ঢাকা ০৬:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬

ভোটাধিকার হরণের তিন অধ্যায়: শেখ হাসিনা আমলের ‘সাজানো’ নির্বাচনের ব্যবচ্ছেদ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:০২:২৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে গত দেড় দশকে তিনটি বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করেছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে জনগণের ভোটাধিকার হরণের মাধ্যমে এসব নির্বাচনকে একটি ‘সুপরিকল্পিত ও সাজানো নাটকে’ পরিণত করা হয়েছিল। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিগত তিনটি নির্বাচনে কারচুপির যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল নজিরবিহীন নয় বরং বৈশ্বিক মানদণ্ডেও বিস্ময়কর। জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশনের মতে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতেই এই বিশেষ বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।

২০১৪: বিনা ভোটের কলঙ্কিত অধ্যায়
উচ্চ আদালতের রায়ের দোহাই দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দলীয় সরকারের অধীনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মুখে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে ‘নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার’ নামক এক অভিনব ধারণা সামনে আনা হয়। তবে বাস্তব চিত্র ছিল অত্যন্ত নগ্ন; ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩ আসনেই ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন। দেশের অর্ধেক ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগই পাননি। তৎকালীন কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন কমিশন এই প্রহসনকে বৈধতা দিলেও জনমনে তা ‘বিনা ভোটের নির্বাচন’ হিসেবে কুখ্যাতি পায়। সে সময় খোদ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ভোট দেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি, যা গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক বিরল ও হাস্যকর দৃষ্টান্ত।

২০১৮: ‘নিশি রাতের’ মহাজালিয়াতি
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব দল অংশ নিলেও ভোটের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভর্তি করার এক নতুন অপকৌশল বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করে। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের এই নির্বাচনটি ‘নিশি রাতের ভোট’ হিসেবে পরিচিতি পায়। তৎকালীন কেএম নূরুল হুদা কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ২৯৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট ২৮৮টি আসন দখল করে। নির্বাচনের কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলে দেখা যায়, ১০৩টি আসনের ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে, যা পরিসংখ্যানগতভাবে অসম্ভব। মৃত ব্যক্তি ও প্রবাসীদের ভোটও সেদিন ব্যালট বাক্সে জমা পড়েছিল। এছাড়া ইভিএম ক্রয়ের নামে তিন হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগও ওঠে এই কমিশনের বিরুদ্ধে। প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে বিরোধী পক্ষকে মাঠছাড়া করার মাধ্যমে এই সাজানো বিজয় নিশ্চিত করা হয়েছিল।

২০২৪: ‘আমি-ডামি’ ও পাতানো প্রতিদ্বন্দ্বিতা
গত ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি ছিল জালিয়াতির সর্বশেষ সংস্করণ। বিএনপিসহ প্রধান বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করলে কৃত্রিম প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখাতে আওয়ামী লীগ তার নিজ দলের নেতাদেরই ‘স্বতন্ত্র’ বা ‘ডামি প্রার্থী’ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়। ৪৪টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ১৬টি দলই এই নির্বাচন বর্জন করে। নির্বাচনের দিন বেলা ৩টা পর্যন্ত ২৭ দশমিক ১৫ শতাংশ ভোট পড়ার তথ্য দিলেও মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল বিস্ময়করভাবে ৪০ শতাংশ ভোট পড়ার ঘোষণা দেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২২৪টি আসন পায় এবং দলটির সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৬২টি আসনে জয়ী হন। মূলত এটি ছিল নিজেদের মধ্যে একটি পাতানো খেলা, যা আইনি ও নৈতিক কোনো মানদণ্ডেই গ্রহণযোগ্য ছিল না।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই তিনটি নির্বাচনে যে মাত্রায় জালিয়াতি হয়েছে, তার পরিণতি ছিল প্রলয়ঙ্কারী। তদন্ত কমিশনের মতে, শেখ হাসিনার একক সিদ্ধান্তে এবং প্রশাসন, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার একাংশের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এই নির্বাচনি অপরাধগুলো সংঘটিত হয়েছে। কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই হয়ে উঠেছিল নির্বাচন পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি, যার একমাত্র লক্ষ্য ছিল যেকোনো মূল্যে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কাতারে মোসাদের গোপন তৎপরতা: দোহা অস্বীকার করলো অবগত থাকার তথ্য

