ঢাকা ০৫:৪৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কী

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:৪১:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

## নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিং: গণতন্ত্রের পথে এক বিতর্কিত অধ্যায়

ঢাকা: আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে “নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিং” বা “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” শব্দটির ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে। প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা এই শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তাদের আশঙ্কা, কোনো একটি মহল এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারে। দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ প্রায় সব প্রধান রাজনৈতিক দলই এই আশঙ্কার কথা বারবার উচ্চারণ করছে। শুধু রাজনৈতিক নেতারাই নন, খোদ নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও এই ধরনের অপচেষ্টা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। এমনকি সরকারি চাকরির পরীক্ষাতেও “বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে কী বুঝায়” এমন প্রশ্ন দেখা গেছে, যা এই শব্দটির গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতাকেই তুলে ধরে। কিন্তু এই “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” আসলে কী? এর সঙ্গে জড়িত অতীত নির্বাচনের বিতর্কগুলোই বা কী?

ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বরূপ

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিপ্পা নরিসের ২০১২ সালে প্রকাশিত “ইলেক্টোরাল ইঞ্জিনিয়ারিং: ভোটিং রুলস অ্যান্ড পলিটিক্যাল বিহেভিয়ার” শীর্ষক গ্রন্থে এই ধারণাটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। অধ্যাপক নরিসের মতে, ইলেকটোরাল ইঞ্জিনিয়ারিং হলো “আনুষ্ঠানিক সকল নির্বাচনি নিয়মের পরিবর্তন”। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক দল, রাজনীতিবিদ এবং জনগণের কৌশলগত আচরণকে প্রভাবিত করে বড় ধরনের পরিণতি তৈরি করার ক্ষমতা রাখে। সহজ ভাষায়, এই পদ্ধতি ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে এমনভাবে সাজানো হয় যাতে পূর্বনির্ধারিত কোনো পক্ষের জয় নিশ্চিত করা যায়। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে এর প্রয়োগ দেখা গেলেও, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি গণতন্ত্রের জন্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, এই শব্দটি প্রায়শই নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে নির্বাচনকে “ম্যানিপুলেট” করার জন্যই এই প্রক্রিয়ার ব্যবহার প্রচলিত। এর মধ্যে রয়েছে ভোট গণনায় কারচুপি, ভোটার তালিকায় ভুয়া ভোটার অন্তর্ভুক্ত করা, প্রতিপক্ষের ভোটারদের ভোটদানে বাধা দেওয়া বা জোরপূর্বক ভোট দেওয়ানো, ব্যালট বাক্স চুরি, পোলিং এজেন্টদের বাধা দেওয়া ইত্যাদি। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ জানান, ক্ষমতাধর প্রায় সব রাজনৈতিক দলই এই প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে চায়; যাদের ক্ষমতা বেশি, তারা এটি করতে সক্ষম হয়।

বাংলাদেশের নির্বাচনে নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নজির

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” শব্দটি পরিচিতি লাভ করে মূলত ২০০০ সালের পর থেকে। তবে এর আগেও বিভিন্ন নামে বা ভিন্ন আঙ্গিকে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার ঘটনা ঘটেছে।

১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন: বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন থেকেই নির্বাচনী প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে। খন্দকার মোশতাক আহমেদকে জেতানোর জন্য ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ ছিল। এমনকি, একজন প্রার্থীকে জেতানোর জন্য হেলিকপ্টারে করে ব্যালট পেপার ঢাকায় নিয়ে আসার মতো ঘটনাও ঘটেছিল বলে জানা যায়। কুমিল্লার দাউদকান্দি আসনে এই নির্বাচনটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছিল।

গণভোটের বিতর্ক: বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত তিনটি গণভোটের মধ্যে প্রথম দুটি সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৭৭ সালের ৩০ মে এবং ১৯৮৫ সালে অনুষ্ঠিত এই গণভোটগুলোতে “হ্যাঁ”-তে অস্বাভাবিক উচ্চ শতাংশ ভোট পড়ার ঘটনাকে অনেকেই নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উদাহরণ হিসেবে দেখেন। সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারীদের নিজেদের শাসনকে বৈধতা দেওয়ার জন্যই এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

