ঢাকা ০১:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬

লক্ষ্মীপুর-২ আসনে জমজমাট নির্বাচনী লড়াই: দুই ভূঁইয়ার মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:২৬:১৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর ও সদর আংশিক) আসনে নির্বাচনী উত্তাপ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আবুল খায়ের ভূঁইয়া এবং জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী রুহুল আমিন ভূঁইয়ার মধ্যে এক তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে প্রচার-প্রচারণা জোরদার হওয়ায় নির্বাচনী সমীকরণ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে।

রায়পুর উপজেলা এবং সদর অংশের ইউনিয়নগুলোতে প্রতিদিনই পথসভা, গণসংযোগ, কর্মিসভা ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বাজার এলাকাগুলো মিছিল-সমাবেশের স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে এই দুই “ভূঁইয়া” বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন।

স্থানীয়দের মতে, এবার ভোটাররা কেবল দল দেখে নয়, প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, এলাকার সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। রায়পুর পৌরসভার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আবদুস সালাম বলেন, “প্রার্থী যদি এলাকায় থাকেন এবং মানুষের দুঃখে পাশে থাকেন, তবে তাকেই মানুষ চাইছে। সেই বিবেচনায় বিএনপির প্রার্থী কিছুটা এগিয়ে রয়েছেন।”

চরবংশী ইউনিয়নের গৃহবধূ নাজমা বেগম বলেন, “আমরা শান্তি ও নিরাপত্তা চাই। যে প্রার্থী নারীদের কথা ভাববেন, তাকেই ভোট দেব।” যুবক রাসেল হোসেনের মতে, “এবার ভোটের হিসাব সহজ নয়। আগের মতো একদল একচেটিয়া থাকবে না। সবাই হিসাব করে ভোট দেবে।” ভোটারদের একটি বড় অংশ মনে করছে, উন্নয়ন, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রার্থীর অতীত ভূমিকা—এই তিনটি বিষয়ই তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলবে।

বিএনপির প্রার্থী আবুল খায়ের ভূঁইয়া, যিনি একজন সাবেক সংসদ সদস্য, তিনি মাঠে সক্রিয় হয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সঞ্চার করেছেন। নিয়মিত গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ এবং সাংগঠনিক বৈঠকের মাধ্যমে তিনি আসনটি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, “লক্ষ্মীপুর-২ আসন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ঐতিহ্যের আসন। জনগণ পরিবর্তন চায়। আমরা জনগণের সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে প্রস্তুত।” উপজেলা বিএনপির সভাপতি নাজমুল ইসলাম মিঠু যোগ করেন, “এই আসনে বিএনপির ভোটব্যাংক এখনো শক্ত। দল ঐক্যবদ্ধ থাকলে বিজয় আমাদেরই হবে।” তবে, স্থানীয়দের মতে, দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং কিছু এলাকায় সাংগঠনিক দুর্বলতা বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী, জেলা আমির রুহুল আমিন ভূঁইয়াও সমান তালে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। তিনি নিজেও নিয়মিত গণসংযোগ এবং কেন্দ্রভিত্তিক সভায় অংশ নিচ্ছেন। তার অনুপস্থিতিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতারাও প্রচার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। রুহুল আমিন ভূঁইয়া বলেন, “আমরা ক্ষমতার রাজনীতি নয়, ন্যায়ের রাজনীতি করতে চাই। গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাই আমাদের লক্ষ্য।” রায়পুর উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবদুল আউয়াল রাসেল জানান, “ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়মিত দাওয়াতি কাজ ও প্রার্থী পরিচিতি সভা হচ্ছে। তৃণমূলে আমরা ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি।” বিশেষ করে নারী ভোটার ও ধর্মপ্রাণ ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের সমর্থন বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লক্ষ্মীপুর-২ আসনে এবার একক আধিপত্যের রাজনীতি দেখা যাবে না। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সরাসরি ভোট ভাগাভাগি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ফলাফলকে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। সাংবাদিক কামাল উদ্দিন মনে করেন, “ভোটাররা এবার অনেক বেশি সচেতন। ব্যক্তি ইমেজ, সংগঠন এবং মাঠে উপস্থিতি—এই তিনটি বিষয়ই জয়-পরাজয়ের ফয়সালা করবে।”

বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনের ফলাফল কেবল স্থানীয় রাজনীতিতেই নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করবে। সব মিলিয়ে, লক্ষ্মীপুর-২ আসন এখন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিএনপি বনাম জামায়াত—এই লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে কোন সমীকরণ দাঁড়ায়, তা জানতে ভোটের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট— এই আসনে লড়াই হবে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ও হাড্ডাহাড্ডি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

দেশকে স্বাবলম্বী করার প্রশ্নে ঐকমত্য প্রয়োজন: জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী

লক্ষ্মীপুর-২ আসনে জমজমাট নির্বাচনী লড়াই: দুই ভূঁইয়ার মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি

আপডেট সময় : ০৯:২৬:১৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর ও সদর আংশিক) আসনে নির্বাচনী উত্তাপ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আবুল খায়ের ভূঁইয়া এবং জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী রুহুল আমিন ভূঁইয়ার মধ্যে এক তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে প্রচার-প্রচারণা জোরদার হওয়ায় নির্বাচনী সমীকরণ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে।

রায়পুর উপজেলা এবং সদর অংশের ইউনিয়নগুলোতে প্রতিদিনই পথসভা, গণসংযোগ, কর্মিসভা ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বাজার এলাকাগুলো মিছিল-সমাবেশের স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে এই দুই “ভূঁইয়া” বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন।

স্থানীয়দের মতে, এবার ভোটাররা কেবল দল দেখে নয়, প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, এলাকার সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। রায়পুর পৌরসভার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আবদুস সালাম বলেন, “প্রার্থী যদি এলাকায় থাকেন এবং মানুষের দুঃখে পাশে থাকেন, তবে তাকেই মানুষ চাইছে। সেই বিবেচনায় বিএনপির প্রার্থী কিছুটা এগিয়ে রয়েছেন।”

চরবংশী ইউনিয়নের গৃহবধূ নাজমা বেগম বলেন, “আমরা শান্তি ও নিরাপত্তা চাই। যে প্রার্থী নারীদের কথা ভাববেন, তাকেই ভোট দেব।” যুবক রাসেল হোসেনের মতে, “এবার ভোটের হিসাব সহজ নয়। আগের মতো একদল একচেটিয়া থাকবে না। সবাই হিসাব করে ভোট দেবে।” ভোটারদের একটি বড় অংশ মনে করছে, উন্নয়ন, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রার্থীর অতীত ভূমিকা—এই তিনটি বিষয়ই তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলবে।

বিএনপির প্রার্থী আবুল খায়ের ভূঁইয়া, যিনি একজন সাবেক সংসদ সদস্য, তিনি মাঠে সক্রিয় হয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সঞ্চার করেছেন। নিয়মিত গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ এবং সাংগঠনিক বৈঠকের মাধ্যমে তিনি আসনটি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, “লক্ষ্মীপুর-২ আসন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ঐতিহ্যের আসন। জনগণ পরিবর্তন চায়। আমরা জনগণের সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে প্রস্তুত।” উপজেলা বিএনপির সভাপতি নাজমুল ইসলাম মিঠু যোগ করেন, “এই আসনে বিএনপির ভোটব্যাংক এখনো শক্ত। দল ঐক্যবদ্ধ থাকলে বিজয় আমাদেরই হবে।” তবে, স্থানীয়দের মতে, দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং কিছু এলাকায় সাংগঠনিক দুর্বলতা বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী, জেলা আমির রুহুল আমিন ভূঁইয়াও সমান তালে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। তিনি নিজেও নিয়মিত গণসংযোগ এবং কেন্দ্রভিত্তিক সভায় অংশ নিচ্ছেন। তার অনুপস্থিতিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতারাও প্রচার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। রুহুল আমিন ভূঁইয়া বলেন, “আমরা ক্ষমতার রাজনীতি নয়, ন্যায়ের রাজনীতি করতে চাই। গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাই আমাদের লক্ষ্য।” রায়পুর উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবদুল আউয়াল রাসেল জানান, “ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়মিত দাওয়াতি কাজ ও প্রার্থী পরিচিতি সভা হচ্ছে। তৃণমূলে আমরা ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি।” বিশেষ করে নারী ভোটার ও ধর্মপ্রাণ ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের সমর্থন বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লক্ষ্মীপুর-২ আসনে এবার একক আধিপত্যের রাজনীতি দেখা যাবে না। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সরাসরি ভোট ভাগাভাগি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ফলাফলকে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। সাংবাদিক কামাল উদ্দিন মনে করেন, “ভোটাররা এবার অনেক বেশি সচেতন। ব্যক্তি ইমেজ, সংগঠন এবং মাঠে উপস্থিতি—এই তিনটি বিষয়ই জয়-পরাজয়ের ফয়সালা করবে।”

বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনের ফলাফল কেবল স্থানীয় রাজনীতিতেই নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করবে। সব মিলিয়ে, লক্ষ্মীপুর-২ আসন এখন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিএনপি বনাম জামায়াত—এই লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে কোন সমীকরণ দাঁড়ায়, তা জানতে ভোটের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট— এই আসনে লড়াই হবে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ও হাড্ডাহাড্ডি।