চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কারের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শেষে জাতির উদ্দেশে বিদায়ী ভাষণ দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি জানিয়েছেন, নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে গত কয়েক মাসে প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন এবং প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ৮৪ শতাংশ আদেশ বাস্তবায়িত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধান উপদেষ্টা তাঁর ভাষণে জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল নাগরিক অধিকার সংহত করা এবং বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো। গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতি যেন এ দেশে আর কখনো ফিরে আসতে না পারে, সেই লক্ষ্যেই এসব সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, কোনো প্রকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, বরং মানবতাবিরোধী অপরাধ ও দুর্নীতির বিচার প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছতার সাথে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভঙ্গুর প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করা হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে না পারে।
রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সংস্কারের চিত্র তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থার অভাব এবং অনেক থানা পুলিশশূন্য থাকলেও ধাপে ধাপে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান পুলিশ বাহিনী আর মারণাস্ত্র ব্যবহার করে না বা বেআইনিভাবে কাউকে তুলে নিয়ে যায় না। একটি জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক বাহিনী গড়ে তোলার লক্ষে ‘পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫’ প্রণয়ন করা হয়েছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পৃথক সচিবালয় গঠন, বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনে প্রয়োজনীয় সংস্কারের কথা উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি জানান, মাজদার হোসেন মামলার রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিচার বিভাগের প্রকৃত পৃথকীকরণ নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে গুমকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার সুরক্ষায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন ও সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ জারির বিষয়টিও তিনি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন।
বিদায়ী ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের সাফল্যকে গণতন্ত্রের নতুন অভিযাত্রা হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে, যা নতুন বাংলাদেশের জন্মের পথে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।
এই অর্জনের কৃতিত্ব জুলাই বিপ্লবের বীর শহীদ ও আহতদের উৎসর্গ করে ড. ইউনূস বলেন, তরুণ প্রজন্মের অভূতপূর্ব ত্যাগ ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব হতো না। রাষ্ট্র সংস্কারের এই কঠিন পথে রাজনৈতিক দলসমূহ, সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসনের সকল স্তরের কর্মকর্তাদের আন্তরিক সহযোগিতার জন্য তিনি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সংস্কারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আর কখনো মানবাধিকারহীন রাষ্ট্রে পরিণত হবে না।
রিপোর্টারের নাম 






