১৯৮৬ সালের নির্বাচন (‘মিডিয়া ক্যু’): সাবেক সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ কর্তৃক আয়োজিত এই নির্বাচনটি “মিডিয়া ক্যু” নামে পরিচিত। নির্বাচনের সময় গণমাধ্যমে খবর প্রচার দুদিনের জন্য বন্ধ করে ফলাফল পাল্টে ফেলার অভিযোগ ছিল। এই ঘটনাকে নির্বাচনী ফলাফলকে প্রভাবিত করার একটি সূক্ষ্ম কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

১৯৯১ সালের নির্বাচন (‘সূক্ষ্ম কারচুপি’): নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করলেও, আওয়ামী লীগ একে “সূক্ষ্ম কারচুপি” হিসেবে অভিহিত করে। তাদের অভিযোগ ছিল, অগণতান্ত্রিক শক্তি কালো টাকা, সন্ত্রাস এবং অদৃশ্য শক্তির ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ভোটের রায়কে প্রভাবিত করেছে।

১৯৯৬ সালের নির্বাচন (‘পুকুর নয় সাগর চুরি’): ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনটি একতরফাভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং তীব্র আন্দোলনের মুখে বিএনপি সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আসন সংখ্যার বিচারে জোরালো লড়াই হলেও, বিএনপির পক্ষ থেকে “পুকুর নয়, সাগর চুরি”র অভিযোগ আনা হয়।

২০০১ সালের নির্বাচন (‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ শব্দের ব্যবহার): ২০০১ সালের নির্বাচনের ফলাফলের পরই বাংলাদেশে “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” শব্দটির ব্যবহার ব্যাপকভাবে শুরু হয়। বিএনপি-জামায়াত জোটের বিজয়ের পর আওয়ামী লীগ সরাসরি এই অভিযোগ তোলে যে, নির্বাচনে স্থূল কারচুপি করে জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

২০০৮ সালের নির্বাচন: যদিও এই নির্বাচনকে অনেক বিশ্লেষক গ্রহণযোগ্য মনে করেন, তবুও বিএনপি এই নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল। ভোটার তালিকায় মৃত ও প্রবাসী ব্যক্তিদের নাম থাকা এবং তাদের ভোটে কারচুপির অভিযোগ ছিল।

২০১৪ সালের নির্বাচন (‘তামাসার নির্বাচন’): তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এই নির্বাচন বর্জন করে। ফলে ১৫৩টি আসনে কোনো ভোট গ্রহণ ছাড়াই আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ভোটারদের অনুপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। এই নির্বাচনকে “তামাসার নির্বাচন” হিসেবে অভিহিত করা হয়।

২০১৮ সালের নির্বাচন (‘রাতের ভোট’): এই নির্বাচনে দিনের ভোট রাতে ব্যালট বাক্সে ভরে ফেলার মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে। ভোটের আগের রাতেই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের ভোটকেন্দ্র দখল এবং ব্যালট বাক্স ভরে রাখার অভিযোগ ওঠে। নির্বাচন কমিশন এই অনিয়মগুলোর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালের নির্বাচন (‘আমি আর ডামি’): এই নির্বাচনেও নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নানা নজির দেখা গেছে। বিএনপির অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দাঁড় করানো এবং “আমি আর ডামি” শব্দগুচ্ছের ব্যবহার এই নির্বাচনকে বিতর্কিত করে তোলে। স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অতিরিক্ত তৎপরতা এবং ভোটার উপস্থিতি কম থাকা এই নির্বাচনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

এই দীর্ঘ ইতিহাস বলে দেয়, “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” শুধু একটি শব্দ নয়, বরং বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি বিতর্কিত অনুষঙ্গ। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্য এই ধারা থেকে উত্তরণ অত্যন্ত জরুরি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতে ইরানের পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রতি কড়া বার্তা

ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কী

আপডেট সময় : ০৬:৪১:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

## নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিং: গণতন্ত্রের পথে এক বিতর্কিত অধ্যায়

ঢাকা: আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে “নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিং” বা “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” শব্দটির ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে। প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা এই শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তাদের আশঙ্কা, কোনো একটি মহল এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারে। দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ প্রায় সব প্রধান রাজনৈতিক দলই এই আশঙ্কার কথা বারবার উচ্চারণ করছে। শুধু রাজনৈতিক নেতারাই নন, খোদ নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও এই ধরনের অপচেষ্টা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। এমনকি সরকারি চাকরির পরীক্ষাতেও “বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে কী বুঝায়” এমন প্রশ্ন দেখা গেছে, যা এই শব্দটির গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতাকেই তুলে ধরে। কিন্তু এই “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” আসলে কী? এর সঙ্গে জড়িত অতীত নির্বাচনের বিতর্কগুলোই বা কী?

ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বরূপ

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিপ্পা নরিসের ২০১২ সালে প্রকাশিত “ইলেক্টোরাল ইঞ্জিনিয়ারিং: ভোটিং রুলস অ্যান্ড পলিটিক্যাল বিহেভিয়ার” শীর্ষক গ্রন্থে এই ধারণাটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। অধ্যাপক নরিসের মতে, ইলেকটোরাল ইঞ্জিনিয়ারিং হলো “আনুষ্ঠানিক সকল নির্বাচনি নিয়মের পরিবর্তন”। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক দল, রাজনীতিবিদ এবং জনগণের কৌশলগত আচরণকে প্রভাবিত করে বড় ধরনের পরিণতি তৈরি করার ক্ষমতা রাখে। সহজ ভাষায়, এই পদ্ধতি ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে এমনভাবে সাজানো হয় যাতে পূর্বনির্ধারিত কোনো পক্ষের জয় নিশ্চিত করা যায়। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে এর প্রয়োগ দেখা গেলেও, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি গণতন্ত্রের জন্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, এই শব্দটি প্রায়শই নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে নির্বাচনকে “ম্যানিপুলেট” করার জন্যই এই প্রক্রিয়ার ব্যবহার প্রচলিত। এর মধ্যে রয়েছে ভোট গণনায় কারচুপি, ভোটার তালিকায় ভুয়া ভোটার অন্তর্ভুক্ত করা, প্রতিপক্ষের ভোটারদের ভোটদানে বাধা দেওয়া বা জোরপূর্বক ভোট দেওয়ানো, ব্যালট বাক্স চুরি, পোলিং এজেন্টদের বাধা দেওয়া ইত্যাদি। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ জানান, ক্ষমতাধর প্রায় সব রাজনৈতিক দলই এই প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে চায়; যাদের ক্ষমতা বেশি, তারা এটি করতে সক্ষম হয়।

বাংলাদেশের নির্বাচনে নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নজির

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” শব্দটি পরিচিতি লাভ করে মূলত ২০০০ সালের পর থেকে। তবে এর আগেও বিভিন্ন নামে বা ভিন্ন আঙ্গিকে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার ঘটনা ঘটেছে।

১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন: বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন থেকেই নির্বাচনী প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে। খন্দকার মোশতাক আহমেদকে জেতানোর জন্য ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ ছিল। এমনকি, একজন প্রার্থীকে জেতানোর জন্য হেলিকপ্টারে করে ব্যালট পেপার ঢাকায় নিয়ে আসার মতো ঘটনাও ঘটেছিল বলে জানা যায়। কুমিল্লার দাউদকান্দি আসনে এই নির্বাচনটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছিল।

গণভোটের বিতর্ক: বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত তিনটি গণভোটের মধ্যে প্রথম দুটি সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৭৭ সালের ৩০ মে এবং ১৯৮৫ সালে অনুষ্ঠিত এই গণভোটগুলোতে “হ্যাঁ”-তে অস্বাভাবিক উচ্চ শতাংশ ভোট পড়ার ঘটনাকে অনেকেই নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উদাহরণ হিসেবে দেখেন। সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারীদের নিজেদের শাসনকে বৈধতা দেওয়ার জন্যই এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

