রাজধানীর অলিগলিতে, হাট-বাজারের কোণায়, এমনকি অভিজাত এলাকাতেও সস্তায় ভোজ্যতেল পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা সাধারণ মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে এক মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দেদার বিক্রি হচ্ছে খোলা ড্রামের সয়াবিন ও পাম তেল। যদিও এক বছরেরও বেশি সময় আগে এই ধরনের তেল বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তবে মাঠ পর্যায়ে এর প্রয়োগ নেই বললেই চলে। সস্তা দরের টানে ক্রেতারাও ঝুঁকছেন এই নিষিদ্ধ পণ্যের দিকে, যা জনস্বাস্থ্যকে ঠেলে দিচ্ছে এক গুরুতর সংকটের দিকে।
রাজধানীর পল্লবীর রহিমা (৩২) এর মতো অনেক খেটে খাওয়া মানুষই বোতলজাত তেলের আকাশছোঁয়া দামের কারণে খোলা তেল কিনতেই বাধ্য হন। তার মতে, “বেশি দাম দিয়ে বোতলজাত তেল কেনা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।” একইভাবে, তেজকুনিপাড়ার হোটেল মালিক রহমান মাসুদও তার হোটেলের সব রান্নায় খোলা তেল ব্যবহার করেন। তার ভাষ্যমতে, “খোলা তেলের সুবিধা হলো, যখন যেটুকু প্রয়োজন ততটুকুই কেনা যায় এবং দামও তুলনামূলক কম।” এই দুই উদাহরণই স্পষ্ট করে দেয়, কেন সাধারণ মানুষ ও ছোট ব্যবসায়ীরা এই নিষিদ্ধ পণ্যের দিকে ঝুঁকেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খোলা সয়াবিন তেল মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ড্রামে তেল সংরক্ষণ ও বিক্রি করার ফলে এতে ভেজাল মেশানোর সুযোগ থাকে। এছাড়া, নন-ফুড গ্রেডেড প্লাস্টিক ড্রাম বারবার ব্যবহারের ফলে তেল বিষাক্ত হয়ে যেতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ড্রামে বাজারজাতকৃত ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ থাকে না অথবা সঠিক মাত্রায় পাওয়া যায় না। এর ফলে জনগণের স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে শিশু ও নারীদের মধ্যে ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি বাড়ছে। এটি কেবল জনস্বাস্থ্যের জন্যই হুমকি নয়, বরং দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতের পথেও বড় বাধা।
প্রায় দেড় বছর আগে সরকার ঘোষণা করেছিল যে, বাজারে খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি করা যাবে না এবং সব ধরনের ভোজ্যতেল, বিশেষ করে সয়াবিন তেল, প্যাকেটজাত করে বিক্রি করতে হবে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত আজও বাস্তবায়ন হয়নি। বাজারে এখনো দেদার বিক্রি হচ্ছে খোলা ড্রামজাত সয়াবিন তেল। জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট জরিপ ২০১৯-২০ অনুযায়ী, ৬-৫৯ মাস বয়সি শিশুদের ৫০.৯ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক শিশু ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতিতে ভুগছে। সরকার ২০১৩ সালে আইন করে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ ব্যতীত ভোজ্যতেল বাজারজাত নিষিদ্ধ করলেও, ড্রামের অধিকাংশ খোলা তেলে এই ভিটামিন অনুপস্থিত বা অপর্যাপ্ত।
বেসরকারি গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) জানিয়েছে, ড্রামে বাজারজাতকৃত খোলা ভোজ্যতেল জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সি নারীদের মধ্যে ৫.৪ শতাংশ ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতিতে ভুগছেন। আইসিডিডিআরবির এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারে মোট ভোজ্যতেলের ৬৫ শতাংশ ড্রামে বাজারজাত করা হয়, যার মধ্যে ৫৯ শতাংশই ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ নয় এবং ৩৪ শতাংশে সঠিক মাত্রায় ভিটামিন ‘এ’ নেই। মাত্র ৭ শতাংশ ড্রামের খোলা তেলে আইনে নির্ধারিত ন্যূনতম মাত্রায় ভিটামিন ‘এ’ পাওয়া গেছে। এই তেল সরবরাহের উৎসও শনাক্ত করা যায় না, কারণ ড্রামে কোনো লেবেল বা উৎস শনাক্তকরণ তথ্য যুক্ত থাকে না।
পাইকারি ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন খোলা তেল বিক্রির কারণ হিসেবে ক্রেতাদের চাহিদাকেই দায়ী করেন। তিনি বলেন, “বাজারে এখনো অনেক ভোক্তা বা ক্রেতা আসেন, যারা খোলা তেল কিনতে চান। যেহেতু ক্রেতা চান, সেহেতু আমরাও সেটা বিক্রি করি।” তিনি আরও যোগ করেন, “খোলা তেলের নানাবিধ সুবিধা আছে। সেজন্যই ক্রেতাদের কাছে খোলা সয়াবিন তেলের চাহিদা বেশি। যেমন একজন ক্রেতা তার চাহিদা অনুযায়ী যেকোনো পরিমাণ তেল কিনতে পারেন। কিন্তু প্যাকেটজাতের ক্ষেত্রে সে সুবিধা নেই। দ্বিতীয়ত, খোলা ভোজ্যতেলের দাম বোতলজাত তেলের তুলনায় কম।”
পুষ্টিবিজ্ঞানী ডা. আসলাম হোসেন মনে করেন, ব্যবসায়ীরা বেশি মুনাফার আশায় খোলা তেল বিক্রি করছেন, আর ক্রেতারা স্বাস্থ্য সচেতন না হওয়ায় তা কিনছেন। তিনি বলেন, “এক তেলের নামে অন্য তেল বিক্রি, নিম্নমান ও অস্বাস্থ্যকর তেল বিক্রির পাশাপাশি খোলা অবস্থায় তেল সংরক্ষণ ও বিক্রিতে স্বাস্থ্যঝুঁকিও রয়েছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, “তেল রাখার কাজে ব্যবহৃত ড্রামগুলো অনেক ক্ষেত্রেই আগে রাসায়নিক বা শিল্পপণ্য সংরক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হয়, ফলে তেল দূষিত হয়ে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।”
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের কনসালট্যান্ট মুশতাক হাসান মুহাম্মদ ইফতিখার ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতির কারণে শিশুদের অন্ধত্ব ও গর্ভবতী নারীদের মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে শিল্প মন্ত্রণালয়, বিএসটিআই, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাজারে ভিটামিনসমৃদ্ধ ও নিরাপদ তেলের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের জোর দিয়ে বলেন, “ভোজ্যতেল খাদ্যপণ্য বিধায় এটি নিরাপদভাবে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবার। ড্রামে খোলা ভোজ্যতেল বাজারজাতকরণ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। এর ক্ষতি সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করতে হবে।” এই নীরব ঘাতকের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে জনস্বাস্থ্য এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
রিপোর্টারের নাম 