ভোটাধিকার হরণের তিন অধ্যায়: শেখ হাসিনা আমলের ‘সাজানো’ নির্বাচনের ব্যবচ্ছেদ

আপডেট সময় : ১২:০২:২৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে গত দেড় দশকে তিনটি বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করেছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে জনগণের ভোটাধিকার হরণের মাধ্যমে এসব নির্বাচনকে একটি ‘সুপরিকল্পিত ও সাজানো নাটকে’ পরিণত করা হয়েছিল। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিগত তিনটি নির্বাচনে কারচুপির যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল নজিরবিহীন নয় বরং বৈশ্বিক মানদণ্ডেও বিস্ময়কর। জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশনের মতে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতেই এই বিশেষ বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।

২০১৪: বিনা ভোটের কলঙ্কিত অধ্যায়
উচ্চ আদালতের রায়ের দোহাই দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দলীয় সরকারের অধীনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মুখে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে ‘নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার’ নামক এক অভিনব ধারণা সামনে আনা হয়। তবে বাস্তব চিত্র ছিল অত্যন্ত নগ্ন; ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩ আসনেই ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন। দেশের অর্ধেক ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগই পাননি। তৎকালীন কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন কমিশন এই প্রহসনকে বৈধতা দিলেও জনমনে তা ‘বিনা ভোটের নির্বাচন’ হিসেবে কুখ্যাতি পায়। সে সময় খোদ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ভোট দেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি, যা গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক বিরল ও হাস্যকর দৃষ্টান্ত।

২০১৮: ‘নিশি রাতের’ মহাজালিয়াতি
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব দল অংশ নিলেও ভোটের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভর্তি করার এক নতুন অপকৌশল বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করে। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের এই নির্বাচনটি ‘নিশি রাতের ভোট’ হিসেবে পরিচিতি পায়। তৎকালীন কেএম নূরুল হুদা কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ২৯৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট ২৮৮টি আসন দখল করে। নির্বাচনের কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলে দেখা যায়, ১০৩টি আসনের ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে, যা পরিসংখ্যানগতভাবে অসম্ভব। মৃত ব্যক্তি ও প্রবাসীদের ভোটও সেদিন ব্যালট বাক্সে জমা পড়েছিল। এছাড়া ইভিএম ক্রয়ের নামে তিন হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগও ওঠে এই কমিশনের বিরুদ্ধে। প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে বিরোধী পক্ষকে মাঠছাড়া করার মাধ্যমে এই সাজানো বিজয় নিশ্চিত করা হয়েছিল।

২০২৪: ‘আমি-ডামি’ ও পাতানো প্রতিদ্বন্দ্বিতা
গত ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি ছিল জালিয়াতির সর্বশেষ সংস্করণ। বিএনপিসহ প্রধান বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করলে কৃত্রিম প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখাতে আওয়ামী লীগ তার নিজ দলের নেতাদেরই ‘স্বতন্ত্র’ বা ‘ডামি প্রার্থী’ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়। ৪৪টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ১৬টি দলই এই নির্বাচন বর্জন করে। নির্বাচনের দিন বেলা ৩টা পর্যন্ত ২৭ দশমিক ১৫ শতাংশ ভোট পড়ার তথ্য দিলেও মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল বিস্ময়করভাবে ৪০ শতাংশ ভোট পড়ার ঘোষণা দেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২২৪টি আসন পায় এবং দলটির সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৬২টি আসনে জয়ী হন। মূলত এটি ছিল নিজেদের মধ্যে একটি পাতানো খেলা, যা আইনি ও নৈতিক কোনো মানদণ্ডেই গ্রহণযোগ্য ছিল না।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই তিনটি নির্বাচনে যে মাত্রায় জালিয়াতি হয়েছে, তার পরিণতি ছিল প্রলয়ঙ্কারী। তদন্ত কমিশনের মতে, শেখ হাসিনার একক সিদ্ধান্তে এবং প্রশাসন, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার একাংশের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এই নির্বাচনি অপরাধগুলো সংঘটিত হয়েছে। কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই হয়ে উঠেছিল নির্বাচন পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি, যার একমাত্র লক্ষ্য ছিল যেকোনো মূল্যে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা।