ঢাকা ০৭:০৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

ভোটগ্রহণ শেষে ফলাফল তৈরি হয় যেভাবে

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:৩৯:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

একই দিনে দুই ভোট: ফলাফল গণনায় নতুন চ্যালেঞ্জ

ঢাকা: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের গণভোট অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। একই দিনে দুটি ভিন্ন ধরনের ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় ফলাফল তৈরিতে কিছুটা সময় লাগতে পারে বলে সরকার ও নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, দুটি ভিন্ন ধরনের ব্যালটে ভোট হওয়ার কারণে এবারের ফলাফল গণনায় পূর্বের চেয়ে বেশি সময় লাগার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়াও, এই প্রথমবার প্রবাসী ভোটার এবং দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেবেন, যা গণনা করতে হবে। সংসদীয় আসনের সাধারণ নির্বাচন, পোস্টাল ব্যালট এবং গণভোটের ফলাফল পৃথকভাবে গণনা করে প্রকাশ করা হবে।

ভোট গণনা প্রক্রিয়া: ধাপে ধাপে বিস্তারিত

ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর প্রতিটি ভোট কক্ষের ব্যালট বাক্স প্রিসাইডিং বা সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে প্রার্থীদের এজেন্টদের উপস্থিতিতে সিলমোহর করে বন্ধ করা হবে। এরপর সেই বাক্সগুলো ভোটকেন্দ্রের নির্ধারিত গণনা কক্ষে নিয়ে যাওয়া হবে।

যদিও ভোটগ্রহণের সময় নারী-পুরুষের জন্য আলাদা কক্ষ থাকতে পারে, তবে ভোট গণনার জন্য একটি নির্দিষ্ট কক্ষ প্রস্তুত করা হয়। এই গণনা কক্ষে প্রতিটি প্রার্থীর একজন করে পোলিং এজেন্ট, সাংবাদিক এবং পর্যবেক্ষকদের উপস্থিত থাকার অনুমতি দেওয়া হবে। তাদের সামনেই ব্যালট বাক্সগুলো খোলা হবে এবং বক্স ও লকের নম্বর মিলিয়ে দেখা হবে।

এরপর প্রতিটি কক্ষের ব্যালট বাক্স থেকে ব্যালট পেপারগুলো মেঝেতে ঢালা হবে। এরপর পোলিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এবং প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ভোট গণনা শুরু করবেন। সংসদ নির্বাচনের সাদা ব্যালট এবং গণভোটের গোলাপি ব্যালট আলাদা করে ফেলা হবে। এরপর প্রতীক অনুযায়ী ব্যালটগুলো টালি করে গণনা করা হবে, যা নির্বাচন কমিশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করতে হবে। একই সাথে, গণভোটের ব্যালটগুলো ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ – এই দুই ভাগে আলাদা করে গণনা করা হবে।

নির্বাচন বিশ্লেষক ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার জেসমিন টুলী বলেন, “এবারের নির্বাচনে দুটি ব্যালট থাকায় গণনা ও ফলাফল ঘোষণায় দেরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে, যদি দুটি পৃথক দল একই সাথে দুটি ব্যালটের গণনা করে, তাহলে খুব বেশি দেরি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।”

কেন্দ্রের পর ফলাফল ব্যবস্থাপনা

দুই ধরনের ব্যালট আলাদাভাবে গণনা শেষে নির্বাচন কমিশনের নির্দিষ্ট ফরমে কেন্দ্রভিত্তিক রেজাল্ট শিট প্রস্তুত করা হবে। সংসদ নির্বাচনের জন্য ১৬ নম্বর ফরমের রেজাল্ট শিটে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নাম, ভোটের সংখ্যা, বাতিল ভোটের সংখ্যা এবং মোট প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। ভোটের সংখ্যা অংকে ও কথায় উভয়ভাবেই লিখতে হবে এবং কোনো প্রকার কাঁটাছেড়া করা যাবে না, যা ফলাফলে সন্দেহ তৈরি করতে পারে। এই শিটে মোট ভোট, বাতিল ভোট, বৈধ ভোট এবং প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোটের সমষ্টি অবশ্যই মোট প্রদত্ত ভোটের সাথে মিল থাকতে হবে।

