## নতুন সরকার আজ: এমপি ও মন্ত্রীদের শপথ গ্রহণ, তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া প্রায় নিশ্চিত
ঢাকা: দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ মঙ্গলবার নতুন সরকারের এমপি ও মন্ত্রীদের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করছে বাংলাদেশ। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি’র অভাবনীয় বিজয়ের পর দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে সকাল ১০টায় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হবে। পরবর্তীতে, বিকাল ৪টায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হবে মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান।
আনুষ্ঠানিকতার পর সরকার গঠন:
নতুন সরকারের মন্ত্রীদের শপথের আগে কিছু আনুষ্ঠানিকতা এখনও সম্পন্ন হয়নি। যদিও গণপরিষদের সদস্য হিসেবে আলাদা শপথের কথা সংসদ সচিবালয় থেকে জানানো হয়েছে, তবে দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির এমপিরা আজ সে শপথ নাও নিতে পারেন। প্রায় দুই দশক পর বিএনপি ষষ্ঠবারের মতো রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী দলটি আজ সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান, যিনি এই ভূমিধস বিজয়ের মূল কারিগর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
গেজেট ও আসন সংক্রান্ত তথ্য:
গেজেটে প্রকাশিত ২৯৬ জন এমপির শপথ আজ সকালে অনুষ্ঠিত হবে। ৩০০ আসনবিশিষ্ট সংসদের ২৯৯টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও দুটি আসনের (চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪) ফলাফলের গেজেট এখনও হয়নি। এছাড়া, জামায়াতের প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসনে জয়ী তারেক রহমান নিয়ম অনুযায়ী বগুড়া-৬ আসনটি ছেড়ে দিয়েছেন এবং আজ ঢাকা-১৭ আসনের এমপি হিসেবে শপথ নেবেন।
শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা:
এমপিদের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন। সংবিধান অনুযায়ী, বিদায়ী সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে শপথ পড়াতে অপারগ হলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এই দায়িত্ব পালন করবেন। এক্ষেত্রে, বিদায়ী স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করায় এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু খুনের মামলায় জেলে থাকায় তারা শপথ পড়াতে পারবেন না। নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের শপথ পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করবেন নবনিযুক্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি।
সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচন ও সরকার আমন্ত্রণ:
সকালে এমপিদের শপথ গ্রহণ শেষে বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন দল ও জোটের এমপিরা বৈঠক করে তাদের সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচন করবেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের দলনেতাকে রাষ্ট্রপতি সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাবেন। বিএনপির কয়েকটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, তারা দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচন করতে যাচ্ছে। এর ফলে, রাষ্ট্রপতি তারেক রহমানকে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি দেবেন এবং তিনি তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের তালিকা জমা দেবেন।
প্রাথমিক মন্ত্রিসভা ও জোটের শরিকদের সম্ভাবনা:
প্রাথমিকভাবে, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৩০ জন শপথ নিতে পারেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানাচ্ছে। সদ্য অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপির ২০৯ জন এমপি নির্বাচিত হন। এর মধ্যে তারেক রহমানের পদত্যাগের কারণে বগুড়া-৬ আসনটি শূন্য হয়েছে। এছাড়া, চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের গেজেট প্রকাশ স্থগিত রয়েছে। বিএনপি তাদের সংসদীয় দলের সভায় জোটের শরিক বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি এবং গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকেও আমন্ত্রণ জানাতে পারে। এই তিনজন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন।
বিরোধী দল ও অন্যান্য পদ:
বিএনপি সংসদীয় দলের সভায় নেতা নির্বাচনের পাশাপাশি উপনেতা (মন্ত্রী মর্যাদার), চিফ হুইপ এবং ছয়জন হুইপ নির্বাচন করার কথা রয়েছে। সংসদ উপনেতা হিসেবে সালাহউদ্দিন আহমেদের নাম শোনা যাচ্ছে। বিরোধী দলের আসনে বসা জামায়াত জোট তাদের সংসদীয় দলের সভায় জোটের শরিকদের আমন্ত্রণ জানাবে এবং সেখানে বিরোধীদলীয় নেতা, উপনেতা ও চিফ হুইপ ও হুইপ নির্বাচন করা হবে।
নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ:
নতুন সরকার ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে যাচ্ছেন। তিনি নিজেও এই পথকে অত্যন্ত প্রতিকূল ও কঠিন বলে অভিহিত করেছেন। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হলে একটি দক্ষ ও যোগ্য মন্ত্রিসভা গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে অর্থ, পররাষ্ট্র এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোতে পেশাদার ও যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিতে হবে। বিগত শাসনামলে দেশের অর্থনীতি, জ্বালানি খাত ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে বলে তারেক রহমান উল্লেখ করেছেন। বর্তমান উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, ব্যাংক খাতের সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সামলানো হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এছাড়া, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, দুর্নীতি দমন, মেধার গুরুত্ব প্রদান, পররাষ্ট্র নীতিতে ভারসাম্য রক্ষা, বিনিয়োগ আকর্ষণ, বেকারত্ব ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকেও গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
জিয়া পরিবারের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক উত্তরাধিকার:
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন। তার স্ত্রী খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এবার তাদের বড় ছেলে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন। বাবা-মায়ের পর এবার সন্তান রাষ্ট্রক্ষমতায় বসতে যাচ্ছেন, যা বিশ্বে বিরল এবং গৌরবের ঘটনা।
ব্যতিক্রমী শপথ অনুষ্ঠান:
সাধারণত বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত হওয়া সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান এবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজন করা হচ্ছে। এটি একটি ব্যতিক্রমী আয়োজন।
আন্তর্জাতিক নেতাদের উপস্থিতি:
তারেক রহমানের সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে ভারত, পাকিস্তানসহ সার্কভুক্ত দেশ এবং চীন, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরবসহ বেশ কিছু মুসলিম দেশের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মদ মইজ্জু, ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা, পাকিস্তানের পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবাল, শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্য ও গণমাধ্যম মন্ত্রী ড. নালিন্দা জয়াতিষা, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা অনুষ্ঠানে যোগদানের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়া, সরকারি ও বিরোধী দলের এমপি, রাজনৈতিক দলের নেতা, বিচারপতি, কূটনৈতিক মিশনের সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান, সাংবাদিকসহ প্রায় এক হাজার ২০০ জন গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত থাকবেন।
বিএনপি’র রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার ইতিহাস:
১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত পাঁচবার রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। ১৯৭৯ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৮২ সাল পর্যন্ত দলটি ক্ষমতায় ছিল। ১৯৮২ সালের পর বিচারপতি আবদুস সাত্তারের নেতৃত্বে দলটি আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়লাভ করলেও তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। এরপর ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ সংসদের নির্বাচনে এবং ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। ২০০১-০৬ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তৃতীয়বারের মতো দেশ পরিচালনা করেন খালেদা জিয়া। প্রায় দুই দশক পর ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে বিএনপি আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরছে।
উপমহাদেশের রাজনীতিতে দ্বিতীয় নজির:
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান – এই পরিবারের সদস্যদের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান হওয়ার নজির উপমহাদেশে দ্বিতীয়। এর আগে শ্রীলঙ্কায় বন্দরনায়েক পরিবারে এমন নজির দেখা গিয়েছিল। এছাড়াও, ভারতে নেহরু-গান্ধী পরিবার এবং পাকিস্তানে ভুট্টো-জারদারি পরিবারেও এমন রাজনৈতিক উত্তরাধিকার দেখা গেছে।
রিপোর্টারের নাম 























