আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এখন এক মিশ্র পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভোলার মনপুরার আব্দুর রহিম ফরাজির মতো লাখ লাখ সাধারণ ভোটার ভোট দিতে উন্মুখ হয়ে থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ের ক্রমাগত সংঘর্ষ এবং সংঘাতের ঘটনাগুলো জনমনে উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। একদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনি পরিবেশকে ‘ইতিবাচক পরিবর্তন’ হিসেবে দেখছেন, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত বলছে—নিরাপত্তার প্রশ্নে এখনো বড় ধরনের ঝুঁকি রয়ে গেছে।
তৃণমূলে সংঘাত ও রাজনৈতিক লড়াই: নির্বাচনি প্রচারণার শুরু থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই তীব্র রূপ নিয়েছে। ভোলার মনপুরা ও বোরহানউদ্দিনে দুই দলের সংঘর্ষে অন্তত ২৩ জন আহত হয়েছেন। মুন্সীগঞ্জে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন দুজন এবং শেরপুরে রাজনৈতিক সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন জামায়াত নেতা রেজাউল করিম। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, শুধু জানুয়ারি মাসেই ৬৪টি নির্বাচনি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যার অর্ধেকেরও বেশি বিএনপি-জামায়াত দ্বন্দ্বের কারণে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, একসময়ের মিত্র এই দুই দল এবার প্রধান প্রতিপক্ষ হওয়ায় তৃণমূল পর্যায়ে ‘শক্তির প্রতিযোগিতা’ ভয়াবহ সহিংসতার রূপ নিতে পারে।
অবৈধ অস্ত্র ও উদ্ধার অভিযান: নিরাপত্তার সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার। বাড্ডায় বিদেশি পিস্তল উদ্ধার এবং ফরিদপুরে পুকুর সেচে বিপুল আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, অপরাধী চক্র নির্বাচনের আগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গণঅভ্যুত্থানের সময় লুণ্ঠিত অস্ত্রের মধ্যে এখনো ১,৩৩১টি অস্ত্র এবং আড়াই লাখের বেশি গুলি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই অস্ত্রগুলো নির্বাচনের দিন সহিংসতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেইজ-২’ চালু করেছে এবং এরই মধ্যে ২৪ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ও নিরাপত্তার ছক: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ৪২,৭৬১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২৫,৩৩২টিই ঝুঁকিপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৮,৭৮৪টি কেন্দ্র ‘অধিক ঝুঁকিপূর্ণ’। বিশেষ করে ঢাকা মহানগরের ৭৫ শতাংশ কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ। এই বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রথমবারের মতো সেনাবাহিনী সরাসরি ভোটকেন্দ্রের ভেতরে দায়িত্ব পালন করবে। এবার এক লাখ সেনা সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে, যা বিগত নির্বাচনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। পাশাপাশি বিজিবির ৩৭ হাজার সদস্য এবং র্যাব-পুলিশের স্ট্রাইকিং ফোর্স সার্বক্ষণিক নজরদারিতে থাকবে। ড্রোন, হেলিকপ্টার এবং ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের মাধ্যমে আধুনিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আস্থা পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ: বিগত দেড় বছরের অস্থিরতা এবং গণঅভ্যুত্থানের রেশ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। পুলিশের মনোবল চাঙ্গা করা এবং জনগণের আস্থা ফেরানো আইজিপির জন্য একটি বড় পরীক্ষা। যদিও পুলিশ প্রধান এবং স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা দাবি করছেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে, তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন নির্বাচনের দিন পর্যন্ত এই ঝুঁকি ক্রমশ বাড়বে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হকের মতে, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, সকল পক্ষের অংশগ্রহণ এবং সহনশীলতা প্রয়োজন।
আগামীর পথে: দেশের অর্ধেক জেলায় বিবাদ ও সংঘাতের খবরের মধ্যেই রোববার থেকে মাঠে নামছে সেনাবাহিনী। জনগণের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই ভোট কতটা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে, তা নির্ভর করছে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মাঠ পর্যায়ের আচরণের ওপর। ভোটাররা চান নির্ভয়ে কেন্দ্রে গিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে। সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি হবে তাদের সক্ষমতা এবং পেশাদারিত্ব প্রমাণের চূড়ান্ত দিন।
রিপোর্টারের নাম 























