স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত মোট ১২টি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে অধিকাংশেরই স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এই প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের ধারার সূচনা হয় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। নবগঠিত স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রথম সেই নির্বাচনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে ব্যাপক ও নজিরবিহীন কারচুপির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ ছিল, ভোট জালিয়াতির মাধ্যমে কার্যত বিরোধী দলবিহীন একটি সংসদ গঠন করা হয়, যা সদ্য স্বাধীন দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার যাত্রাকে শুরুতেই হোঁচট খাওয়ায়।
দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র এক বছরের মাথায় অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচন বেশ কিছু বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দেয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল একটি নির্দিষ্ট প্রার্থীকে বিজয়ী করার উদ্দেশ্যে ব্যালট বাক্স ঢাকায় নিয়ে আসার মতো ঘটনা। এছাড়াও, অনেক আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। বিরোধী দলের প্রার্থীরা যেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দিতে না পারেন, সেজন্য তাদের অপহরণ বা বাধা দেওয়ার মতো অভিযোগও উঠেছিল।
১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশের নতুন সংবিধান কার্যকর হওয়ার পরপরই ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। মুক্তিযুদ্ধের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল এই নির্বাচনেও সরকার গঠন করবে, এ নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে কোনো সংশয় ছিল না। তবে, তাদের মতে, সেই নির্বাচনেই ব্যাপক অনিয়ম, কারচুপি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সূচনা হয়। গবেষক ও বিশ্লেষকরা মনে করেন, জয়ের ব্যবধান বাড়ানো এবং পছন্দের প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করা হয়েছিল।
প্রায় একতরফা ফলাফল
নির্বাচনের ফলাফল ছিল প্রায় একতরফা। ১৯৭৩ সালের এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলসহ মোট ১৪টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট এক হাজার ৮৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এত বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর অংশগ্রহণের পরও দেখা যায়, ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৩টিতেই জয়লাভ করে ক্ষমতাসীন দল। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ও বাংলাদেশ জাতীয় লীগের একজন করে প্রার্থী এবং পাঁচটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এমন বিশাল একটি নির্বাচনে কার্যত কোনো কার্যকর বিরোধী দলের অনুপস্থিতিকে অস্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেন।
কুমিল্লা-৯ (দাউদকান্দি) আসন: সবচেয়ে আলোচিত বিতর্ক
১৯৭৩ সালের নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল কুমিল্লা-৯ (দাউদকান্দি) আসনের ফলাফল। এই আসনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী ছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ, যিনি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা যায়, খন্দকার মোশতাক আহমেদ ৫২,৪১৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন, যেখানে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী রশিদ ইঞ্জিনিয়ার পান ৩৬,৬৩০ ভোট। বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এই ঘটনাকে অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়
দেশের প্রথম সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান নিজে দুটি আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এছাড়াও সোহরাব হোসেন, তোফায়েল আহমেদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, জিল্লুর রহমানসহ ক্ষমতাসীন দলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতা এই নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন।
কার্যত বিরোধী দলবিহীন সংসদ
নির্বাচনের আগে এমনকি সরকার সমর্থিত সংবাদমাধ্যমগুলোও পূর্বাভাস দিয়েছিল যে, বিরোধী দলগুলো অন্তত ১৫ থেকে ২০টি আসনে জয়লাভ করতে পারে। তবে ফলাফলে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন দল প্রায় সব আসনেই বিজয়ী হয়েছে। ওই সময়ের একটি দৈনিক আটই মার্চ তাদের শিরোনামে লিখেছিল— ‘নির্বাচন প্রহসনে পরিণত’। তৎকালীন ন্যাপ নেতা মোজাফফর আহমদ অভিযোগ করেছিলেন যে, সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে অন্তত ৭০টি আসনের ফলাফল পরিবর্তন করা হয়েছিল।
রিপোর্টারের নাম 



















