটারবিহীন’ বা ‘রাতে হওয়া’ নির্বাচন হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়েছে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ব্যতিক্রমী চিত্র

তবে, সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এর ব্যতিক্রম দেখা গেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি একটি নজিরবিহীন শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ছিল। এই নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছে। জামায়াতে ইসলামীও শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অতীতের সব নির্বাচনের মতো এই নির্বাচনের আগেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) গত ৮ ফেব্রুয়ারি এক প্রেস রিলিজে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে এমন আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছিল। তাদের ‘প্রি-ইলেকশন অ্যান্ড রেফারেন্ডাম সিচুয়েশন’ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল যে, অর্থ, ধর্ম, পেশিশক্তি ও সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব পুরোনো রাজনৈতিক বর্ণনার ধারাবাহিকতা বিদ্যমান রয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আচরণ ও সংঘর্ষ সহিংসতা ও অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করে। এই পর্যবেক্ষণে ধর্মীয় প্রভাবের ব্যবহার ও সাধারণ নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কিত প্রশ্নও উঠে আসে, যা নির্বাচনকালীন পরিবেশকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক সংবাদ ও অধিকার সংগঠনগুলোও নির্বাচন সামনে রেখে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বেড়েছে এমন ভাষ্য দিয়েছিল। কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনা উড়িয়ে দিয়ে সদ্য সমাপ্ত সংসদ নির্বাচনে সংখ্যালঘু নিপীড়নের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

হাসিনার সময়ে সংখ্যালঘু নিপীড়নের চিত্র

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের বিপরীতে শেখ হাসিনার শাসনামলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে সহিংসতার বিস্তৃত চিত্র পাওয়া যায়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে অন্তত ৭৬১টি হিন্দু বাড়ি, ১৯৩টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ২৪৭টি মন্দিরে হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। যশোরের মালোপাড়া গ্রামে নির্বাচনের আগের রাতে কয়েকশ হামলাকারী হিন্দু পরিবারগুলোর বাড়িতে আগুন ও ভাঙচুর চালায়। বরিশাল, কুষ্টিয়া, পাবনা ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। বহু পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়।

২০১৮ সালের নির্বাচনকে ঘিরে অন্তত ৪৭টি সহিংস ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়; এতে আটজন নিহত ও প্রায় ৫৬০ জন আহত হন। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও ঢাকার কয়েকটি এলাকায় সংখ্যালঘু বাড়ি ও দোকানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের খবর আসে। সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর অভিযোগ ছিল, ভয় ও চাপে অনেক ভোটার কেন্দ্রে যেতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। সরকারি পক্ষ বলেছিল, অধিকাংশ ঘটনা রাজনৈতিক সংঘর্ষজনিত।

২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে ও পরবর্তী সময় পর্যন্ত মোট দুই হাজার ৪৪২টি সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এ সময় সহিংসতার শিকার হয়েছে অনেক সংখ্যালঘুও। কিছু প্রতিবেদনে অন্তত ৬১ জন নিহত হওয়ার তথ্যও রয়েছে। মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রংপুর ও খুলনায় উল্লেখযোগ্য হামলার খবর পাওয়া যায়। পুলিশের একাধিক তদন্তে প্রায় ৯৮ শতাংশ ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর দাবি ছিল, ধর্মীয় পরিচয়ও লক্ষ্যবস্তু ছিল।

এই তিনটি নির্বাচনের তথ্য বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে, হাসিনার সময়কালে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বারবার ঝুঁকির মুখে ছিল। বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে হামলা শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতি নয়, দীর্ঘমেয়াদে ভীতি ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি করেছিল।

ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রচারণা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মন্তব্য

দেশের গণমাধ্যমগুলোতে সংখ্যালঘু নিপীড়ন বিষয়ে কোনো চিত্র না থাকলেও ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর গুজব থেমে নেই। দেশটির গণমাধ্যমের কিছু অংশ নির্বাচনের আগে থেকেই বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে অতিমাত্রায় ভুল বা অপপ্রচারের খবর ছড়িয়েছিল, যা অনেক ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাইহীন গুজব হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

