ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ ও অর্জনের খতিয়ান নিয়ে ‘রিফর্ম বুক’ নামে একটি বই প্রকাশ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিভিন্ন খাতে নেওয়া সংস্কার উদ্যোগগুলোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ এই বইটিতে স্থান পেয়েছে। শনিবার সকালে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দীর্ঘ ১৬ বছরের দমনমূলক শাসনের অবসান ঘটিয়ে তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে বাংলাদেশ এক নতুন অভিযাত্রা শুরু করে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে দেশ যখন এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। দায়িত্ব গ্রহণের সময় সরকার এক বিধ্বস্ত অর্থনীতি, ভঙ্গুর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং বিপর্যস্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সম্মুখীন হয়। বিগত সরকারের দুর্নীতি ও অপশাসনে রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গ দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর রাজনৈতিক প্রভাব রাষ্ট্রকে খাদের কিনারায় নিয়ে গিয়েছিল।
এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করে বর্তমান সরকার। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দায়িত্ব পালনের ১৮ মাসে সরকার প্রায় ১৩০টি নতুন ও সংশোধিত আইন প্রণয়ন করেছে এবং ৬ শতাধিক নির্বাহী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এসব সংস্কারের প্রায় ৮৪ শতাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে, যা কেবল কাগুজে প্রতিশ্রুতি নয় বরং দৃশ্যমান পরিবর্তনের প্রতিফলন।
অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে বইটিতে। জাপানের সাথে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির ফলে বাংলাদেশের ৭ হাজার ৪০০ পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়েছে। চীনের সাথে ঋণের মেয়াদ পুনর্নির্ধারণ ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনার মাধ্যমে আমদানি শুল্ক উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
দুর্নীতি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পতিত সরকারের আমলের শতাধিক প্রভাবশালী রাজনীতিক ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দের প্রক্রিয়া চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত ১ হাজার ২০০-র বেশি কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। মানবাধিকার রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিশেষায়িত বাহিনী র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) নাম পরিবর্তন করে ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’ রাখা হয়েছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতে সব আদালতকে সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক অধীনে আনা হয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিচারক নিয়োগের পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার এবং পূর্বে বন্ধ হওয়া গণমাধ্যমগুলো পুনরায় চালুর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সাংবিধানিক সংস্কারের লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপের ভিত্তিতে ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন করা হয়েছে, যা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য গণভোটের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রেস উইংয়ের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ১৬ বছরের পুঞ্জীভূত সমস্যা ১৮ মাসে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব না হলেও, বাংলাদেশ এখন স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে একটি গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের দিকে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-আন্দোলনের চেতনাই এই সংস্কার যাত্রার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।
রিপোর্টারের নাম 





















