ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই পুলিশ প্রশাসনে নতুন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) কে হচ্ছেন, তা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। বর্তমান আইজিপি বাহারুল আলমের পদত্যাগের গুঞ্জন সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়লেও তিনি তা নাকচ করেছেন। তবে, নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর নতুন আইজিপি নিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে। এই পদ পেতে ইতিমধ্যেই একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন এবং তিন অতিরিক্ত আইজিপি এই দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন বলে জানা গেছে।
বর্তমান আইজিপি বাহারুল আলমকে ২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল এবং তার দুই বছরের চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ২১ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু, পুলিশ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নতুন নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশ বাহিনীতে নতুন আইজিপি নিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা শীর্ষ পদটি পেতে জোর তৎপরতা শুরু করেছেন। আইজিপি হওয়ার দৌড়ে যে তিনজন কর্মকর্তা সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছেন, তারা হলেন—র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) এ কে এম শহীদুর রহমান, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) প্রধান আলী হোসেন ফকির এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজ। অন্যদিকে, বিশেষায়িত বাহিনী র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) পদে রেলওয়ে পুলিশের প্রধান ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমানও আলোচনায় আছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ডিআইজি গতকাল সোমবার জানান, নির্বাচনের আগে থেকেই একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সক্রিয় ছিলেন এবং নির্বাচনের পর তাদের তৎপরতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই তিন অতিরিক্ত আইজিপিই পুলিশের সর্বোচ্চ অভিভাবক হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন আইজিপি হওয়ার আগ্রহীরা বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ শুরু করেছেন। কয়েকজন ইতিমধ্যেই প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করে নিজেদের বায়োডাটা ও কর্মজীবনের বিস্তারিত তুলে ধরছেন। তারা বিশেষ করে উল্লেখ করছেন যে, পূর্ববর্তী প্রশাসনের সময় কীভাবে তারা নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন এবং গুরুত্বপূর্ণ বদলি পাননি। এর মাধ্যমে তারা নতুন সরকারের কাছে নিজেদের সঠিক মূল্যায়ন ও পুনর্বহালের দাবি তুলে ধরছেন।
র্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহীদুর রহমানের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ আগামী ১৫ মার্চ শেষ হচ্ছে। তিনি আইজিপি হওয়ার জন্য চেষ্টা করছেন। বরিশালের বাসিন্দা শহীদুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের ১২তম ব্যাচ থেকে তিনি বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন। তিনি নোয়াখালী ও শরীয়তপুর জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ছিলেন। পূর্ববর্তী প্রশাসনের পতনের পর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের প্রধান আলী হোসেন ফকিরকে ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তিনি বিসিএসের ১৫তম ব্যাচের পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা। পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকার তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছিল। তবে, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়।
শরীয়তপুরের বাসিন্দা হাসিব আজিজও আইজিপি হওয়ার আলোচনায় আছেন। তিনি ১৫তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা। ২০০২ সালে তিনি ঝিনাইদহে অতিরিক্ত এসপির দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৪ সালে তিনি চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশে কর্মরত ছিলেন এবং ২০০৬ সালে ফেনীর এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সূত্র জানায়, সামনের আইজিপি হিসেবে একজন পেশাদার, সৎ, বিতর্কমুক্ত এবং পুলিশিং সম্পর্কে গভীর বোঝেন এমন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হবে। পূর্ববর্তী প্রশাসনের সময় চার শতাধিক মেধাবী কর্মকর্তাকে বিভিন্ন অজুহাতে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছিল এবং একাধিক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। যাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, তাদের বড় অংশ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার জন্য বিভিন্নজনের কাছে তদবির করছেন। সবাই নতুন সরকারের কাছে তাদের মূল্যায়নের অপেক্ষায় আছেন।
রিপোর্টারের নাম 























