ঢাকা ০৮:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬

১৯৯৬ সালের দুই সংসদ নির্বাচন: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৩০:১২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ১২ বার সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে আগামী বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৯৬ সাল এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। সে বছর মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে দু’বার সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা কেবল ক্ষমতার পালাবদলই ঘটায়নি, বরং দীর্ঘ ২১ বছর পর একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পথ খুলে দিয়েছিল।

১৯৯৬ সালের এই ঘটনাবহুল পরিস্থিতির সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৯৪ সালের মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে। এই আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আছাদুজ্জামানের মৃত্যুর পর উপনির্বাচনের আয়োজন করে ক্ষমতাসীন বিএনপি। সেই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী কাজী সলিমুল হক বিজয়ী হলেও, প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ কারচুপি ও ব্যাপক সন্ত্রাসের অভিযোগ তোলে।

এই উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করেই বিরোধী দলগুলো একযোগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তুমুল আন্দোলন শুরু করে। ১৯৯৪ সালের ২৭ জুন আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটি রূপরেখা প্রকাশ করে। আন্দোলনের তীব্রতা বাড়লে একই বছরের ২৮ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী ও এনডিপির সংসদ সদস্যরা একযোগে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। যদিও স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী তাদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে টানা ৯০ দিন অনুপস্থিতি দেখিয়ে ১৯৯৫ সালের ৩১ জুলাই আসনগুলো শূন্য ঘোষণা করেন। এর মধ্যেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত থাকে।

আন্দোলন ও সহিংসতা যখন তুঙ্গে, তখন ১৯৯৫ সালের ২৪ নভেম্বর পঞ্চম সংসদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে তফসিল জারি করে নির্বাচন কমিশন। এই নির্বাচন ছিল একতরফা ও তীব্র সহিংসতাপূর্ণ। টানা ৪৮ ঘণ্টার হরতালের মধ্যে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল নগণ্য। বিএনপি ছাড়া দেশের প্রধান সব রাজনৈতিক দল এই নির্বাচন বর্জন করে।

এই নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করে এবং ১৯ মার্চ সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। তবে ৮ মার্চ থেকেই বিরোধী তিন দল লাগাতার সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলনের মুখে ২১ মার্চ সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল উত্থাপন করা হয়, যা পরবর্তীতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী হিসেবে পাস হয়।

অবশেষে ৩০ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন এবং ষষ্ঠ সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। একই দিনে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় অসহযোগ আন্দোলন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ৬ এপ্রিল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বিচারপতি একেএম সাদেক পদত্যাগ করেন। ৮ এপ্রিল সাবেক সচিব মোহাম্মদ আবু হেনা নতুন সিইসি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২৭ এপ্রিল সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় এবং ১২ জুন ভোটের তারিখ নির্ধারিত হয়।

১৯৯৬ সালের ১২ জুনের সেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল উৎসবমুখর পরিবেশে, যদিও কিছু বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছিল। এই ঐতিহাসিক নির্বাচনে বিপুল জয় পেয়ে দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতার মসনদে ফেরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসন, বিএনপি ১১৬টি আসন, জাতীয় পার্টি ৩২টি আসন এবং জামায়াতে ইসলামী ৩টি আসন লাভ করে। জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে ২৩ জুন সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৯৬ সাল তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে আছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক পথচলায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সিটি কর্পোরেশনের ৪৭০ কোটি টাকার বিল বকেয়া: নতুন প্রশাসকদের কঠিন চ্যালেঞ্জ

১৯৯৬ সালের দুই সংসদ নির্বাচন: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়

আপডেট সময় : ১০:৩০:১২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ১২ বার সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে আগামী বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৯৬ সাল এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। সে বছর মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে দু’বার সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা কেবল ক্ষমতার পালাবদলই ঘটায়নি, বরং দীর্ঘ ২১ বছর পর একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পথ খুলে দিয়েছিল।

১৯৯৬ সালের এই ঘটনাবহুল পরিস্থিতির সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৯৪ সালের মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে। এই আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আছাদুজ্জামানের মৃত্যুর পর উপনির্বাচনের আয়োজন করে ক্ষমতাসীন বিএনপি। সেই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী কাজী সলিমুল হক বিজয়ী হলেও, প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ কারচুপি ও ব্যাপক সন্ত্রাসের অভিযোগ তোলে।

এই উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করেই বিরোধী দলগুলো একযোগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তুমুল আন্দোলন শুরু করে। ১৯৯৪ সালের ২৭ জুন আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটি রূপরেখা প্রকাশ করে। আন্দোলনের তীব্রতা বাড়লে একই বছরের ২৮ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী ও এনডিপির সংসদ সদস্যরা একযোগে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। যদিও স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী তাদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে টানা ৯০ দিন অনুপস্থিতি দেখিয়ে ১৯৯৫ সালের ৩১ জুলাই আসনগুলো শূন্য ঘোষণা করেন। এর মধ্যেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত থাকে।

আন্দোলন ও সহিংসতা যখন তুঙ্গে, তখন ১৯৯৫ সালের ২৪ নভেম্বর পঞ্চম সংসদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে তফসিল জারি করে নির্বাচন কমিশন। এই নির্বাচন ছিল একতরফা ও তীব্র সহিংসতাপূর্ণ। টানা ৪৮ ঘণ্টার হরতালের মধ্যে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল নগণ্য। বিএনপি ছাড়া দেশের প্রধান সব রাজনৈতিক দল এই নির্বাচন বর্জন করে।

এই নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করে এবং ১৯ মার্চ সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। তবে ৮ মার্চ থেকেই বিরোধী তিন দল লাগাতার সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলনের মুখে ২১ মার্চ সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল উত্থাপন করা হয়, যা পরবর্তীতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী হিসেবে পাস হয়।

অবশেষে ৩০ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন এবং ষষ্ঠ সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। একই দিনে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় অসহযোগ আন্দোলন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ৬ এপ্রিল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বিচারপতি একেএম সাদেক পদত্যাগ করেন। ৮ এপ্রিল সাবেক সচিব মোহাম্মদ আবু হেনা নতুন সিইসি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২৭ এপ্রিল সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় এবং ১২ জুন ভোটের তারিখ নির্ধারিত হয়।

১৯৯৬ সালের ১২ জুনের সেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল উৎসবমুখর পরিবেশে, যদিও কিছু বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছিল। এই ঐতিহাসিক নির্বাচনে বিপুল জয় পেয়ে দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতার মসনদে ফেরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসন, বিএনপি ১১৬টি আসন, জাতীয় পার্টি ৩২টি আসন এবং জামায়াতে ইসলামী ৩টি আসন লাভ করে। জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে ২৩ জুন সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৯৬ সাল তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে আছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক পথচলায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।