১৯৮৬ সালের নির্বাচন (‘মিডিয়া ক্যু’): সাবেক সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ কর্তৃক আয়োজিত এই নির্বাচনটি “মিডিয়া ক্যু” নামে পরিচিত। নির্বাচনের সময় গণমাধ্যমে খবর প্রচার দুদিনের জন্য বন্ধ করে ফলাফল পাল্টে ফেলার অভিযোগ ছিল। এই ঘটনাকে নির্বাচনী ফলাফলকে প্রভাবিত করার একটি সূক্ষ্ম কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

১৯৯১ সালের নির্বাচন (‘সূক্ষ্ম কারচুপি’): নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করলেও, আওয়ামী লীগ একে “সূক্ষ্ম কারচুপি” হিসেবে অভিহিত করে। তাদের অভিযোগ ছিল, অগণতান্ত্রিক শক্তি কালো টাকা, সন্ত্রাস এবং অদৃশ্য শক্তির ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ভোটের রায়কে প্রভাবিত করেছে।

১৯৯৬ সালের নির্বাচন (‘পুকুর নয় সাগর চুরি’): ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনটি একতরফাভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং তীব্র আন্দোলনের মুখে বিএনপি সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আসন সংখ্যার বিচারে জোরালো লড়াই হলেও, বিএনপির পক্ষ থেকে “পুকুর নয়, সাগর চুরি”র অভিযোগ আনা হয়।

২০০১ সালের নির্বাচন (‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ শব্দের ব্যবহার): ২০০১ সালের নির্বাচনের ফলাফলের পরই বাংলাদেশে “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” শব্দটির ব্যবহার ব্যাপকভাবে শুরু হয়। বিএনপি-জামায়াত জোটের বিজয়ের পর আওয়ামী লীগ সরাসরি এই অভিযোগ তোলে যে, নির্বাচনে স্থূল কারচুপি করে জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

২০০৮ সালের নির্বাচন: যদিও এই নির্বাচনকে অনেক বিশ্লেষক গ্রহণযোগ্য মনে করেন, তবুও বিএনপি এই নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল। ভোটার তালিকায় মৃত ও প্রবাসী ব্যক্তিদের নাম থাকা এবং তাদের ভোটে কারচুপির অভিযোগ ছিল।

২০১৪ সালের নির্বাচন (‘তামাসার নির্বাচন’): তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এই নির্বাচন বর্জন করে। ফলে ১৫৩টি আসনে কোনো ভোট গ্রহণ ছাড়াই আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ভোটারদের অনুপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। এই নির্বাচনকে “তামাসার নির্বাচন” হিসেবে অভিহিত করা হয়।

২০১৮ সালের নির্বাচন (‘রাতের ভোট’): এই নির্বাচনে দিনের ভোট রাতে ব্যালট বাক্সে ভরে ফেলার মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে। ভোটের আগের রাতেই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের ভোটকেন্দ্র দখল এবং ব্যালট বাক্স ভরে রাখার অভিযোগ ওঠে। নির্বাচন কমিশন এই অনিয়মগুলোর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালের নির্বাচন (‘আমি আর ডামি’): এই নির্বাচনেও নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নানা নজির দেখা গেছে। বিএনপির অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দাঁড় করানো এবং “আমি আর ডামি” শব্দগুচ্ছের ব্যবহার এই নির্বাচনকে বিতর্কিত করে তোলে। স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অতিরিক্ত তৎপরতা এবং ভোটার উপস্থিতি কম থাকা এই নির্বাচনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

এই দীর্ঘ ইতিহাস বলে দেয়, “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” শুধু একটি শব্দ নয়, বরং বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি বিতর্কিত অনুষঙ্গ। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্য এই ধারা থেকে উত্তরণ অত্যন্ত জরুরি।