রেজাল্ট শিট প্রস্তুত হওয়ার পর প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এবং পোলিং এজেন্টরা এতে স্বাক্ষর করবেন। এরপর চূড়ান্ত ফলাফলের সাতটি কপি তৈরি করা হবে। একটি কপি ভোটকেন্দ্রের নোটিশ বোর্ড বা উন্মুক্ত স্থানে টানিয়ে দেওয়া হবে। বাকি কপিগুলোর মধ্যে দুটি ব্যালট ও নির্বাচনী সরঞ্জামসহ বস্তায় সিলগালা করে রাখা হবে। দুটি কপি প্রিসাইডিং কর্মকর্তা হাতে করে সংশ্লিষ্ট আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তার (জেলা প্রশাসক/বিভাগীয় কমিশনার/আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা) কাছে নিয়ে যাবেন। প্রিসাইডিং কর্মকর্তা নিজের কাছে একটি কপি রাখবেন এবং অন্য একটি সেট নির্দিষ্ট খামে নির্বাচন কমিশনে পাঠাবেন। এছাড়াও, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্ট, সাংবাদিক বা পর্যবেক্ষকদের অনুরোধে কেন্দ্রের ফলাফলের কপি সরবরাহ করা হবে।

এই প্রক্রিয়া শেষে প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণার আগেই জয়-পরাজয় সম্পর্কে একটি ধারণা লাভ করেন। এরপর প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও অন্তত দুজন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, পুলিশ ও আনসারের নিরাপত্তায় সংশ্লিষ্ট আসনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় বা নির্বাচনী কন্ট্রোল রুমে চলে যাবেন। সেখানে ফলাফলের কপি এবং গণনাকৃত ব্যালট জমা দেবেন। সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের কন্ট্রোল রুম থেকে প্রার্থীর এজেন্টদের উপস্থিতিতে মাইকে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল ঘোষণা করা হবে। কোনো কেন্দ্রের ফলাফল মাইকে ঘোষণার আগে পর্যন্ত প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে সেখানে থাকতে হবে।

ফলাফল পরিবর্তন: সম্ভাবনা ও বাস্তবতা

কেন্দ্রের ফলাফল শিট তৈরির সময় যতগুলো ব্যালট থাকে, ঠিক ততগুলোর হিসাব সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দিতে হবে। কন্ট্রোল রুমে ফলাফল জমা দেওয়ার পর সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা তাতে সিল দেবেন এবং নির্বাচন কর্মকর্তারা তা স্ক্যান করে নির্বাচন কমিশনের রেজাল্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (আরএমএস) সার্ভারে এন্ট্রি করবেন।

নির্বাচনের সময় প্রায়শই ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’, ফলাফল টেম্পারিং বা কারচুপির অভিযোগ ওঠে। তবে, প্রার্থীদের এজেন্টদের কাছে কেন্দ্রের ফলাফল এবং আরএমএস সার্ভারেও তথ্য থাকায় ফলাফল পরিবর্তন করা সহজ নয়। যদি কেউ ফলাফল পরিবর্তন করতে চায়, তবে তাকে সব স্তরেই পরিবর্তন করতে হবে।

তবে, ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিছু কেন্দ্রে আগের রাতে ব্যালট পেপারে সিল দিয়ে ব্যালট বাক্স ভরে রাখার অভিযোগ উঠেছিল, যা ‘রাতের ভোট’ হিসেবে সমালোচিত হয়েছিল। সেই নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ভোট বর্জন করেছিল। এছাড়াও, বিভিন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়ে ভোট কারচুপির অভিযোগ এবং অনিয়ম বা সংঘর্ষের কারণে ভোটগ্রহণ স্থগিতের নজির রয়েছে। ২০০১ সালে ১৩৭টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছিল। ২০২৪ সালে একটি আসনে ব্যালট বাক্স ছিনতাই ও হামলার কারণে ভোট বাতিল করা হয়েছিল।

নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, স্থগিত বা বাতিল হওয়া কেন্দ্রের ভোটের সংখ্যা যদি আসনের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তবে সেসব কেন্দ্রে পুনরায় ভোটগ্রহণ করে ফলাফল ঘোষণা করা হয়। কিন্তু জয়-পরাজয় নির্ধারণে ভূমিকা না থাকলে পুনরায় ভোটের প্রয়োজন হয় না।

এবারের নির্বাচনে প্রবাসীরা পোস্টাল ব্যালটে এবং দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও ভোট দেবেন। কেন্দ্র থেকে ফলাফল আসার পর রিটার্নিং কর্মকর্তা এই ভোটগুলোও গণনায় যুক্ত করবেন। পোস্টাল ব্যালটের খাম খোলার সময়ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। এজেন্টদের সামনেই ব্যালট গণনা করে আসনভিত্তিক চূড়ান্ত ফলাফল প্রস্তুত করা হবে।

চূড়ান্ত ফলাফল রিটার্নিং কর্মকর্তা ফলাফল ঘোষণা কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করবেন, যেখানে প্রার্থীদের এজেন্ট বা প্রার্থীরা উপস্থিত থাকতে পারবেন। যদি কোনো প্রার্থীর গণনা বা ফলাফলে আপত্তি থাকে, তবে তিনি নির্বাচন কমিশনের কাছে পুনঃগণনার আবেদন করতে পারেন। কমিশন অনুমতি দিলে পুনঃগণনা করা হবে। এছাড়াও, ভোট শেষ হওয়ার পর নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে এ নিয়ে মামলা করা যেতে পারে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতে ইরানের পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রতি কড়া বার্তা

ভোটগ্রহণ শেষে ফলাফল তৈরি হয় যেভাবে

আপডেট সময় : ০২:৩৯:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

একই দিনে দুই ভোট: ফলাফল গণনায় নতুন চ্যালেঞ্জ

ঢাকা: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের গণভোট অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। একই দিনে দুটি ভিন্ন ধরনের ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় ফলাফল তৈরিতে কিছুটা সময় লাগতে পারে বলে সরকার ও নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, দুটি ভিন্ন ধরনের ব্যালটে ভোট হওয়ার কারণে এবারের ফলাফল গণনায় পূর্বের চেয়ে বেশি সময় লাগার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়াও, এই প্রথমবার প্রবাসী ভোটার এবং দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেবেন, যা গণনা করতে হবে। সংসদীয় আসনের সাধারণ নির্বাচন, পোস্টাল ব্যালট এবং গণভোটের ফলাফল পৃথকভাবে গণনা করে প্রকাশ করা হবে।

ভোট গণনা প্রক্রিয়া: ধাপে ধাপে বিস্তারিত

ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর প্রতিটি ভোট কক্ষের ব্যালট বাক্স প্রিসাইডিং বা সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে প্রার্থীদের এজেন্টদের উপস্থিতিতে সিলমোহর করে বন্ধ করা হবে। এরপর সেই বাক্সগুলো ভোটকেন্দ্রের নির্ধারিত গণনা কক্ষে নিয়ে যাওয়া হবে।

যদিও ভোটগ্রহণের সময় নারী-পুরুষের জন্য আলাদা কক্ষ থাকতে পারে, তবে ভোট গণনার জন্য একটি নির্দিষ্ট কক্ষ প্রস্তুত করা হয়। এই গণনা কক্ষে প্রতিটি প্রার্থীর একজন করে পোলিং এজেন্ট, সাংবাদিক এবং পর্যবেক্ষকদের উপস্থিত থাকার অনুমতি দেওয়া হবে। তাদের সামনেই ব্যালট বাক্সগুলো খোলা হবে এবং বক্স ও লকের নম্বর মিলিয়ে দেখা হবে।

