একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলাকালে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক সহিংসতা, কেন্দ্র দখল, পোলিং এজেন্টদের বাধা, ব্যালট ছিনতাই ও ককটেল বিস্ফোরণের মতো গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বৃহস্পতিবার দুপুর ২টার দিকে বাংলামোটরে এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব মনিরা শারমিন এসব অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি জানান, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনে তারা এই নির্বাচন বর্জন বা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন।
সংবাদ সম্মেলনে মনিরা শারমিন বলেন, ঢাকা-১৮ আসনের উত্তরা হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ধানের শীষের পোলিং এজেন্টরা দলীয় কার্ড ঝুলিয়ে ভোটকক্ষে অবস্থান নেন, যা নির্বাচনি বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। একই আসনের খিলক্ষেত থানার নিকুঞ্জে অবস্থিত জান-ই-আলম স্কুল কেন্দ্রে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে নারী ভোটারদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগও ওঠে। কুমিল্লার একটি কেন্দ্রে এক কক্ষে একাধিক পোলিং এজেন্ট থাকার খবর গণমাধ্যমে সম্প্রচারিত হয়েছে, যা বিধি অনুযায়ী সম্পূর্ণ অবৈধ। নিয়ম অনুযায়ী, একজন প্রার্থীর পক্ষে একটি কক্ষে একজন পোলিং এজেন্ট থাকার বিধান রয়েছে। এছাড়া ঢাকা-১৭ আসনে পোলিং এজেন্টের অনুপস্থিতিতে ব্যালটে সিল মারার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই অভিযোগ সত্য হলে এর দায় তারেক রহমানকে নিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এনসিপির এই নেতা আরও জানান, ঢাকা-৮ আসনের মির্জা আব্বাস মহিলা ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে এনসিপি প্রার্থী নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীর পোলিং এজেন্টকে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে। পাবনা-১ আসনেও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর এজেন্টকে কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে এনসিপি প্রার্থী মো. আতাউল্লাহর চিফ এজেন্টকে জোর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তিনি নোয়াখালীর হাতিয়ায় একাধিক সহিংসতার ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেন, সেখানে এনসিপি প্রার্থী হান্নান মাসউদের স্ত্রী ও ভাইকে মারধর করা হয়েছে এবং তাদের মোবাইল ফোন ভাঙচুর করা হয়েছে। একই এলাকায় সাংবাদিক মিরাজ উদ্দিন দায়িত্ব পালনকালে হামলার শিকার হন। হাতিয়ার নলচিরা ইউনিয়নে ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, মুন্সীগঞ্জ-৩ এবং গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার দুটি কেন্দ্রে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। গোপালগঞ্জে এই বিস্ফোরণে দুই আনসার সদস্যসহ এক শিশু আহত হয়েছে।
মনিরা শারমিন আরও বলেন, শেরপুর-১ আসনে ব্যালট বই ছিনতাইয়ের অভিযোগ ওঠে, পরে প্রশাসন সিল মারা শতাধিক ব্যালট উদ্ধার করে। ঢাকা-১৮ ও সিরাজগঞ্জ-১ আসনে একাধিক ভোটার অভিযোগ করেছেন যে, কেন্দ্রে গিয়ে তারা জানতে পারেন তাদের ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে। টাঙ্গাইল-৮ আসনে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ব্যালটে নির্দিষ্ট প্রতীকে সিল মেরে দিচ্ছেন—এমন গুরুতর অভিযোগও তোলা হয়। পিরোজপুর-৩ আসনে জোর করে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়াও, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে ভুয়া পোলিং এজেন্টের উপস্থিতি, নাটোর ও যশোরে সাংবাদিক ও সমর্থকদের ওপর হামলা, গাজীপুরে নারী ভোটারদের মারধর এবং মেহেরপুরে বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটার ও এজেন্টদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে। ঢাকা-২০ আসনে কেন্দ্র দখল ও বুথ উৎখাতের অভিযোগও তুলেছে এনসিপি।
এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব অভিযোগ করে বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং পুলিশ প্রশাসনের কাছ থেকে প্রত্যাশিত দায়িত্বশীল আচরণ পাওয়া যাচ্ছে না। প্রার্থীরা লিখিত অভিযোগ দিলেও কোনো কার্যকর সমাধান মিলছে না। বিভিন্ন স্থানে ভোট কারচুপি এবং ‘ইলেকট্রন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি সতর্ক করে দেন, এভাবে কোনো দল জোর করে ক্ষমতায় আসতে চাইলে সাধারণ জনগণ তা মেনে নেবে না। এ সময় তিনি বিএনপির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, তারা মুখে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণা চালালেও গোপনে এবং সরাসরি ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের ‘না’ ভোট দেওয়ার জন্য প্রভাবিত করছে।
মনিরা শারমিন দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, জাতীয় নাগরিক পার্টি পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে এবং প্রয়োজনে তারা এই নির্বাচন বয়কট বা প্রত্যাখ্যানের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে।
রিপোর্টারের নাম 

