এই বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শেখ ওমর বলেন, “এবার নির্বাচনের পর সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা না ঘটায় কিংবা এ নিয়ে কোনো অপপ্রচার না হওয়ায় স্পষ্ট হয়েছে, একটি স্বার্থান্বেষী মহল প্রত্যেক নির্বাচনের পর এই ধরনের প্রোপাগান্ডা রটাতো এবং মহলটি এবার নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে আছে। জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম অর্জন পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের কোনো কল্পকাহিনিও প্রচার হয়নি।”

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহরিয়ার মাহমুদ বলেন, “অন্যবারের নির্বাচনের সঙ্গে এবারের বড় পার্থক্য হলো আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি। তারা এ দেশে সংখ্যালঘু কার্ড সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে। তারা না থাকায় অমুসলিমদের কৃত্রিমভাবে হলেও নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করিয়ে নিজেদের শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে তুলে ধরে ভোটের রাজনীতি করার কেউ এবার ছিল না। ফলে এবারের নির্বাচনের আগে ও পরে সংখ্যালঘুদের ওপর কোনো নিপীড়ন হয়নি।”

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

পারস্য উপসাগর ও ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের বড় ধরনের বিমান হামলা

এবার নির্বাচন-পরবর্তী সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে প্রচারণা নেই

আপডেট সময় : ১১:৩১:৫৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নির্বাচন-পরবর্তী সংখ্যালঘু নির্যাতন: এবার ভিন্ন চিত্র

ঢাকা: বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচন ঘিরে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও সহিংসতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। প্রতিবারই নির্বাচন পরবর্তী সময়ে এই সম্প্রদায়ের ওপর নানা ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ সামনে এসেছে। ১৯৯১ সালের পর থেকে প্রায় প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। তবে, সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এই প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। এবারের নির্বাচনে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বড় কোনো অভিযোগ বা প্রচারণা দৃশ্যমান হয়নি, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অতীত প্রেক্ষাপট

সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ওঠে ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম সংসদ নির্বাচনের পর। সে সময় আওয়ামী লীগ ‘সংখ্যালঘু নির্যাতনের কার্ড’ ব্যবহার করে চারদলীয় জোট সরকারকে দেশ-বিদেশে ব্যাপক চাপে ফেলেছিল। যদিও বরাবরই সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগের সুবিধা রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে, তবে উভয় প্রধান রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেই সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।

শেখ হাসিনার শাসনামলে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ তিনটি সংসদ নির্বাচনের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিবারই নির্বাচনের আগে ও পরে বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয় লক্ষ্য করে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, সংখ্যালঘু সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এমন ধারাবাহিক নিপীড়নের প্রবণতার কথা উঠে এসেছিল। যদিও এসব নির্বাচনকে অনেক সময় ‘একতরফা’, ‘ভোটারবিহীন’ বা ‘রাতে হওয়া’ নির্বাচন হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়েছে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ব্যতিক্রমী চিত্র

তবে, সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এর ব্যতিক্রম দেখা গেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি একটি নজিরবিহীন শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ছিল। এই নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছে। জামায়াতে ইসলামীও শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অতীতের সব নির্বাচনের মতো এই নির্বাচনের আগেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) গত ৮ ফেব্রুয়ারি এক প্রেস রিলিজে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে এমন আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছিল। তাদের ‘প্রি-ইলেকশন অ্যান্ড রেফারেন্ডাম সিচুয়েশন’ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল যে, অর্থ, ধর্ম, পেশিশক্তি ও সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব পুরোনো রাজনৈতিক বর্ণনার ধারাবাহিকতা বিদ্যমান রয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আচরণ ও সংঘর্ষ সহিংসতা ও অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করে। এই পর্যবেক্ষণে ধর্মীয় প্রভাবের ব্যবহার ও সাধারণ নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কিত প্রশ্নও উঠে আসে, যা নির্বাচনকালীন পরিবেশকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক সংবাদ ও অধিকার সংগঠনগুলোও নির্বাচন সামনে রেখে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বেড়েছে এমন ভাষ্য দিয়েছিল। কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনা উড়িয়ে দিয়ে সদ্য সমাপ্ত সংসদ নির্বাচনে সংখ্যালঘু নিপীড়নের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