এরপর প্রতিটি কক্ষের ব্যালট বাক্স থেকে ব্যালট পেপারগুলো মেঝেতে ঢালা হবে। এরপর পোলিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এবং প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ভোট গণনা শুরু করবেন। সংসদ নির্বাচনের সাদা ব্যালট এবং গণভোটের গোলাপি ব্যালট আলাদা করে ফেলা হবে। এরপর প্রতীক অনুযায়ী ব্যালটগুলো টালি করে গণনা করা হবে, যা নির্বাচন কমিশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করতে হবে। একই সাথে, গণভোটের ব্যালটগুলো ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ – এই দুই ভাগে আলাদা করে গণনা করা হবে।

নির্বাচন বিশ্লেষক ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার জেসমিন টুলী বলেন, “এবারের নির্বাচনে দুটি ব্যালট থাকায় গণনা ও ফলাফল ঘোষণায় দেরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে, যদি দুটি পৃথক দল একই সাথে দুটি ব্যালটের গণনা করে, তাহলে খুব বেশি দেরি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।”

কেন্দ্রের পর ফলাফল ব্যবস্থাপনা

দুই ধরনের ব্যালট আলাদাভাবে গণনা শেষে নির্বাচন কমিশনের নির্দিষ্ট ফরমে কেন্দ্রভিত্তিক রেজাল্ট শিট প্রস্তুত করা হবে। সংসদ নির্বাচনের জন্য ১৬ নম্বর ফরমের রেজাল্ট শিটে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নাম, ভোটের সংখ্যা, বাতিল ভোটের সংখ্যা এবং মোট প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। ভোটের সংখ্যা অংকে ও কথায় উভয়ভাবেই লিখতে হবে এবং কোনো প্রকার কাঁটাছেড়া করা যাবে না, যা ফলাফলে সন্দেহ তৈরি করতে পারে। এই শিটে মোট ভোট, বাতিল ভোট, বৈধ ভোট এবং প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোটের সমষ্টি অবশ্যই মোট প্রদত্ত ভোটের সাথে মিল থাকতে হবে।

রেজাল্ট শিট প্রস্তুত হওয়ার পর প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এবং পোলিং এজেন্টরা এতে স্বাক্ষর করবেন। এরপর চূড়ান্ত ফলাফলের সাতটি কপি তৈরি করা হবে। একটি কপি ভোটকেন্দ্রের নোটিশ বোর্ড বা উন্মুক্ত স্থানে টানিয়ে দেওয়া হবে। বাকি কপিগুলোর মধ্যে দুটি ব্যালট ও নির্বাচনী সরঞ্জামসহ বস্তায় সিলগালা করে রাখা হবে। দুটি কপি প্রিসাইডিং কর্মকর্তা হাতে করে সংশ্লিষ্ট আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তার (জেলা প্রশাসক/বিভাগীয় কমিশনার/আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা) কাছে নিয়ে যাবেন। প্রিসাইডিং কর্মকর্তা নিজের কাছে একটি কপি রাখবেন এবং অন্য একটি সেট নির্দিষ্ট খামে নির্বাচন কমিশনে পাঠাবেন। এছাড়াও, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্ট, সাংবাদিক বা পর্যবেক্ষকদের অনুরোধে কেন্দ্রের ফলাফলের কপি সরবরাহ করা হবে।

এই প্রক্রিয়া শেষে প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণার আগেই জয়-পরাজয় সম্পর্কে একটি ধারণা লাভ করেন। এরপর প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও অন্তত দুজন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, পুলিশ ও আনসারের নিরাপত্তায় সংশ্লিষ্ট আসনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় বা নির্বাচনী কন্ট্রোল রুমে চলে যাবেন। সেখানে ফলাফলের কপি এবং গণনাকৃত ব্যালট জমা দেবেন। সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের কন্ট্রোল রুম থেকে প্রার্থীর এজেন্টদের উপস্থিতিতে মাইকে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল ঘোষণা করা হবে। কোনো কেন্দ্রের ফলাফল মাইকে ঘোষণার আগে পর্যন্ত প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে সেখানে থাকতে হবে।

ফলাফল পরিবর্তন: সম্ভাবনা ও বাস্তবতা

কেন্দ্রের ফলাফল শিট তৈরির সময় যতগুলো ব্যালট থাকে, ঠিক ততগুলোর হিসাব সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দিতে হবে। কন্ট্রোল রুমে ফলাফল জমা দেওয়ার পর সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা তাতে সিল দেবেন এবং নির্বাচন কর্মকর্তারা তা স্ক্যান করে নির্বাচন কমিশনের রেজাল্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (আরএমএস) সার্ভারে এন্ট্রি করবেন।

নির্বাচনের সময় প্রায়শই ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’, ফলাফল টেম্পারিং বা কারচুপির অভিযোগ ওঠে। তবে, প্রার্থীদের এজেন্টদের কাছে কেন্দ্রের ফলাফল এবং আরএমএস সার্ভারেও তথ্য থাকায় ফলাফল পরিবর্তন করা সহজ নয়। যদি কেউ ফলাফল পরিবর্তন করতে চায়, তবে তাকে সব স্তরেই পরিবর্তন করতে হবে।

তবে, ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিছু কেন্দ্রে আগের রাতে ব্যালট পেপারে সিল দিয়ে ব্যালট বাক্স ভরে রাখার অভিযোগ উঠেছিল, যা ‘রাতের ভোট’ হিসেবে সমালোচিত হয়েছিল। সেই নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ভোট বর্জন করেছিল। এছাড়াও, বিভিন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়ে ভোট কারচুপির অভিযোগ এবং অনিয়ম বা সংঘর্ষের কারণে ভোটগ্রহণ স্থগিতের নজির রয়েছে। ২০০১ সালে ১৩৭টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছিল। ২০২৪ সালে একটি আসনে ব্যালট বাক্স ছিনতাই ও হামলার কারণে ভোট বাতিল করা হয়েছিল।

নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, স্থগিত বা বাতিল হওয়া কেন্দ্রের ভোটের সংখ্যা যদি আসনের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তবে সেসব কেন্দ্রে পুনরায় ভোটগ্রহণ করে ফলাফল ঘোষণা করা হয়। কিন্তু জয়-পরাজয় নির্ধারণে ভূমিকা না থাকলে পুনরায় ভোটের প্রয়োজন হয় না।

এবারের নির্বাচনে প্রবাসীরা পোস্টাল ব্যালটে এবং দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও ভোট দেবেন। কেন্দ্র থেকে ফলাফল আসার পর রিটার্নিং কর্মকর্তা এই ভোটগুলোও গণনায় যুক্ত করবেন। পোস্টাল ব্যালটের খাম খোলার সময়ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। এজেন্টদের সামনেই ব্যালট গণনা করে আসনভিত্তিক চূড়ান্ত ফলাফল প্রস্তুত করা হবে।

চূড়ান্ত ফলাফল রিটার্নিং কর্মকর্তা ফলাফল ঘোষণা কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করবেন, যেখানে প্রার্থীদের এজেন্ট বা প্রার্থীরা উপস্থিত থাকতে পারবেন। যদি কোনো প্রার্থীর গণনা বা ফলাফলে আপত্তি থাকে, তবে তিনি নির্বাচন কমিশনের কাছে পুনঃগণনার আবেদন করতে পারেন। কমিশন অনুমতি দিলে পুনঃগণনা করা হবে। এছাড়াও, ভোট শেষ হওয়ার পর নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে এ নিয়ে মামলা করা যেতে পারে।