হাসিনার সময়ে সংখ্যালঘু নিপীড়নের চিত্র

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের বিপরীতে শেখ হাসিনার শাসনামলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে সহিংসতার বিস্তৃত চিত্র পাওয়া যায়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে অন্তত ৭৬১টি হিন্দু বাড়ি, ১৯৩টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ২৪৭টি মন্দিরে হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। যশোরের মালোপাড়া গ্রামে নির্বাচনের আগের রাতে কয়েকশ হামলাকারী হিন্দু পরিবারগুলোর বাড়িতে আগুন ও ভাঙচুর চালায়। বরিশাল, কুষ্টিয়া, পাবনা ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। বহু পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়।

২০১৮ সালের নির্বাচনকে ঘিরে অন্তত ৪৭টি সহিংস ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়; এতে আটজন নিহত ও প্রায় ৫৬০ জন আহত হন। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও ঢাকার কয়েকটি এলাকায় সংখ্যালঘু বাড়ি ও দোকানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের খবর আসে। সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর অভিযোগ ছিল, ভয় ও চাপে অনেক ভোটার কেন্দ্রে যেতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। সরকারি পক্ষ বলেছিল, অধিকাংশ ঘটনা রাজনৈতিক সংঘর্ষজনিত।

২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে ও পরবর্তী সময় পর্যন্ত মোট দুই হাজার ৪৪২টি সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এ সময় সহিংসতার শিকার হয়েছে অনেক সংখ্যালঘুও। কিছু প্রতিবেদনে অন্তত ৬১ জন নিহত হওয়ার তথ্যও রয়েছে। মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রংপুর ও খুলনায় উল্লেখযোগ্য হামলার খবর পাওয়া যায়। পুলিশের একাধিক তদন্তে প্রায় ৯৮ শতাংশ ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর দাবি ছিল, ধর্মীয় পরিচয়ও লক্ষ্যবস্তু ছিল।

এই তিনটি নির্বাচনের তথ্য বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে, হাসিনার সময়কালে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বারবার ঝুঁকির মুখে ছিল। বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে হামলা শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতি নয়, দীর্ঘমেয়াদে ভীতি ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি করেছিল।

ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রচারণা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মন্তব্য

দেশের গণমাধ্যমগুলোতে সংখ্যালঘু নিপীড়ন বিষয়ে কোনো চিত্র না থাকলেও ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর গুজব থেমে নেই। দেশটির গণমাধ্যমের কিছু অংশ নির্বাচনের আগে থেকেই বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে অতিমাত্রায় ভুল বা অপপ্রচারের খবর ছড়িয়েছিল, যা অনেক ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাইহীন গুজব হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

এই বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শেখ ওমর বলেন, “এবার নির্বাচনের পর সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা না ঘটায় কিংবা এ নিয়ে কোনো অপপ্রচার না হওয়ায় স্পষ্ট হয়েছে, একটি স্বার্থান্বেষী মহল প্রত্যেক নির্বাচনের পর এই ধরনের প্রোপাগান্ডা রটাতো এবং মহলটি এবার নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে আছে। জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম অর্জন পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের কোনো কল্পকাহিনিও প্রচার হয়নি।”

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহরিয়ার মাহমুদ বলেন, “অন্যবারের নির্বাচনের সঙ্গে এবারের বড় পার্থক্য হলো আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি। তারা এ দেশে সংখ্যালঘু কার্ড সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে। তারা না থাকায় অমুসলিমদের কৃত্রিমভাবে হলেও নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করিয়ে নিজেদের শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে তুলে ধরে ভোটের রাজনীতি করার কেউ এবার ছিল না। ফলে এবারের নির্বাচনের আগে ও পরে সংখ্যালঘুদের ওপর কোনো নিপীড়ন হয়নি।”